সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষা ব্যবস্থা: প্রকৃত শিক্ষিত প্রজন্ম কি গড়ে তুলছে?
আরাফাত রহমান । সোমবার, ২১ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ০৮:০০
প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান ও পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক সূচনালগ্ন হতেই চলে আসছে। সৃজনশীল পদ্ধতি প্রবর্তনের এক দশক পর জানা গিয়েছিল, দেশের প্রায় ৪২ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সঠিকভাবে এ পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র প্রণয়নের দক্ষতা অর্জন করতে পারেননি। তখন আমরা আশা করেছিলাম, শিগ্গিরই সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা তাদের অদক্ষতা দূর করতে সক্ষম হবেন। দুঃখজনক হলো, দেড় দশক পরও প্রায় ৩৮ শতাংশ শিক্ষক এ পদ্ধতি যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে পারেননি। প্রশ্ন হলো, এ অদক্ষ শিক্ষকদের কাছে শিক্ষার্থীরা কী শিখছে? যারা দীর্ঘ সময় পরও এ পদ্ধতি যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে পারেননি, তাদের এ পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকা নৈতিক কি?
আগামীতে বিজ্ঞানের গবেষণা এমন উচ্চপর্যায়ে পৌঁছাবে যে, তখন মানুষের মস্তিষ্ক ও কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা যৌথভাবে কাজ করে সমস্যা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া খুঁজে বের করবে। এ উদাহরণ থেকে ধারণা করা যায় আমাদের শিক্ষার্থীদের কতটা যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে।
বস্তুত দেশের বর্তমান উন্নয়নধারা আরও বেগবান করতে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির বিকল্প নেই। এর জন্য দরকার যোগ্য শিক্ষক। যারা প্রবর্তনের কয়েক বছর পরও সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রণয়নে দক্ষতা অর্জন করতে পারেন না, এমন শিক্ষক দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অন্তরায়। যাদের দক্ষতা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তারা শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পেলেন কী করে? এসব শিক্ষকের অদক্ষ থাকার সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ জড়িত থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এ খাতের দুর্নীতি দূর করতে হবে। একজন শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব জ্ঞানের আলোর সঙ্গে শিক্ষার্থীর অন্তর্লোকের সম্পর্ক স্থাপন করা। এ কাজে দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রত্যেক শিক্ষককে অব্যাহত অর্জনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়; এ অর্জনের প্রধান মাধ্যম বই। প্রশ্ন হলো, কতজন শিক্ষক নিজেকে আলোকিত করার কাজে নিবেদিত রয়েছেন?
সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতির কারণে কোচিং ও গাইডনির্ভরতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরো বেড়ে গেছে। যে কারণে গাইড বই এবং কোচিং ব্যবসার এখন রমরমা অবস্থা। এমনকি শিক্ষকদের কেউ কেউ নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তে ক্লাসে পাঠদান এবং প্রশ্ন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গাইড বই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এ প্রবণতা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অশনি সংকেত। অন্যদিকে গণিত এবং ইংরেজি বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি বহালের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কোনো কোনো শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ ও গবেষকগণ। শিক্ষার্থীদের বড় অংশের কাছে দীর্ঘদিন ধরে এই দু’টি বিষয় আতঙ্কের কারণ হয়ে রয়েছে। তার ওপর সৃজনশীল পদ্ধতির প্রবর্তন আরো হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি করেছে। দেশের শিক্ষার বাস্তব পরিস্থিতির কথা বিবেচনা না করে খামখেয়ালি পন্থায় সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালু এবং কৃত্রিমভাবে পাসের হার বেশি দেখানোর হীনউদ্দেশ্যে কোচিং সেন্টারগুলোকে দিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটছে। সত্যি বলতে কী, সৃজনশীল পদ্ধতির নামে বর্তমানে যা চলছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পাসের হার আগের চেয়ে বাড়লেও প্রকৃত শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে উঠছে না। বাড়ছে না শিক্ষার মান। এটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সৃজনশীল শিক্ষার নামে কার্যত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তথাকথিত সৃজনশীল পদ্ধতির কারণে একজন শিক্ষক স্বাভাবিক পন্থায় পাঠদান করতে পারছেন না শ্রেণিকক্ষে। সৃজনশীল পদ্ধতির নামে শিক্ষাক্ষেত্রে এক ধরনের নৈরাজ্য চলছে বলে অনেকেই অভিমত পোষণ করেছেন। স্বীকার করা হচ্ছে যে, যুগের পরিবর্তনের সাথে শিক্ষা ব্যবস্থারও পরিবর্তন ঘটে থাকে। তবে সে পরিবর্তন হতে হবে দেশের শিক্ষা জগতের বাস্তবতার বিষয়গুলো মাথায় রেখে।
এ কথা সত্য যে, বস্তুত শিক্ষকতা আর পাঁচটি পেশার মতো নয়। শিক্ষকতা যে একটি ব্রত, তা কতজন শিক্ষক যথাযথভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম? অদক্ষ শিক্ষকের হাতে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি হবে কীভাবে? আগামী বছর থেকে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হচ্ছে। আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য শিক্ষা খাতে সংযোজন-বিয়োজন অব্যাহত থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে শিক্ষা খাতের অর্জন নিশ্চিত করতে দরকার যোগ্য, দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। দেশের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে। এ জন্য সব পর্যায়ে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক: অনলাইন বিশ্লেষক।
ইউডি/কেএস

