কৃষি উপকরণের অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য: সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন

কৃষি উপকরণের অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য: সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন

শামিম আনসারি । বুধবার, ১৬ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ১১:৪৫

বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। কৃষি ও কৃষকরাই বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এ দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকার সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে মিশে আছে কৃষি। কৃষিকে বাদ দিয়ে এ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধে কৃষকরা ছিলেন সামনের সারিতে। সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণের পাশাপাশি নানাভাবে তারা মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছেন। বাংলাদেশের সংবিধানে কৃষিবিপ্লবের লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে কৃষি খাতের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা একান্ত অপরিহার্য। উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বিশাল জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধির জন্য কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফসল, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও বন জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এছাড়া কৃষি বিভিন্ন ধরনের ভোগ্যপণ্যের বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ভোক্তাদের বাজারের চাহিদাভিত্তিক মালামালের উৎস। তাই গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসকরণে কৃষি ক্ষেত্রের উন্নয়ন এবং এর প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা অপরিহার্য।

ফসল উপ-খাতের সঠিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গ্রহণ ও পরিচালনার উদ্দেশ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক কৃষি নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে গবেষণা, সম্প্রসারণ, বীজ, সার, ক্ষুদ্র সেচ, বিপণন ব্যবস্থা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো এ নীতিমালায় প্রত্যাশামাফিক প্রাধান্য পেয়েছে। সরকারের কৃষিবিষয়ক বিভিন্ন কর্মসূচিতে ফসল খাত সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। প্রতি বছর দেশে কৃষি জমির পরিমাণ প্রায় ১ শতাংশ হারে হ্রাস পাচ্ছে এবং মৃত্তিকার অবক্ষয় ও উর্বরতা হ্রাস এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে মাটির গুণাগুণ হ্রাস পাচ্ছে। পানিসম্পদও সঙ্কুচিত হচ্ছে। ক্রমহ্রাসমান জমিতে ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর জন্য অধিক খাদ্য উৎপাদন এবং কৃষিজাত শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহের প্রয়োজনে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নিবিড়করণ ও বহুমুখীকরণসহ মূল্য সংযোজন প্রয়োজন।

সার, ডিজেল. কীটনাশক, বীজসহ বিভিন্ন ধরনের কৃষি উপকরণের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অথচ বিভিন্ন পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, বিদ্যমান বৈশ্বিক সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাবটি পড়বে আগামী বছর। এ কথা মাথায় রেখে যে বিষয়টি নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো খাদ্যনিরাপত্তা। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ খাদ্যপণ্য উৎপাদন বাড়ানোর দিকে।এ জন্য কৃষকের হাতে সঠিক সময়ে বীজ, সার, কীটনাশক ও জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি যেসব খাদ্যপণ্য আমদানি করতে হয়, সেগুলোও যথাসময়ে দেশে পৌঁছানো প্রয়োজন। এসব বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনাও দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও কৃষি উপকরণ সহজলভ্য হয়নি। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি অনুসন্ধানে কৃষকের দুর্দশার ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। কৃষি উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্যের কারণে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সেই সঙ্গে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে। এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে এদিকে সরকারের দৃষ্টি দেওয়া উচিত বলে মনে করি আমরা। বিশেষ করে সার, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও কৃষিবিদরা।

সর্বোপরি আমরা বলতে চাই যে, বস্তুত কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হলে সবার আগে প্রয়োজন কৃষকদের উৎসাহিত করা। কিন্তু দেশে কৃষিপণ্য বিপণনের যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা কৃষকদের বরং নিরুৎসাহিতই করে অনেক ক্ষেত্রে। অনেক সময় কৃষকরা উৎপাদিত পণ্যের যে দাম পান, তা উৎপাদন খরচের সমান হয়ে দাঁড়ায়। লাভ হয় মূলত মধ্যস্বত্বভোগীদের। এ ব্যবস্থা চলে আসছে যুগের পর যুগ। বর্তমানে যখন দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে, তখন এ বিপণন ব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন আনার সুযোগ এসেছে বলে মনে করি আমরা। এটি হতে হবে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কৃষক সরাসরি ভোক্তাদের কাছে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। এতে কৃষকরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি উপকৃত হবেন ভোক্তারাও। আমরা মনে করি, সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করা সবচেয়ে জরুরি। কাজেই কৃষি উপকরণে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি প্রদান; খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও সার আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলা-এসব বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading