আজকের বর্জ্য আগামীর সম্পদ: আমরা কেন কাজে লাগাচ্ছি না?

আজকের বর্জ্য আগামীর সম্পদ: আমরা কেন কাজে লাগাচ্ছি না?

ফারহানা মৌরী । বুধবার, ০৯ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ০৮:৩০

অক্ষরের মিলেই হোক কিংবা প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে হোক, বর্জ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগসূত্র বিদ্যমান। বাংলাদেশের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রথমেই রাজধানী ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র মাথায় আসে। কাচপুর ব্রিজের আগে ময়লার স্তূপ কিংবা নরসিংদীর ভেলানগরের ময়লার স্তূপ; সঙ্গে বিভিন্ন মিল ফ্যাক্টরির আশপাশের জায়গাগুলোই বলে দেয়, বাংলাদেশের বর্জ্যের পরিমাণ কত? হতে পারে তা জৈবিক অথবা অজৈবিক। জৈবিক বর্জ্য পচে গিয়ে সার হিসেবে মাটির উপকার করে। কিন্তু অজৈবিক বর্জ্য পরিবেশের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নষ্ট করার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ জীবাণুও ছড়ায়।

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনার কারণে সারা দেশে উৎপাদিত হয়েছে সাড়ে ১৪ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৬ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে পলিথিন ব্যাগের বর্জ্য ৫ হাজার ৭৯৬ টন, পলিথিন হ্যান্ডগ্লাভস ৩ হাজার ৩৯ টন, সার্জিক্যাল হ্যান্ডগ্লাভস ২ হাজার ৮৩৮ টন, সার্জিক্যাল ফেস মাস্ক ১ হাজার ৫৯২ টন এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার বোতল ৯০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন করেছে। এসব বর্জ্য কোনোভাবেই পচনের মাধ্যমে মাটি ও পরিবেশে মিশবে না। এই অবস্থায় আমরা যদি এসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ গ্রহণ করি তাহলে আর্থিক এবং পরিবেশগত উভয় দিক থেকেই লাভবান হব।

উন্নত দেশগুলোতে, যেমন—সুইডেন ও নরওয়ে, বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ হয়। তারা সব প্রকার বর্জ্যকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য লাভজনক ভিন্ন বস্তুতে রূপান্তর করে। এর জন্য এসব দেশ বিদেশের অন্যান্য দেশের বর্জ্য আমদানিও করছে। সুইডেন বর্জ্য ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এবং সুইডেন আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই বর্জ্যের অভাবে মহাবিপদে পড়বে। কেননা খুব শিগগিরই তাদের সংরক্ষণে যত বর্জ্য ছিল তা শেষ হয়ে যাবে। তখন তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের প্রয়োজন হবে, যার জন্য অন্যান্য দেশের কাছে সাহায্য চাইতে হবে। বিষয়টি হাস্যকর হলেও সত্য, এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটি রাষ্ট্রীয়ভাবে বর্জ্যের পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে থাকে। এর মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশটির মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক পূরণ করে। দেশটির পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা এতই উন্নত যে, গত বছর দেশটির গৃহস্থ আবর্জনার মাত্র ১ শতাংশ ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাদের এই আধুনিক ব্যবস্থা চালু রাখতে এবং দেশকে সচল রাখতে খুব শিগগিরই অন্যান্য দেশের কাছে সাহায্য চাইতে হবে।

আমরা বলতে চাই, যেহেতু বাংলাদেশে বর্জ্যের পরিমাণ বেশি, তাই বাংলাদেশের এক্ষেত্রে একটা সম্ভাবনা রয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট বর্জ্যের শতকরা ৬৭ ভাগই উৎপাদন হয় ঢাকাতে। এক্ষেত্রে আমরা ঢাকা শহরকেই মডেল হিসেবে রাখতে পারি। বর্জ্য সংরক্ষণ, নিরপেক্ষায়ণ, নিষ্ক্রিয়করণ অথবা প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহার উপযোগী বিভিন্ন জিনিস বানাতে পারি। কিংবা সুইডেনের মতো প্রক্রিয়াজাত করে তাপ উৎপন্ন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি। এতে করে আমরা আর্থিকভাবে বেশ লাভবান হতে পারব। আবার চাইলে আমরা উন্নত দেশগুলোতে এসব বর্জ্য রপ্তানির ব্যবস্থাও করতে পারি। এতে করেও আমরা আর্থিক উন্নতি ঘটাতে পারব।

ই-বর্জ্য আমাদের জন্য আরেকটি স্বর্গদ্বার! নষ্ট ইলেক্ট্রনিক পণ্য নামক বর্জ্য থেকেই মিলতে পারে সোনা, রূপা, তামা, প্লাটিনামসহ মূল্যবান জিনিসপত্র। কুয়েট ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালিত যৌথ গবেষণায় পাওয়া গেছে, ১ মেট্রিক টন প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড ও র্যাম থেকে পাওয়া যায় ২৮ হাজার ডলার বা ২৪ লাখ টাকা মূল্যের সোনা, রূপা, তামা, টিন। তাছাড়াও এলুমিনিয়াম, প্লাটিনামও পাওয়া যায়। সীমিত পরিসরে এসব রিসাইকেল হলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও দক্ষতার অভাবে এরা চলে যাচ্ছে বিদেশে। যদি নিজ দেশে এসব রিসাইক্লিংয়ের আধুনিক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তাহলে এসব বর্জ্য নিঃসন্দেহে নগদ অর্থ আনবে। যেখানে প্রতি বছর ই-বর্জ্য ২০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের উচিত এসব বর্জ্যকে ফেলনা মনে না করে এগুলোকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা। এসব রিসাইক্লিং করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো দ্রুত গ্রহণ করা। মনে রাখতে হবে, দেশের উন্নতি মানে নিজের উন্নতি যেমন, তেমনই নিজে সচেতন থাকলে দেশও উন্নতি করতে পারবে। সবাই মিলে হাতে হাত রেখে কাজ করলে বর্জ্যই হবে একদিন নগদ অর্থ।

লেখক :শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading