কাতারে ফুটবলের বিশ্বযুদ্ধ: পিছিয়ে নেই বাঙালিরাও

কাতারে ফুটবলের বিশ্বযুদ্ধ: পিছিয়ে নেই বাঙালিরাও

আফরা আনিকা । বুধবার, ২৩ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ০৯:৩০

অপেক্ষার প্রহর শেষে শুরু হয়েছে ‘২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ’-এর এবারের আসর। কাতারে আয়োজিত এবারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করছে ৩২টি দেশ। স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীর সব দেশের সব বয়সের মানুষের কাছে ফুটবল যেন একটি অনুভূতির নাম। আর তা যদি হয় বিশ্বকাপের মতো আয়োজন তাহলে তো আর কথাই নেই। বিশ্বজুড়ে উন্মাদনার নাম ফুটবল। ফুটবল নিয়ে বিশ্বজুড়ে আবেগের অন্ত নেই। পৃথিবীতে যত ধরনের খেলাধুলা রয়েছে, তার মধ্যে ফুটবলই একমাত্র খেলা, যা অধিকাংশ দেশেই জনপ্রিয়। মূলত অল্প সময়, নান্দনিকতা, খেলার গতি ইত্যাদি কারণে ফুটবলের মতো জনপ্রিয় খেলা খুব বেশি নেই। যদিও এ উপমহাদেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা গত কয়েক দশকে বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে কয়েকটি দেশের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ। কিন্তু ফুটবল আছে প্রতিটি দেশেই।

ফুটবলপ্রেমীরা বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজন করে থাকে। এদিক দিয়ে আমরা বাঙালিরাও কিন্তু পিছিয়ে নেই। বরং বলা যায় এই বিশ্বকাপ নিয়ে আমাদের আবেগ, ভালোবাসা, প্রত্যাশা একটু বেশিই। তবে এই প্রত্যাশা, আবেগই যেন অনেক সময় ব্যক্তি জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান সময়ে দেখা যায়, বিশ্বকাপ এলেই একটা বিশেষ শ্রেণির উদ্ভব হয়। যাদের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র খেলা উপভোগ করা নয়। এই খেলাকে কেন্দ্র করে সমর্থনভিত্তিক দল গড়ে উঠে। চলে মোটা অঙ্কের বাজি খেলার আয়োজন। এই বাজি খেলতে গিয়ে অনেকে তাদের সব হারায়। এমনকি সমর্থকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতও হতে দেখা যায়। খেলার হারজিত নিয়েও অনেক স্থানে ঝামেলা হতে দেখা যায়, যা একেবারেই কাম্য নয়। তবে বাঙালিরা শুধু খেলা দেখা অবধিই নয়, বরং বিশ্বকাপ নিয়ে করে থাকে নানা আয়োজন। কেউ কেউ দেখা যায়, প্রিয় দলের পতাকা দিয়ে বাড়ির সাজসজ্জা সম্পূর্ণ করে, কেউ-বা পুরো বাড়িই প্রিয় দলের পতাকার আদলে এঁকে ফেলে, কেউ-বা বানিয়ে ফেলে সুদীর্ঘ পতাকা। কিন্তু অতি উৎসাহিত হয়ে পতাকা টাঙাতে গিয়ে অসাবধানতার ফলে দুর্ঘটনার স্বীকার হয়। যেমন কিছুদিন আগেই এক শিক্ষার্থী তার প্রিয় দলের পতাকা টানাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। অনেক সময় পতাকা টাঙাতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটে। তাই এসব বিষয়ে অবশ্যই সাবধান হতে হবে। শুধু বাইরের সাজসজ্জাই নয়, এই বিশ্বকাপ জুড়ে চলে রং-বেরঙের জার্সির মেলা। ফুটবলপ্রেমীরা তাদের প্রিয় দলের জার্সি পরিধান করে খেলা উপভোগ করে থাকে। মহল্লায় মহল্লায় অনেকে এক হয়ে বড় স্ক্রিনের আয়োজন করে থাকে এবং সেখানে সবাই একত্রিত হয়ে খেলা দেখে। এ যেন এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

