কাতার বিশ্বকাপে হট ফেবারিট ব্রাজিল: নেইমারের অনিশ্চিত যাত্রা
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২ । আপডেট ১২:১৫
বিশ্বকাপ এলেই যেন ভাগ্যের কাছে হার মানতে হয় নেইমারকে। ২০১৪ সালে ঘরের মাটিতে চোটে পড়ার পর এবার ব্রাজিলের হেক্সা মিশনে কাতারেও চোটে পড়েছেন এই জাদুকর। বিশ্বকাপের পরবর্তী ম্যাচগুলোতে তার মাঠে নামা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছেই। ব্রাজিলের কোটি কোটি সমর্থকরা তবুও আশা ছাড়ছেন না। বিস্তারিত লিখেছেন অপূর্ব ইব্রাহীম
নেইমারের চোটে ভক্তদের কান্না: বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত হয়ে গেছে ব্রাজিলের। গ্রুপ পর্বের এক ম্যাচ হাতে রেখেই পরের রাউন্ডে পা রেখেছে নেইমারের দল। তবে দলের প্রাণভোমরার মাঠে ফেরা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সার্বিয়ার বিপক্ষে খেলতে নেমে পায়ে চোট পাওয়ার পর এবার জ্বরের কবলে পড়েছেন এই সুপারস্টার। তাকে মাঠে ফিরে পেতে মরিয়া বক্তরা। তারা প্রার্থনা করছেন যেন দ্রুত সুস্থ হন নেইমার। সার্বিয়া বিপক্ষে সেই ম্যাচে নেইমারকে ৯ বার ফাউল করেন প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা। এটিই এই বিশ্বকাপে কোনো একক ফুটবলারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ফাউলের রেকর্ড। নেইমার কবে সুস্থ হতে পারবেন সে ব্যাপারে এখনও পর্যন্ত কিছু বলতে পারেননি চিকিৎসকরা। সমর্থকদের চাওয়া নকআউট পর্বের খেলায় চিরচেনা রূপে মাঠে ফিরে আসুক নেইমার। তবে ফিরে আসার অপেক্ষায় আছেন খোদ নেইমারও । ফেসবুকে তিনি লিখেন, আমি আবার চোটের কবলে পড়েছি, যা খুবই কষ্টের এবং বিরক্তিকর। আমি নিশ্চিত যে ফিরে আসব। ব্রাজিলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে আমি কতটা গর্ব অনুভব করি, বোঝাতে পারব না।

ব্রাজিল কোচের আশা ফিরবেন নেইমার: ব্রাজিলের প্রাণভোমরা নেইমার জুনিয়র ইনজুরিতে পড়ে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ থেকে ছিটকে গিয়েছেন। গোড়ালির চোটে পড়া ব্রাজিলিয়ান এই সুপারস্টারের বিশ্রামে দিন কাটছে। তবে ব্রাজিল কোচ তিতে আশাবাদী যে নেইমার আবার দলে ফিরবেন। তিনি বলেছেন, আমি চিকিৎসক নই। বিশেষজ্ঞও নই। তবে আমি বিশ্বাস করি চোট সারিয়ে নেইমার দলে ফিরবে। আবার ব্রাজিলের হয়ে খেলবে। তিনি আরও বলেছেন, নেইমারের মতো ফুটবলাররা মাঠে অবিশ্বাস্য কিছু করে দেখাতে পারে। নেইমার আমাদের জন্য কী করেছে তা সবাই জানে। ওর বিকল্প পাওয়া কঠিন। এদিকে, সতীর্থ মারকুইনোস বলেছেন, নেইমার ২৪ ঘণ্টা ফিজিয়োর সঙ্গে থাকছে। এটা থেকেই প্রমাণিত ও দলে ফিরতে কতটা মরিয়া। আমরা জানি না নেইমার কবে ফিরতে পারবে। তবে আমরা চাইব দ্রুত সুস্থ হয়ে ও মাঠে নামুক।
কিংবদন্তি পেলেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার হাতছানি: এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ১০ ম্যাচে ৬ গোল করেছেন নেইমার। ব্রাজিলের জার্সিতে আর মাত্র ২ গোল করলে ছুঁয়ে ফেলবেন কিংবদন্তি পেলেকে। ব্রাজিলের মাটিতে ২০১৪ সালে বিশ্বকাপে নেইমারের অভিষেক হয়। ৫ ম্যাচে ৪টি গোল করেন। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়া ম্যাচে চোট তাকে ছিটকে দেয়। ২০১৮ সালে রাশিয়াতেও ৫টি ম্যাচ খেলে ২টি গোল করেন। বিশ্বকাপে মোট ৬ গোল। ব্রাজিলের জার্সিতে এখনও অবধি ৭৫টি গোল রয়েছে নেইমারের। অন্যদিকে ৯২ ম্যাচে ৭৭ গোল নিয়ে ব্রাজিলের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড এখন পর্যন্ত পেলের দখলেই আছে। বিশ্বকাপে বল পায়ে আর মাত্র ৩টি গোল করলেই পেলেকে ছাড়িয়ে যাবেন। কাতারের মাটিতেই সেই রেকর্ড ছুঁতে চাইবেন নেইমারও। ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমারের ম্যাচপ্রতি গোলের গড় ০.৬২; যা পেলের ক্ষেত্রে ০.৮৪। ৮১ বছর বয়সী পেলে ১২ বছরে তিন (১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০) বিশ্বকাপ হাতে তুলেছেন। বিশ্বকাপে নেইমারের সেরা সাফল্য ২০১৪ সেমিফাইনাল খেলা।

আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসো: কঠিন সময়ে নেইমারের সমর্থনে এগিয়ে এলেন ব্রাজিলের দুবারের বিশ্বকাপ জয়ী সাবেক স্ট্রাইকার রোনালদো। ইনস্টাগ্রামে খোলা চিঠিতে উত্তরসূরির প্রতি নিজের ও দেশবাসীর সমর্থন তুলে ধরেন। লেখেন, কিছু অংশ বাদে পুরো দেশের জনগণই নেইমারকে ভালোবাসে। আমি নিশ্চিত, আমার মতো বেশিরভাগ ব্রাজিলিয়ানই তোমার প্রশংসা করে এবং ভালোবাসে। তোমার প্রতিভা তোমাকে এতদূর নিয়ে গেছে, বিশ্বের প্রতিটি কোণে তোমার জন্য ভালোবাসা ও প্রশংসা রয়েছে। আর তুমি যে জায়গায় পৌঁছেছো, সেখানে থাকার কারণে এত ইর্ষা ও বিদ্বেষ মোকাবেলা করতে হবে তোমার। এই ধ্বংসাত্মক শক্তির (নেইমারের সমালোচক) মৌখিক সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আজ আমি তোমাকে লিখছি: আরও শক্তিশালী হয়ে, আরও স্মার্ট হয়ে, লক্ষ্যের জন্য ক্ষুধার্ত হয়ে ফিরে এসো। মাঠে ও মাঠের বাইরে তুমি যা কিছু ভালো করো, তা তোমার প্রতি হিংসার চেয়ে অনেক বড়। তিনি আরও লিখেন, এক সেকেন্ডের জন্যও ভুলে যেওনা সেই পথচলা, যা তোমাকে বিশ্ব ফুটবলের আইডল বানিয়েছে। ব্রাজিল তোমাকে ভালোবাসে! প্রকৃত ভক্তদের, যারা তোমার পাশে আছে- তাদের তোমার গোল, ড্রিবল, সাহসিকতা ও আনন্দের প্রয়োজন! দেশের অধিকাংশ জায়গা থেকে আসা ভালোবাসা উপভোগ করো। আর এসব ঘৃণা বারুদে পরিণত হোক।

মধ্যপ্রাচ্যে ব্রাজিলের বিজয়ের সাম্বা নৃত্য দেখার অপেক্ষা : হেক্সা মিশনে এবার মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে পা রাখে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। দলের প্রধান অস্ত্র নেইমার এখনও বিশ্বকাপ শিরোপার স্বাদ পায়নি, তাই এবার নিজের প্রথম ট্রফির সঙ্গে ব্রাজিলের হেক্সাও পূর্ণ করতে চানি তনি, যদিও চোটে পড়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন এই সুপারস্টার। আর ব্রাজিলিয়ানরা অপেক্ষায় আছেন মধ্যপ্রাচ্যেও সাম্বা নৃত্যের মাধ্যমে নিজেদের বিজয় উদযাপনের। ব্রাজিলের অলিতে-গলিতে, যে সাম্বা নৃত্যের নুপুর নিক্কন ধ্বনিত হয় সকাল-সন্ধ্যা কাতারের মরুপ্রান্তরেও সেই উৎসবের নজির গড়তে চায় ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা। এই সাম্বা নৃত্য নিয়ে বলা হয়ে থাকে, এটি পুরোপুরি ব্রাজিলের নয়। আফ্রিকান দাসদের নাচের মুদ্রার সঙ্গে ব্রাজিলিয়ান সংস্কৃতির মিশেলে এর জন্ম। এই শব্দের উৎপত্তি আরবি শব্দ জুম্বা বা জাম্বা থেকে-এমন ধারনাও বেশ শক্ত। এ তথ্য সত্যি হলে আরবি অধ্যুষিত সেই কাতারের মরুদ্যানে সাম্বার ফিরে আসা চমকপ্রদ ব্যাপার বটে।কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে সার্বিয়াকে ২-০ গোলে হারানোর পর নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে এক ম্যাচ বাকী রেখেই এবারের বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে ব্রাজিল। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের সাথে-সাথে রেকর্ড বইয়ে নাম তুলেছে ব্রাজিল। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে এ নিয়ে টানা ১৭টি ম্যাচ অপরাজিত থাকলো তারা। এই রেকর্ড গড়ার পথে জার্মানিকে পেছনে ফেলেছে ব্রাজিল। ১৯৯০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে টানা ১৬ ম্যাচে অপরাজিত ছিলো জার্মানরা। ১৯৯৮ সালে সর্বশেষ নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে হেরেছিলো ব্রাজিল। এরপর ২০০২, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বে টানা ১৫ ম্যাচে অপরাজিত থাকে ব্র্রাজিল। এবার কাতারে বিশ্বকাপ জিতে মধ্যপ্রাচ্যেও সাম্বা নৃত্য ছড়ানোর অপেক্ষায় কোটি ব্রাজিলিয়ান ভক্ত।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে বাংলাদেশে উন্মাদনা বিশ্বে নজর কেড়েছে: বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে বাংলাদেশ খেলার সুযোগ না পেলেও ফুটবলের উন্মাদনা নজর কেড়েছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার। এশিয়ার এই ছোট্ট দেশটিতে যে কত কোটি ফুটবল ভক্তের আবাস তা শুধু ফিফাই নয় বিশ্ববাসীও অবাক হয়ে তাকায়। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে অহরহ সংবাদ হচ্ছে লাল-সবুজের দেশের ফুটবল উন্মাদনা নিয়ে। ওয়াশিংটন পোস্টও সম্প্রতি ফলাও করে তা প্রচার করে।বাংলাদেশের আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উন্মাদনা নিয়ে টুইটারে নিজেদের ভেরিফায়েড পেজে ভিডিও পোস্ট করার পর এবার ব্রাজিল সমর্থকদের উন্মাদনাও বিশ্বকে জানাতে ভুলেনি সংস্থাটি। এর আগে, আর্জেন্টাইন পেশাদার ফুটবল লীগ তাদের টুইটার ও ফেসবুকে মেসির হাতে বাংলাদেশের পতাকা সম্বলিত ভার্চুয়াল ছবি পোস্ট করে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের রাতে বাংলাদেশি ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের উল্লাস নিজেদের পেজে পোস্ট করে ফিফা।

নিজেদের অফিসিয়াল টুইটারে ২টি ছবি সংযুক্ত করে একটি পোস্ট করে। যার ক্যাপশনে লিখা হয়েছে, ফুটবলের মতো করে আর কিছুই মানুষকে কাছে আনে না। সুইজারল্যান্ডকে ব্রাজিলের হারানো দেখতে রাতে বাংলাদেশের ঢাকায় সমর্থকদের ভীড়। ফিফা তাদের এই পোস্টের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সম্মান জানিযেছে আর তা এলো ফুটবলের মাধ্যমেই। ব্রাজিলের ম্যাচ দেখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বড় পর্দায় খেলা দেখছে হাজারো দর্শক। গোল ও জয়ের পর ব্রাজিল সমর্থকদের উল্লাসের কয়েকটি ছবিই ফিফা তাদের টুইটারে প্রকাশ করেছে। এছাড়ও রাজধানীসহ সারাদেশে খেলার সময় সবকিছুই যেন স্থবির হয়ে পড়ে। সবার নজর থাকে টেলিভিশনের পর্দায়। এমন উš§াদনার সৃষ্টি যেন বিশ্বকাপ ফুটবলেই ঘটে। আর হাজার মাইল দূরে থেকেও কোনো দেশের প্রতি এমন পাগলামো বিশ্বে বিরলই বটে।

ইউডি/এজেএস

