শহরে শব্দ দূষণের অসহনীয় মাত্রা: দুর্বিষহ পেশাজীবীদের জীবন

শহরে শব্দ দূষণের অসহনীয় মাত্রা: দুর্বিষহ পেশাজীবীদের জীবন

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ০৯ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ১১:২০

দেশের শহর অঞ্চলে শব্দ দূষণ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। আর এর ক্ষতিকর প্রভাবে নিরবে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বিভিন্ন পেশার মানুষ। সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন রিকশাচালক ও ট্রাফিক পুলিশগণ। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেসের এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আইন থাকলেও এর প্রয়োগ না থাকার কারনে শব্দ দূষণের মাত্রা বেড়েছে বহুগুণে। সহসা যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে শব্দ দূষণজনিত রোগ ভয়াবহ রূপ নেবে। বিস্তারিত লিখেছেন বিনয় দাস

শ্রবণজনিত সমস্যায় ভুগছেন ৪২ শতাংশ রিকশাচালক: শব্দ দূষণে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৪২ শতাংশ রিকশাচালকের শ্রবণজনিত সমস্যায় ভোগার তথ্য উঠে এসেছে ‘বাংলাদেশের রাজপথে শব্দদূষণ এবং শব্দদূষণের কারণে রাজপথে কর্মরত পেশাজীবীদের শ্রবণ সমস্যা’ শীর্ষক এই গবেষণায়। গবেষণা দলের প্রধান ড. সাইকা নিজাম জানান, সড়কে শব্দ দূষণের মাত্রা নির্ণয় এবং সড়কে পেশাজীবীদের শ্রবণশক্তির ওপর শব্দদূষণের প্রভাব নির্ণয়ে এই গবেষণা চালানো হয়েছে। মঙ্গলবার (০৮ নভেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের ইব্রাহিম অডিটোরিয়ামে এক অনুষ্ঠানে ড. সাইকা নিজাম বলেন, এ বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রাজশাহী, কুমিল্লা এবং সিলেট সিটি করপোরেশনে একটি জরিপ চালানো হয়। জরিপের ফল উপস্থাপনের অনুষ্ঠানে বলা হয়, সমস্যার ব্যাপ্তি বুঝতে সড়কে বিভিন্ন পেশার ৬৪৭ জনের শ্রবণশক্তি পরিমাপ করা হয়। এর মধ্যে ১৯২ জন ট্রাফিক পুলিশ, ৭৪ জন রিকশাচালক, ১৩৪ জন অটোরিকশা চালক, ৫৯ জন দোকানদার, ১২২ জন ট্রাক-বাসের চালক ও হেলপার, ৩৪ জন ব্যক্তিগত গাড়ির চালক এবং ৩২ জন মোটরসাইকেল চালক রয়েছেন।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস

ভুক্তভোগী ৩১ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ: গবেষণায় দেখা যায়, রিকশাচালকের পাশাপাশি ৩১ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ, ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ অটোরিকশা চালক, ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ দোকানদার, ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ বাস-ট্রাক চালক, ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাইভেটকার চালক এবং ১২ দশমিক ৫ শতাংশ মোটরসাইকেল চালকও শ্রবণজনিত সমস্যায় ভুগছেন। গবেষকরা বলেন, জরিপে অংশ নেওয়াদের প্রতি চারজনের একজন কানে কম শোনার সমস্যায় ভুগছেন। সমস্যায় আক্রান্তদের ৭ শতাংশের শ্রবণ সহায়ক যন্ত্র (কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট) ব্যবহার জরুরি।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার কুমিল্লা সিটির মানুষ: এই জরিপে সবচেয়ে বেশি সমস্যার কথা এসছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এলাকায়। সেখানে ৫৫ শতাংশ পেশাজীবীর শব্দদূষণের কারণে সমস্যায় ভোগার কথা বলেছেন। আর সিলেটে ৩১ শতাংশ, ঢাকায় ২২ দশমিক ৩ শতাংশ, রাজশাহীতে ১৪ শতাংশ পেশাজীবী শব্দদূষণে ভোগার কথা জানিয়েছেন। সাইকা নিজাম বলেন, তাদের গবেষণায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় শব্দের গড় মাত্রা ৯৬ দশমিক ৩ ডেসিবল, দক্ষিণ সিটিতে ৯৪ দশমিক ১ ডেসিবল, সিলেট সিটি করপোরেশনে ৮৯ দশমিক ৯ ডেসিবল, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে ৯০ দশমিক ৩ ডেসিবল এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশনে ৯১ দশমিক ৬ ডেসিবল পাওয়া যায়। এতে আরও বলা হয়, সিটি করপোরেশনগুলোর রাজপথে শব্দের মাত্রা ছিল ৮৪ থেকে ৯৯ ডেসিবল, যা অনুমোদিত মাত্রার (৬০ ডেসিবল) চেয়ে অনেক বেশি। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ছিল ৩৮ দশমিক ৪ বছর। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা গড়ে দৈনিক ১০ দশমিক ৭ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৬ দশমিক শূন্য ৪ দিন রাজপথে কাজ করেন।

ভয়াহ পরিস্থিতির কথা ভাবে নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও : সমস্যা গুরুতর হলেও শব্দদূষণকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না মন্তব্য করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন। তিনি অনুষ্ঠানে বলেন, এটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। গবেষণায় এমন চিত্র উঠে আসবে তা ভাবিনি। রোবেদ আমিন বলেন, বয়স বাড়লেই মানুষ ধীরে ধীরে কানে কম শুনতে শুরু করে। কানে না শোনার নানা কারণও থাকতে পারে। শুধু রাস্তায় নয়, বাসা-বাড়ির আশপাশে গড়ে ওঠা ভবনেও দায় রয়েছে। এ জন্য আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকেও একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, উচ্চমাত্রার শব্দদূষণ কানে কম শোনা থেকে শুরু করে স্থায়ী বধিরতা তৈরি করতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪৩২ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কানে শোনার সমস্যায় ভুগছেন, যাদের চিকিৎসার পাশাপাশি হেয়ারিং এইড ব্যবহার করা প্রয়োজন। এদের ৮০ শতাংশই উন্নয়নশীল দেশে বসবাস করে এবং এর অর্ধেকের ক্ষেত্রেই এই সমস্যা এড়ানো যেত। শব্দদূষণে তৈরি কানে কম শোনার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে পেশাগত কারণে শব্দ দূষণের সংস্পর্শে আসা।

শব্দদূষণে কানের সমস্যায় রিকশাচালক-ট্রাফিক পুলিশ

প্রভাব পড়ছে শিশুস্বাস্থ্যেও : শব্দ দূষণে শিশুরা বেশি করে মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শব্দ দূষণের কারণে শ্রবণশক্তি হ্রাস, বধিরতা, হৃদরোগ, খিটখিটে মেজাজ, শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বিঘ্নিত হওয়া, ঘুমের ব্যাঘাতসহ নানা রকম সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ করে বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। পরিবেশেবাদী ও বিশেষজ্ঞরা জানান, শব্দ দূষণের প্রধান কারণগুলো হলো- যানবাহনের জোরালো হর্ন ও ইঞ্জিনের শব্দ, যানবাহন চলাচলের শব্দ, বিভিন্ন নির্মাণ কাজের শব্দ, মেশিনে ইট ও পাথর ভাঙার শব্দ, ভবন ভাঙার শব্দ, কলকারখানা থেকে নির্গত শব্দ, গ্রিলের দোকানে হাতুড়ি পেটানোর শব্দ, জেনারেটরের শব্দ, নির্বিচারে লাউড স্পিকারের শব্দ, দোকানে উচ্চ আওয়াজে গান বাজানোর শব্দ, উড়োজাহাজের শব্দ ইত্যাদি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণা অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ মানুষের শ্রবণশক্তি লোপ পেয়েছে, যার মধ্যে ২৬ শতাংশই হচ্ছে শিশু। শব্দ দূষণের কারণে শিশুরা কানে কম শোনা, শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলা, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্থায়ী মাথাব্যথা, ক্ষুধামন্দা, অবসাদ, নিদ্রাহীনতাসহ নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

রাজপথে কর্মরত পেশাজীবীদের কর্মঘণ্টা কমানোর সুপারিশ: গবেষণার উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে বলা হয়, বাংলাদেশের রাজপথে শব্দদূষণের মাত্রা নির্ণয় এবং রাজপথে কর্মরত পেশাজীবীদের শ্রবণশক্তির ওপর সেই শব্দদূষণের প্রভাব নির্ণয় করা। গবেষণার সুপারিশে বলা হয়, রাজপথে শব্দদূষণের উৎস চিহ্নিত করা এবং মাত্রা কমানোর জন্য পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। রাজপথে কর্মরত পেশাজীবীদের কর্মঘণ্টা কমানো একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে উপযুক্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে। রিকশাচালক ও ট্রাফিক পুলিশের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। এছাড়া নিয়মিত শ্রবণশক্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত। আচরণগত পরিবর্তন আনার জন্য কর্মশালার আয়োজন করা উচিত। শব্দদূষণ কমাতে আইন তৈরি করা উচিৎ এবং তা কঠোরভাবে বজায় রাখা উচিত। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে দেশব্যাপী বড় আকারে গবেষণা করা প্রয়োজন।

উত্তরদক্ষিণ, ০৯ নভেম্বর ২০২২, প্রথম পৃষ্ঠা

আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই: দেশে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট আইন আছে, তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই। অনেকে আইন জানেন না, কেউ কেউ জেনেও তা লঙ্ঘন করেন। এজন্য আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি এক্ষেত্রে নাগরিকদের সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬-এ বলা আছে, ভূমির ব্যবহার অনুযায়ী নির্দিষ্ট এলাকায় দিনে ও রাতে শব্দের মাত্রা (ডেসিবল) কেমন হবে, কী ধরনের কাজ দিনে-রাতে কোন সময় পর্যন্ত করা যাবে। কিন্তু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সব স্থানেই শব্দের তীব্রতা প্রায় একই রকম। আইনের মান্যতায় সাজার বিধান থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (১৯৯৯ সালের গাইডলাইন) মানদণ্ড অনুসারে, আবাসিক এলাকার জন্য শব্দের গ্রহণযোগ্য সর্বোচ্চ মাত্রা ৫৫ ডেসিবল, বাণিজ্যিক এলাকার জন্য ৭০ ডেসিবল। ২০১৮ সালের সর্বশেষ হালনাগাদ গাইডলাইনে সড়কে শব্দের তীব্রতা ৫৩ ডেসিবলের মধ্যে সীমিত রাখার সুপারিশ করা হয়। সে হিসেবেও রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের প্রতিনিয়ত জাতিসংঘের বেঁধে দেয়া সীমার দ্বিগুণ মাত্রার শব্দের অত্যাচারে পিষ্ট হতে হচ্ছে।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading