নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে ব্যাহত উন্নয়নকাজ

নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে ব্যাহত উন্নয়নকাজ

সিয়াম রায়হান । শুক্রবার, ১৮ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ০৭:০০

নাজুক হয়ে পড়লেও শব্দদ্বয়ের শরীরে কোনো মরিচা পড়েনি। চকচকে তলোয়ারের মতো এখনো সে ধারালো। প্রতিনিয়ত সেই ধারালো তলোয়ারের আঘাতে কত মানুষ যে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে বাজারদর চড়ছেই- এটাই বাস্তবতা। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে হঠাৎ বেড়ে গেছে নির্মাণসামগ্রীর দাম। চড়া দামে এসব সামগ্রী কিনতে হচ্ছে নির্মাণশিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের। ইতোমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছে এই চড়া দামের কারণে। ফলে তলোয়ারের আঘাত মালিকদের যতটা না লেগেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন নির্মাণশ্রমিকরা। মানবেতর জীবনে প্রবেশ করতে হয়েছে অনেক শ্রমিক পরিবারকে।

নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে তিনটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে অস্বাভাবিক গতিতে। এ তিনটি পণ্যই হচ্ছে এ শিল্পের ক্ষেত্রে অপরিহার্য উপাদান। আর উপাদান তিনটির একটি রড, দ্বিতীয়টি এঙ্গেল ও তৃতীয়টির নাম সিমেন্ট। যার একটিকে বাদ দিয়ে এ শিল্পকে চলমান রাখা সম্ভব নয়। মূল্যবৃদ্ধির হার স্তরভেদে ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ যে রড ও এঙ্গেলের বাজারমূল্য ছিল টনপ্রতি ৫৫ হাজার টাকা, মাত্র চার মাসের ব্যবধানে তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার টাকায়। সমান তালে বস্তাপ্রতি সিমেন্টের দাম বেড়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। স্বল্প সময়ের মধ্যে এ মূল্যবৃদ্ধি খোদ সরকারকেও করেছে উদ্বিগ্ন। সরকার উদ্বিগ্ন হলেও শিল্পমালিকরা এ মূল্যবৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন নন। উদ্বিগ্ন ক্রেতাপক্ষ। একই সঙ্গে উদ্বিগ্ন অর্থনীতিবিদরা। অনেকের মতে, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায়। ইতোমধ্যে মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাবে আবাসন ব্যবসা অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। বেকার হচ্ছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সংকট এবং ডলার সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের নির্মাণ খাতে। অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে নির্মাণসামগ্রীর দাম। বিশেষ করে রডের দাম আকাশছোঁয়া। ডলারের তীব্র সংকটের কারণে অনেকে এলসি খুলতে পারছেন না। সিমেন্টের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। পাশাপাশি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ইট, বালু ও সিমেন্টের দাম। জীবনযাত্রার সার্বিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকের মজুরিও এখন দ্বিগুণের কাছাকাছি। এসব কারণে নির্মাণ খরচ বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প ছাড়াও ব্যক্তিপর্যায়েও নির্মাণকাজ একরকম থমকে গেছে। লোকসানের ঝুঁকি থাকায় সরকারি অনেক প্রকল্পে কাজ বন্ধ রেখেছেন ঠিকাদাররা।

কাজ না করার ঘোষণা দেওয়ায় বাধ্য হয়ে সরকারের কোনো কোনো প্রকল্পে দ্বিতীয় দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। জানা গেছে, বেশিরভাগ সরকারি প্রকল্পের কাজ আটকা পড়েছে ধীরগতির ফাঁদে। ঠিকাদাররা বসে আছেন রেট শিডিউল বাড়ানোর অপেক্ষায়। ইতোমধ্যে বেশকিছু সরকারি সংস্থা রেট শিডিউল পুনর্র্নিধারণ করা সত্ত্বেও মূল্যবৃদ্ধির পাগলা ঘোড়ার সঙ্গে ঠিকাদাররা পেরে উঠছেন না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রায় এক বছর ধরে নির্মাণসামগ্রীর বাজার অস্থির। বাজার স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ নেই। তবে এবারের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে অন্য বছরের দাম বৃদ্ধির কোনো মিল নেই। প্রায় ছয় মাস ধরে নির্মাণসামগ্রীর বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেটাও ধারণা করা যাচ্ছে না। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর আমদানি খরচ। বস্তুত ইট, বালু, পাথর, রড, সিমেন্ট, রেডি মিক্স, বিটুমিন এবং লোহাজাতীয় সব জিনিসের দাম উপকরণভেদে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ডলারের তীব্র সংকটের কারণে শতভাগ মার্জিন দিয়েও অনেকে এলসি খুলতে পারছেন না। বড় অনেক ব্যাংকেও প্রয়োজনীয় ডলার নেই। এই যখন অবস্থা, তখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই শতাংশ ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত।

প্রকল্পের ধীরগতির কারণে যেসব সমস্যা সৃষ্টি হয় তা বহুল আলোচিত। এ অবস্থায় বাজারমূল্য বিবেচনায় নিয়ে সরকারি প্রকল্পের রেট শিডিউল পুনর্র্নিধারণ করা সম্ভব কিনা, তা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। তবে বিদ্যমান সংকটকে অজুহাত হিসাবে নিয়ে কেউ যাতে প্রকল্পের কাজে গাফিলতি না করে, সে জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে। প্রকল্পের কাজের শৃঙ্খলা যাতে নষ্ট না হয় সেদিকেও কর্তৃপক্ষকে খেয়াল রাখতে হবে। সৃষ্ট সংকট কোনো কারণে দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হলেও কাজের গতি যাতে অব্যাহত থাকে সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। বর্তমান বাস্তবতায় সব খাতের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা রোধে কর্তৃপক্ষকে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক- কলামিস্ট।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading