অনুমোদনহীন ভবন যেন মৃত্যুফাঁদ: সবকিছুতেই পরিকল্পনাহীনতার ছাপ
আব্রাহাম কোরাইশি । বুধবার, ২৩ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ১০:১০
রাজধানী ঢাকায় অবৈধভাবে (নকশা ও রাজউক অনুমোদন বিহীন) প্রচুর ভবন গড়ে উঠছে। এসব ভবন এক একটি মৃত্যু ফাঁদ। বিভিন্ন সময়ে এসব ভবন ধসে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন। হঠাৎ করেই বহুতল ভবন ধসে পড়ে, কাত হয়ে যায়, নিকট অতীতে খোদ রাজধানীতেই এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। পরে রাজউক এসে বলে, ভবনটির অনুমোদন ছিল না। প্রচুর মানুষ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন হাউজিং কম্পানি বা আবাসন প্রতিষ্ঠান থেকে ‘আবাসিক প্লট’ কিনে প্রতারিত হচ্ছে। বড় অভিযোগ হলে রাজউক বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থা কোনো দায়দায়িত্ব নেয় না। ‘অনুমোদন নেই’ বলে দায় এড়িয়ে যায়। অনুমোদন ছাড়াই ঢাকায় নির্মিত হচ্ছে শত শত বহুতলবিশিষ্ট ভবন। নিয়ম না মানায় ভবনগুলো একদিকে ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে এগুলো নিয়ে বিরোধ লেগেই আছে। নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত ইমারত (ভবন) নির্মাণে আইন থাকলেও তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেই। ১৯৫২ সালে প্রণীত আইনের আওতায় তৈরি করা হয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা। অথচ, ৫ যুগ পরেও আইনটি বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা সমন্বিত কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। এতে করে সারা দেশেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ প্রবণতা বেড়েই চলেছে।
রাজধানীর অনেক এলাকায় নকশা অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণকাজ কিভাবে চলছে, এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অপ্রিয় হলেও সত্য, দেশে দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির সঙ্গে হরহামেশাই দলীয় লোকজনের সম্পৃক্ততার কথা শোনা যায়। এজন্য দায়ী মূলত রাজনীতির বর্তমান ধারা। দেখা যায়, কোনো দল ক্ষমতাসীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সমর্থিত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর দাপট এবং দৌরাত্ম্য মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। বলা বাহুল্য, এ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয় অস্ত্র ও পেশিশক্তি দ্বারা। শাসকগোষ্ঠীর দায়িত্ব হচ্ছে, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ-দুর্দশা লাঘবে যত্নবান হওয়া। হতাশার বিষয় হলো, দেশের কোথাও এ চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে না; বরং প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষ প্রতিনিয়ত হয়রানি ও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, রাজউকের (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) নির্ধারিত আইন ও বিধিবিধান পাশ কাটিয়ে জবরদস্তিমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ কিংবা তাদের পৃষ্ঠপোষকতাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হলে চলমান শাসন ব্যবস্থা ও আইনের প্রতি দেশের মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বস্তুত হাতিরঝিলের মিরবাগ এলাকার ঘটনাটিকে লঘু অপরাধ হিসাবে গণ্য করে দুর্বৃত্তদের আধিপত্য বিস্তারকে উৎসাহিত করা হলে সমাজে দুবৃর্ত্তায়নের প্রসার ঘটবে, যা মোটেই কাম্য নয়।
সূত্রমতে, ঢাকা ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) আওতাধীন এলাকায় প্রতি বছর গড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার ভবন নির্মাণের নকশার অনুমোদন দেওয়া হয়। এর বাইরেও প্রতি বছর শত শত বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে কোনো প্রকার নকশা অনুমোদন ছাড়াই। অনুমোদনবিহীন এসব ভবন একদিকে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে তেমনি বিরোধপূর্ণ। নিয়ম না মানার কারণে ভবনের মালিকরা তাদের খেয়াল-খুশিমতো জায়গা না ছেড়েই ভবন নির্মাণ করছেন। অনেক ভবন এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হলেও এ বিষয়ে প্রতিকারের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না। ভবনধসে মানুষ মারা যাওয়ার পর কয়েক দিন একটু তদারকি করলেও মাস না যেতেই তা আবার শিথিল হয়ে যায়। আমরা চাই অনুমোদনহীন আবাসন ব্যবসা এবং মানুষের সঙ্গে প্রতারণা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহর গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অনেক কিছুই এখানে অনুপস্থিত। এছাড়া ঢাকা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতিপূর্বে অন্য জরিপে প্রকাশ পেয়েছে ঢাকা বিশ্বের দূষিত নগরগুলোর মধ্যে অন্যতম। এছাড়া যানজট, যানবাহন এবং কলকারখানার কালো ধোঁয়া, খাদ্যে ভেজাল, সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিম্নমানও ঢাকার জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অধিক জনসংখ্যার চাপে ন্যূজ্ব এই শহরে নেই পয়ঃনিষ্কাষণের সুষ্ঠু ব্যবস্থা। জনসংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি-ঘোড়া। কিন্তু সে তুলনায় রাস্তাঘাট, হাসপাতাল স্কুল-কলেজ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি নাগরিক সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। সবকিছুতেই পরিকল্পনাহীনতার ছাপ। অথচ, রাজধানী ঢাকাই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। এজন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/আতা/কেএস

