জি-২০ সম্মেলন: রাশিয়ার বিরুদ্ধে সব একাট্টা
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৬ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৩:১৫
ইন্দোনেশিয়ার বালিতে মঙ্গলবার (১৫ নভেম্বর) শুরু হয়েছে দুদিনব্যাপী জি-২০ সম্মেলন। বিশ্বের ২০টি বৃহৎ অর্থনীতির দেশের এই জোটের সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ নেতারা। বর্তমান বৈশ্বিক মন্দা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে এই সম্মেলন কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা প্রথম দিনের আলোচনা থেকেই ফুটে ওঠে। এদিন আয়োজক ইন্দোনেশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইন্ডিয়াসহ সবদেশের সরকার প্রধানগণই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানান। এদিকে, নিজেদের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির
মহামারি করোনার প্রকোপে এখনও বিপর্যস্ত বিশ্ব। এরমধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ গোটা বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির করে ফেলেছে। দিনকে দিন বাড়ছে সংকট। বিশ্ববাসীর শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য তাই অবিলম্বে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। ইন্দোনেশিয়ার বালিতে শুরু হওয়া জি-২০ সম্মেলনের প্রথম দিনে বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর সরকার প্রধানদের বক্তব্যে এসব কথাই ফুঠে ওঠে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদে উদ্বোধনী বক্তব্যে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের মধ্যে বিশ্বকে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এবং মতবিরোধ দূর করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এবারের সম্মেলনে যোগ দেননি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তার বদলে এসেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। এছাড়া, জি-২০ জোটের সদস্য না হলেও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে সম্মেলনে উপস্থিত হতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল আয়োজক ইন্দোনেশিয়া।ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বক্তব্য রাখেন। রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের ফলে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি লাখো মানুষকে দারিদ্রের দিকে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে মন্দার দিকে ঠেলে দেয়ার পর জি২০ নেতারা বালিতে একত্রিত হয়েছেন।

‘অবশ্যই যুদ্ধ বন্ধ করতে’ হবে’: ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো ইউদোদো জি২০ সদস্যদের ‘যুদ্ধ বন্ধ করতে’ বলেছেন। মঙ্গলবার বালিতে এই সম্মেলন উদ্বোধনকালে তিনি এ আহবান জানান। সম্মেলনের উদ্বোধন অধিবেশনের প্রাক্কালে তিনি নেতাদের বলেন, দায়িত্বশীল হওয়ার অর্থ কোন এক পক্ষের একতরফা লাভবান হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা নয়, এখানে দায়িত্বশীল হওয়ার অর্থ আমাদেরকে অবশ্যই এ যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে। যুদ্ধের অবসান ঘটাতে না পারলে, এতে বিশ্বের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।রাশিয়ার নাম উল্লেখ না করে উইদোদো বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে আরেকটি শীতল যুদ্ধের সুযোগ না দিতে সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমাদের বিশ্বকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করা উচিত হবে না। আমাদের বিশ্বকে আরেকটি শীতল যুদ্ধে পড়তে দেয়া অবশ্যই উচিত না। উইদোদো বলেন, বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশগুলোর এ ব্লককে বিশ্বের গভীরতম এ সংকট মোকাবেলায় অবশ্যই সফল হতে হবে।তিনি প্রতিনিধিদের বলেন, আজ বিশ্বের নজর আমাদের দিকে। আমরা কি সাফল্য পাবো? নাকি আরো একটি ব্যর্থতা যোগ করবো? আমার পক্ষ থেকে আমি বলতে পারি যে জি২০ অবশ্যই সফল হবে। এটি অবশ্যই ব্যর্থ হবে না।

চীন ও ফ্রান্সকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ইউক্রেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্যারিস ও বেইজিংকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বালিতে চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের সাথে তিনি বৈঠক শুরু করার পর এ আহ্বান জানান। জি২০ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে এ দুই নেতা বৈঠক শুরু করার সময় তারা করমর্দন করেন। এ সম্মেলন রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসন প্রশ্নে মস্কোর ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি এবং যুদ্ধের কারনে বৈশ্বিক মন্দা মোকাবেলায় সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।শি’কে ম্যাক্রোঁ বলেন, আমাদের অবশ্যই ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের মতো আন্তর্জাতিক সংকটের প্রতিক্রিয়া জানাতে বিভিন্ন শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এদিকে শি জিনপিং তার সূচনা বক্তব্যে ইউক্রেন সংঘাতের বিষয় উল্লেখ না করে তিনি আরও বিস্তৃতভাবে দুই দেশের জন্য ‘স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন, উন্মুক্ততা এবং সহযোগিতার চেতনাকে সমুন্নত রাখার’ আহ্বান জানিয়েছেন।

সকল সমস্যা সমাধান করতে পারেন কেবলই পুতিন: ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিয়ে ঋষি সুনাক রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ইউক্রেনে রাশিয়া হামলা করায় এ সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্টের ওপর নিজের ক্ষোভ ঝেড়েছেন সুনাক। তিনি জানিয়েছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী অসংখ্য সমস্যা ও অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। এখন কেবল পুতিন এসব সমস্যার সমাধান করতে পারেন।রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের উপস্থিতিতেই রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সমালোচনায় মুখর হন ঋষি সুনাক। এছাড়া ইউক্রেন থেকে রুশ সেনাদের প্রত্যাহার ও ‘বর্বর যুদ্ধ’ বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি। পুতিন চলমান বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান করতে পারবেন উল্লেখ করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব কিছু পরিবর্তনের ক্ষমতা একজন মানুষের (পুতিনের) রয়েছে। এটি উল্লেখযোগ্য যে, আমাদের সঙ্গে এখানে যোগ দিতে সমর্থ হননি পুতিন। যদি তিনি থাকতেন, তাহলে আমরা বিষয়গুলো খুঁজে বের করতে পারতাম। পুতিনই ইউক্রেন থেকে রুশ সেনাদের প্রত্যাহার ও এই বর্বর যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবেন।

পরবর্তী সম্মেলনে শান্তির বাণী শোনাতে চান মোদি: ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, আমি বারবার বলছি, আমাদের একটা পথ খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের যুদ্ধবিরতি ও ইউক্রেনে গণতন্ত্রের পথে ফিরতে হবে। গত শতকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বে ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। সেসময়ই বিশ্ব নেতারা শান্তির জন্য চেষ্টা করেছিলেন। এখন আমাদের পালা।নরেন্দ্র মোদি আরও বলেছেন, এখন শান্তির জন্য সমবেত প্রয়াস জরুরি। আমি আশা করি, পরের বছর জি-২০ সম্মেলন যখন বুদ্ধ ও গান্ধীর পবিত্র ভূমিতে হবে, তখন আমরা সমবেতভাবে বিশ্বকে শান্তির বাণী শোনাতে পারব। এবার জি-২০ জোটের চেয়ারম্যানের পদ পাবে ইন্ডিয়া। পরের বছর জি-২০ সম্মেলন ইন্ডিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে। মোদি সেই কথাই বলেছেন। এছাড়া বিশ্বের সামনে এখন যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে, সেগুলোর কথা বলেছেন নরেন্দ্র মোদি। সেগুলো হলো- জলবায়ু পরিবর্তন, ইউক্রেন সংঘাত, করোনা এবং বিশ্বের অর্থনীতিতে তার প্রভাব। তিনি বলেছেন, বিশ্বের সব জায়গায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব দেখা দিয়েছে। প্রতিটি দেশের গরিব মানুষের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। প্রতিদিনের জীবনযাপন তাদের কাছে সংগ্রামের মতো।ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, আমাদের এটা মেনে নিতে কোনও দ্বিধা করা উচিত নয় যে, জাতিসংঘ এই সব সমস্যার মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে। আর আমরা উপযুক্ত সংস্কার কর্মসূচি নিতে ব্যর্থ হয়েছি। তাই বিশ্ব এখন জি-২০ জোটের দিকে তাকিয়ে আছে। জি-২০ এখন আরও প্রাসঙ্গিক হয়েছে।

যুদ্ধ শেষ করার ‘এখনই সময়’: এদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শেষ করার এবং হাজারো মানুষের জীবন বাঁচানোর এখনই সময়। জি-২০ সম্মেলনে মঙ্গলবার এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তিনি এ আহ্বান জানান। জেলেনস্কি তার বক্তব্যে রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্রের হুমকির কঠোর সমালোচনা করেন। পুতিনের এমন অস্পষ্টতাপূর্ণ বক্তব্যের উল্লেখ করে জেলেনস্কি বলেন, যা বেইজিংকেও অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইলের জন্য কোন অজুহাত থাকতে পারে না এবং হতে পারে না। তিনি এটি পরিস্কার করার জন্য রাশিয়াকে বাদ দিয়ে ‘জি১৯’কে স্পষ্টভাবে ধন্যবাদ জানান।

‘শান্তি আলোচনায় বড় বাধা ইউক্রেনের শর্ত’: যতদিন ভ্লাদিমির পুতিন প্রেসিডেন্ট থাকবেন ততদিন রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি আলোচনা করবেন না বলে ডিক্রি জারি করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমিরি জেলেনস্কি। আর জেলেনস্কির এমন কঠিন শর্তকে রাশিয়া শান্তি আলোচনার ‘অন্তরায়’ হিসেবে দেখছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ।

তিনি বলেছেন, ইউক্রেন আলোচনা করার জন্য যেসব শর্ত দিয়েছে এগুলো অবাস্তব। মঙ্গলবার জি-২০ সম্মেলনে সাংবাদিকদের কাছে এমন মন্তব্য করেন প্রভাবশালী এ রুশ মন্ত্রী। তিনি বলেন, সব সমস্যা ইউক্রেনের দিকে, তারা খোলাখুলিভাবে আলোচনায় বসার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছে এবং শর্ত জুড়ে দিচ্ছে, যেগুলো আসলে অবাস্তব।পুতিনের ডানহাত খ্যাত ল্যাভরভ জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রোর কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন তিনি। এছাড়া জার্মানির চ্যান্সেলর ওলফ শলৎজের কাছেও রাশিয়ার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইউডি/সুপ্ত

