নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ কাম্য
মার্জিয়া সুলতানা । সোমবার, ২১ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ০৯:২০
একটি দেশের সামগ্রিক সমৃদ্ধি অর্জন এবং জীবনযাপনের মান উন্নয়নে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশ অনেক দিক থেকেই এগিয়ে যাচ্ছে। নারীরা নিজ যোগ্যতা বলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। তদুপরি এখনো নানা ধরনের সংকট বিদ্যমান। সহিংসতা বন্ধ হয়নি। নানাভাবে নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বলা দরকার, যখন এমনটি জানা যাচ্ছে, নারীর প্রতি যেসব সহিংসতা হয় তার মধ্যে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা বেশি হচ্ছে বলে মনে করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ- তখন এটি আমলে নেওয়া এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য বলেই প্রতীয়মান হয়।
গত বুধবার বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে সংগঠনের সুফিয়া কামাল ভবন মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতন চিত্র-২০২১ : ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন হয়রানি ও যৌতুক’ শীর্ষক সমীক্ষার তথ্য-উপাত্তগুলো উপস্থাপনের লক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়। সমীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেছে, ২০২১ সালে ধর্ষণ ৮১০টি, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ২২৫টি, ধর্ষণের চেষ্টা ১৯২টি, উত্ত্যক্তকরণ ও যৌন হয়রানি ৯৬টি ও যৌতুকের ১১৪টি ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বিগত বছরগুলোর মতো এ বছরও ধর্ষণের শিকার নারী ও কন্যার সংখ্যা বেশি। নারীদের তুলনায় কন্যারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে বেশি। সমীক্ষায় উঠে এসেছে, শিশুরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিচিত মানুষ, বিশেষ করে নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়। এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় যে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে তরুণদের সম্পৃক্ততা বেশি।
এটাও অত্যন্ত উদ্বেগের যে, নারীরা নিজ গৃহে সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ এবং ঝুঁকির মধ্যে থাকে- এমনটিও উঠে এসেছে। মূলত নারী ও কন্যার প্রতি সহিংসতার মূল কারণ নারীর প্রতি অধস্তন মনোভাব ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এটাও যখন জানা যাচ্ছে, তখন এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। লক্ষণীয়, দেশে নানা ক্ষেত্রে মেয়েরা এগিয়ে এলেও সহিংসতা বন্ধ হয়নি। ফলে একদিকে আইনের প্রয়োগ অন্যদিকে সমাজের মানসিকতা পরিবর্তন, চিন্তাচেতনার উন্নয়নেও কাজ করতে হবে। পত্রপত্রিকায় এমন বিষয় উঠে এসেছিল যে, বাংলাদেশে নারীদের প্রতি তিনজনে দুইজন নিজের ঘরে নির্যাতনের শিকার এবং অধিকাংশই ঘটনাগুলো চেপে যান। আমরা মনে করি, নারী নির্যাতনের চিত্র আমলে নিয়ে এর ভয়াবহতা অনুধাবন করে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও এর পরিপ্রেক্ষিতে উদ্যোগী হওয়ার বিকল্প নেই। ফলে নারী বিরুদ্ধে সহিংসতার চিত্র পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের সমাজব্যবস্থা এমনই যে, এখানে প্রতিনিয়ত নারীরা লাঞ্ছিত-নিপীড়িত হচ্ছেন। একজন নারী যদি নিজের বাড়িতেও নানানভাবে নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে নারীরা আমাদের সমাজে কতটা ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করেন তা সহজেই অনুমান করা যায়। অথচ এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশকে এগিয়ে নিতে, দেশের সার্বিক সমৃদ্ধি অর্জনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও শিক্ষা বাড়াতে সরকার নানান পদক্ষেপ নিয়েছে। আগের তুলনায় নারী আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন হয়ে গড়ে উঠছেন, নিজের অধিকারটা বুঝতে পারছেন। কিন্তু এত কিছুর পরেও নারী নির্যাতন বন্ধ হয়নি- যা পরিতাপের।
আর যখন এটা জানা যাচ্ছে, নারীর প্রতি যেসব সহিংসতা হয় তার মধ্যে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা বেশি হচ্ছে- তখন পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা আমলে নেওয়ার বিকল্প নেই। সর্বোপরি আমরা বলতে চাই, নারীর প্রতি সহিংসতা কিংবা নির্যাতনের মতো যে কোনো ঘটনা ঘটলে তা আমলে নিতে হবে। দোষীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধ রোধে কঠোর হতে হবে। নারী নির্যাতনের ভেতর দিয়ে স্পষ্ট হতে পারে, সমাজ ক্রমেই মনুষ্যত্বহীন হয়ে উঠছে। ফলে সমাজ বিনির্মাণের কথাও ভাবা দরকার। আইনের প্রয়োগ ঘটানো ছাড়াও পরিবার থেকে সচেতনতা বাড়াতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সংশ্লিষ্টরা প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করুক এমনটি কাম্য।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/কেএস