বাংলাদেশ বিশ্বকাপের মূলপর্বে না খেললেও এই মহাযজ্ঞের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাল-সবুজের দেশটির নাম। কারণ, বাংলাদেশও বিশ্বকাপ খেলে। সেটা প্রাক-বাছাইপর্ব হোক কিংবা বাছাই পর্ব। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব থেকে অংশ নিয়ে আসছে বাংলাদেশ। যে বাছাই পর্ব হয়েছিল মূলপর্বের এক বছর আগে ১৯৮৫ সালে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের অভিষেক হয়েছিল ১৯৭৩ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত মারদেকা কাপে থাইল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। তার এক বছর আগে ১৯৭২ সালে গঠন হয়েছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। ১৯৭৪ সালে ফিফা ও এএফসি’র সদস্য পদ পাওয়ার এক বছর আগেই বাংলাদেশের অভিষেক হয়েছিল আন্তর্জাতিক ফুটবলে। তার এক যুগ পর বিশ্বকাপের বাছাই খেলার সুযোগ পায় লাল-সবুজের দেশ। কখনো প্রাক-বাছাই, কখনো বাছাইয়ে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ দৌড়টা থেমে যায়, সেটাই বাস্তবতা। কিন্তু বিশ্বকাপ আসলে বাংলাদেশের মানুষের উম্মাদনার কমতি থাকে না এক চুলও। বিশ্বকাপে খেলতে না পারার দু:খটা মনে থাকে না যখন খেলা শুরু হয় মূলপর্বের। বাংলাদেশের দিকে তাকালে বোঝাই যাবে না- এই দেশটি নেই বিশ্বকাপের মূলপর্বে। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো আমরা শামিল হই অন্যদের উৎসব-আনন্দে।

অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর চেয়ে কোন অংশে কম থাকে না বাংলাদেশের মানুষের উম্মাদনা। কেবল রাত জেগে টিভিতে খেলা দেখে কিংবা পত্রপত্রিকায় বিশ্বকাপ নিয়ে নানা খবর পড়েই থেমে থাকেন না বাংলাদেশের মানুষ, নানা আয়োজনের বিশ্বকাপের উচ্ছ্বাসে রং ছিটায়। দালানের ছাদে, কিংবা গাছের মগডালে প্রিয় দলের পতাকা উত্তোলন, কে কত বড় পতাকা তৈরি করতে পারে তার প্রতিযোগিতায়ও মেতে উঠে এই দেশের মানুষ। ফুটবল যে বাঙালির প্রাণের খেলা তার প্রমাণ মেলে চার বছর পরপর বিশ্বকাপ এলে। ফুটবল ভালোবাসে বলেই সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে যেখানেই বিশ্বকাপ হোক, হৃদয় নিয়ে কাছে নিয়ে আসেন সবাই। যেখানেই বিশ্বকাপ হোক সেই মহোৎসবে আমাদেরও থাকে সরব অংশগ্রহণ।

মনে রাখতে হবে, বিশ্বকাপ আয়োজন করা হয়ে থাকে সবাইকে আনন্দ দেওয়ার উদ্দেশ্যে। তাই যে দলই বিজয়ী হোক না কেন, প্রিয়দলের খেলাকে কেন্দ্র করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে তার দিকে দৃষ্টি রেখেই আমরা যেন এই বিশ্বকাপ উপভোগ করি-এই বিষয়টা সবাইকে মাথায় রাখতে হবে। দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়া মহাদেশে এবং প্রথমবারের মতো আরব দেশে অনুষ্ঠিত এ বিশ্বকাপের আয়োজন সফল হোক- এ প্রত্যাশা সতত।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইউডি/আতা/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading