মরক্কোর সামনে সেমিফাইনালের হাতছানি : মহাকাব্য রচনার পথে আশরাফ হাকিমি
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৩:১০
স্বপ্নেরমতো বিশ্বকাপ কাটছে মরক্কোর। আশারফ হাকিমির হাত ধরে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার-ফাইনালে লড়বে তারা। এবার ওদের সামনে সেমিফাইনালের হাতছানি। আশরাফ হাকিমি ও তার দল মরক্কোকে নিয়ে আসাদ এফ রহমানের বিশ্লেষণ
নয়া ইতিহাস লেখার অপেক্ষায় মরক্কো: ইতিহাসে প্রথম আরব দেশ হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপের সেরা আটে জায়গা করে নিয়েছে মরক্কো। মাত্র চতুর্থ আফ্রিকান হিসেবে এই পর্যায়ে এসেছে দেশটি। শেষ ষোলোতে শক্তিশালি স্পেনকে টাইব্রেকারে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে মরক্কো। ১৯৯০ সালে ক্যামেরুন, ২০০২ সালে সেনেগাল ও ২০১০ সালে ঘানা খেলেছিল কোয়ার্টার-ফাইনালে। এবার তাদের ছাড়িয়ে শেষ চারে ওঠার লড়াইয়ে নামবে আশারফ হাকিমিরা। পর্তুগালের বিপক্ষে আজ যদি তারা জিতে যায় তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে সেরা চারে উঠবে। মরক্কোর বিশ্বকাপ অভিষেক ১৯৭০ সালে। আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব পার করেছিল তারা, ১৯৮৬ আসরে। ১৯৯৮ সালে স্কটল্যান্ডকে হারানোর পর বিশ্বকাপে মরক্কোর প্রথম জয় এসেছে এবারের আসরে, গ্রুপ পর্বে বেলজিয়ামের বিপক্ষে। বিশ্বকাপের আঙিনায় সাফল্য-খরা পীড়িত আফ্রিকার আশার পালে এখন পর্যন্ত হাওয়া দিয়ে চলেছে তারাই। গত আসরের রানার্সআপ ক্রোয়েশিয়াকে গোলশূন্য ড্রয়ে রুখে দিয়ে কাতার বিশ্বকাপে পথচলা শুরু মরক্কোর। এরপর বেলজিয়ামকে ২-০ গোলে উড়িয়ে, কানাডাকে ২-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হয়ে উঠে আসে শেষ ষোলোয়। শেষ ষোলোয় স্পেনের বিপক্ষে মরক্কোর পক্ষে বাজি ধরার লোক খুব কমই ছিল। কিন্তু দৃঢ় রক্ষণ আর গতিময় পাল্টা আক্রমণে গ্রুপ পর্বে একের পর এক জয় তুলে নেওয়া আশরাফ হাকিমি-হাকিম জিয়াশরা শেষ পর্যন্ত বাজিমাত করে ছেড়েছেন।

মা-ছেলের অমর কাব্য-মুগ্ধ গোটা বিশ্ব: দেশটির এতোদূরে আশার অন্যতম কারিগর আশরাফ হাকিমি এখন বিশ্বজুড়েই আলোচনায়। আর এর নেপথ্যে ছিলো ছেলে ও মায়ের ভালোবাসার গল্প। তাদের স্নেহমাখা চুমুর ছবি এখন ভাইরাল। আশরাফ হাকিমির জীবন সহজ ছিলো না। সংগ্রাম করেই নিজের অবস্থান তৈনি করতে হয়েছে তাকে। আর এই সংগ্রামের অন্যতম যোদ্ধা তার মা সাইদা মু। যে মা তার সন্তানদের মানুষ করতে করেছেন পাহাড়সমান কষ্ট। পরিবার সামলাতে স্পেনে করেছেন বাসাবাড়ি পরিষ্কারের কাজ। তার বাবা হাসান হাকিমিও কষ্ট করেছেন স্পেনের রাস্তায় রাস্তায়। ফেরি করে বিক্রি করেছেন মালামাল।
জীবনের গল্প নিয়ে লুকোচুরি ছিলো না: পিএসজির রাইটব্যাক আশরাফ হাকিমি নিজের জীবনের গল্প নিয়ে কখনোই কোনো লুকোচুরি করেননি। তিনি বলেছেন, আমার মা ঘর পরিষ্কার করতেন। বাবা ছিলেন রাস্তায় ভাসমান বিক্রেতা। আমরা একটি সাধারণ পরিবার থেকে এসেছি। যারা জীবিকার জন্য সংগ্রাম করেছিল। আজ আমি প্রতিদিন তাদের জন্য লড়াই করি। তারা আমার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেছেন। তারা (মা-বাবা) আমার ভাইদের আমার সফলতার জন্য অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করেছিলেন।

শেকড়ের প্রতি অন্যরকম টান: বিশ্বকাপে মরক্কো দলটি নিয়ে যতবার আলোচনা হয়েছে, ততবার এসেছে আশরাফ হাকিমির নাম। হাকিমি দলটির সবচেয়ে বড় তারকা। সবচেয়ে বড় মুহূর্তে তিনি নিজের স্নায়ু নিয়ন্ত্রণে রেখে, পেনাল্টি শট নিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেছেন। স্পেনের বিপক্ষে টাইব্রেকারে হাকিমির গোলের পরই জয় নিশ্চিত হয় মরক্কোর। জাতীয়তা মরোক্কান হলেও স্পেনের রিয়াল মাদ্রিদে জন্ম আশরাফ হাকিমির। শিকড়ের প্রতি আশরাফ হাকিমির টানও প্রশংসনীয়। কারণ, তিনি ইচ্ছে করলে স্পেনের জন্য খেলতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে খেলছেন মরোক্কোর জন্য। এটি তার পিতৃভ‚মি। জন্মসূত্রে স্পেনের নাগরিক হলেও তিনি মরক্কোরও নাগরিক, জš§ ১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর মাদ্রিদে। আশরাফের ভাষ্য, ক্লাব ফুটবলে খেলা মানে শুধু একটি শহরের জন্য খেলা। আর দেশের হয়ে খেলা মানে পুরো জাতির জন্য খেলা। এই খেলা মানে পূর্বপুরুষদের জন্য খেলা। আজ স্টেডিয়ামে থাকবে আশরাফ হাকিমির পুরো পরিবার। যদি এ ম্যাচে ইতিহাস গড়েন হাকিমিরা তবে সেটা হবে আনন্দঅশ্রু আর যদি হেরে বিদায় নেন তবেও চোখে জল থাকে, তখন সেটা হবে সংগ্রামী জীবনের প্রাপ্তির ফল।
ইউডি/এজেএস

