নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা: সংসার খরচের হিসাব মিলছে না

নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা: সংসার খরচের হিসাব মিলছে না

শরীফুল হায়দার । সোমবার, ২১ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ০৮:৩০

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের (অক্টোবর ২০২১ থেকে অক্টোবর ২০২২) ব্যবধানে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ হয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন বলছে, স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মোটা চাল ও খোলা আটার দাম গত বছরের অক্টোবরে ছিল যথাক্রমে ৫৩ টাকা ও ৪১ টাকা ৯৫ পয়সা, যা এ বছরের অক্টোবরে হয়েছে ৫৭ টাকা এবং ৫৫ টাকা ৮৭ পয়সা। তবে বিবিএসের তথ্য যাই বলুক-বাস্তবতা হলো, বাজারে ৬০ টাকার কমে মোটা চাল মিলছে না।

বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, মসুর ডাল ১২০ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, মুগ ডাল ১২৯ থেকে ১৩৩ টাকা, চিনি ৮০ থেকে বেড়ে ৯৯ টাকা হয়েছে। তবে বাজারে ১১৫ টাকার কমে চিনি পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া বিবিএসের হিসাবে বছরের ব্যবধানে মিল্কভিটার প্যাকেটজাত দুধ প্রতি লিটার ৭০ থেকে বেড়ে ৭৭ টাকা হয়েছে বলা হলেও বাস্তবে গত সেপ্টেম্বরে বাজারে প্রতি লিটার তরল দুধ ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, বর্তমানে যা ৮৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

বস্তুত শুধু চাল, চিনি ও দুধ নয়, বিবিএসের তথ্যের সঙ্গে বর্তমান প্রায় প্রতিটি পণ্যের বাজারমূল্যের বিস্তর ফারাক রয়েছে। অপ্রিয় হলেও সত্য-বাজারের ক্ষেত্রে কোনো বিধিবদ্ধ নিয়ম বা পরিসংখ্যানই কাজ করছে না এখন; বাজার চলছে মূলত কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের মর্জিমাফিক।

গত বুধবার (১৭ নভেম্বর) বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেছে, সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১২ টাকা বাড়িয়ে ১৯০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চিনির দাম কেজিতে ১২ টাকা বাড়িয়ে ১০৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজারে শুধু তেল বা চিনির দামই নয়, হু হু করে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম; যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। বিশেষ করে কাঁচাবাজারে গেলেই মানুষ বুঝতে পারে যে, তার পরিবারের সদস্যদের তিনবেলা খাবারের জন্য প্রয়োজনীয় মাছ-মাংস আর সবজি কিনতে তার কী পরিমাণ টাকা গুনতে হবে। এবার যান মসলার বাজারে, সেখানেও একই অবস্থা। এবার যাবেন প্রসাধনীর বাজারে, সেখানেও ব্যতিক্রম কিছু নয়। আসলে সব জায়গায় যদি একই অবস্থা থাকে, তবে সাধারণ মানুষ যাবেটা কোথায়! কোথায় গেলে মিলবে বেঁচে থাকার জন্য একটু স্বস্তি। সমাজের মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির পরিবারগুলোর কর্তারা হারে হারে টের পাচ্ছেন, বাস্তবতা কতটা কঠিন। তারা জানেন যে, দেশে নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও তাদের ইনকাম বা বেতন বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ফলে পুরনো বেতন আর রোজগারে বর্তমান বাজারে ঠিকে থাকাটা কত বড় চেলেঞ্জ। তবুও থেমে নেই জীবন, চলছে কচ্ছপের গতিতে, চলবেই।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কিছু পণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলেও দেশে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। অথচ বাজারে সব পণ্যের দামই বেড়ে চলেছে, যার কারণ একটাই-গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ। ইচ্ছামতো পণ্যের দাম বাড়িয়ে এভাবে ক্রেতাস্বার্থ ক্ষুণ্নকারীদের শক্ত হাতে দমন করা দরকার। গত সেপ্টেম্বরে বিবিএসের তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণায় ১১টি নিত্যপণ্য ও বিভিন্ন সেবার মূল্য এক বছরের ব্যবধানে সর্বনিম্ন ৭ থেকে সর্বোচ্চ ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছিল। উদ্বেগজনক হলো-পণ্য ও সেবার দাম বহুলাংশে বৃদ্ধি পাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও মানুষের আয় মোটেই বাড়েনি।

জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে আপস করেই জীবিকা নির্বাহ করছে দেশের সিংহভাগ মানুষ। অন্যদিকে গত আগস্টে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশে পৌঁছার আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলা হয়েছিল, মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে বাংলাদেশ, যা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় পরিকল্পিত মুদ্রানীতি প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলে মনে করি আমরা। সরকার অবশ্য সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বিচক্ষণতার পরিচয় দেওয়া জরুরি। তা না হলে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো কঠিন হবে। প্রকৃত অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: কলামিস্ট।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading