ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস: সরকারের সফল এক উন্নয়ন দর্শন
জুলকার নাঈম হায়দার । সোমবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২২ । আপডেট ০৯:৩৫
জাতীয় ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস আজ সোমবার। প্রতিবছর ১২ ডিসেম্বর জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর দিবসটি পালন করে। ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশ সরকার এ দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের ঘোষণা দেয়। ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর আইসিটি দিবসের পরিবর্তে এ দিনকে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আইসিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় দেশে ই-গভর্নমেন্ট সেবাপ্রাপ্তি ছিল শূন্যের কোঠায়, বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৬০ কোটি ৫০ লাখে। গেল ১৩ বছরে আইসিটি খাতে প্রশিক্ষণ পেয়েছে ১৫ লাখ ১৫ হাজার, ১৩ বছর আগে দেশে ডিজিটাল ক্লাসরুম/ডিজিটাল ল্যাব একটিও ছিল না, সেই শূন্যতা কাটিয়ে দেশে এখন তা ৮৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে। চলমান আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব নির্মাণ প্রকল্প।
দেশে ৭ হাজার ৬০২টি ডিজিটাল সেন্টার, ৮ হাজার ২০০ ডিজিটাল ডাকঘরের মাধ্যমে ৬০০ ধরনের ডিজিটাল সেবা পাচ্ছে সাধারণ মানুষ। মোবাইল সিম নিবন্ধন হচ্ছে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে, জাতীয় পরিচয়পত্র স্মার্টকার্ড আকারে প্রদান করা হচ্ছে, যা এক সময় ধারণারও বাইরে ছিল। ইতোমধ্যে দেশে মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের (এমআরপি) যুগ পেরিয়ে ই-পাসপোর্ট চালু হয়েছে। ২০১৮ সালের ১২ মে মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে মহাকাশ বিজ্ঞানের যুগে প্রবেশ করেছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।
বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে প্রায় সাড়ে ১২০০ ধরনের সেবা পাওয়া যাচ্ছে। ২০০৮ সালে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিলেন মাত্র ৮ লাখ, যা গত অক্টোবরে দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৬১ লাখেরও বেশি। ২০১২ সালের জানুয়ারিতেও যেখানে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৬৫ লাখ, সেখানে গত অক্টোবরে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ১৬ লাখে। ২০০৮ সালে দেশে ৪-জি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল শূন্য, আর বর্তমানে দেশের ৯৮ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৪-জি মোবাইল প্রযুক্তির আওতায় এসেছে। পরীক্ষামূলক ৫-জি চালুর মধ্য দিয়ে আমরা আরও গতিশীল যুগে প্রবেশ করেছি। আজ বাংলাদেশ ৫৭তম স্যাটেলাইট ক্লাবের সদস্য, পারমাণবিক ক্লাবের সদস্য।
দেশের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়েছে অপটিক্যাল ফাইবার। গেল ১৩ বছরে দেশে গড়ে উঠেছে ৪৬টি হাইটেক পার্ক ও ইনকিউবিশন সেন্টার। ২০০৮ সালে দেশে ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা ছিল শূন্য, সেই সংখ্যা বর্তমানে সাড়ে ৬ লাখ ছাড়িয়েছে। বছরে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালের মধ্যে পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য ৩০০টি স্কুল অব ফিউচার, ১৩০০০ শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব, ৬৪টি জেলায় একটি করে শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টারসহ মোট ৯২টি হাইটেক পার্ক স্থাপন করছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ।
বাংলাদেশ আজ বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ডাটা সেন্টারের দেশ। আমরা আজ সুবিশাল ওয়েব পোর্টালের মালিক যেখানে যুক্ত আছে ৪৬ হাজারেরও বেশি সরকারি অফিস, ২০০৮ সালে যা ছিল শূন্যের কোঠায়। জাতীয় তথ্য বাতায়ন ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় তথ্য বাতায়নে ১ মিলিয়ন নাম্বার নিয়ে ই-ডিরেক্টরি করা হয়েছে। মাসে এ ই-সার্ভিস ব্যবহার করছে ২ মিলিয়ন মানুষ। ওয়েবসাইটে রয়েছে ৫০ লাখ কনটেন্ট। আর এসবের উন্নয়নে কাজ করছে এক হাজারেরও বেশি টিম। কনটেন্ট আপডেট করার জন্য আছেন এক লাখেরও বেশি প্রশিক্ষিত কর্মী।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ক্লাসরুম, ডিজিটাল ল্যাব প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সব কনটেন্ট ডিজিটাল করা, সরকারের অভ্যন্তরে সম্পূর্ণ ডিজিটাল রূপান্তর করা, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন থেকে শুরু করে পরীক্ষার ফলপ্রাপ্তি, চাকরির আবেদনসহ সরকারি প্রায় সব ধরনের সেবা প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে। করোনাকালীন সময়ে মানুষ ঘরে বসেই জরুরি খাদ্য সহায়তা, করোনাবিষয়ক তথ্যসেবা, টেলিমেডিসিন সেবা পেয়েছেন।
ইন্টারনেট ব্যবহার সহজলভ্য হওয়ায় দেশে মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যাংকিং, ই-কমার্স খাতেরও দ্রুত জনপ্রিয়তা বেড়েছে এবং দ্রুতগতিতেই এ খাতের প্রসার হচ্ছে। অনলাইনের মাধ্যমে ঘরে বসেই মানুষ বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, ক্রেডিট কার্ড ইত্যাদির বিল এখন পরিশোধ করতে পারছে। করোনা মহামারিতে সারা দেশের মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহারের উপকারিতা পেয়েছে। আজ প্রত্যন্ত অঞ্চল একেবারে গ্রামে বসে কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ যে কোনো তথ্য পাচ্ছেন। করোনার সময়েও আমাদের অর্থনীতি অন্যান্য দেশের তুলনায় মজবুত অবস্থায় আছে। এটা শুধু ডিজিটালাইজেশনের কারণে সম্ভব হয়েছে। মোবাইলে আর্থিক সেবা, রাইড শেয়ারিং, ই-কমার্স, বাস- ট্রেন-বিমানের টিকিট ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি সেবা মিলছে। ই-পর্চা, ই-মিউটেশন, ই-পাসপোর্ট, ই-চালান, ই-টেন্ডার, ইএফটি, ই-নথি, অনলাইনে পেনশনভাতাসহ নানা সেবার কারণে মানুষের জীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। ই-টেন্ডার, ই-নথির কারণে দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডে গতি ও স্বচ্ছতা এসেছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকার লক্ষ্যের চেয়েও অনেক বেশি অর্জন করেছে। বিগত বছরগুলোতে ডিজিটাল বাংলাদেশের কর্মযজ্ঞ শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন এবং সেবা প্রদানের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এর বিস্তৃতি ছড়িয়েছে বিশ্বজুড়ে। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া সাউথ-সাউথ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সোমালিয়া, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, ফিজি, ফিলিপাইন ও প্যারাগুয়ের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে এসডিজি, ওপেন গভর্নমেন্ট ডাটা চেইঞ্জ ল্যাবসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান এবং সেবা বা সিস্টেম আদান-প্রদান করা হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে নানা উদ্যোগ ও কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের ঝুলিতে এসেছে জাতিসংঘের সাউথ-সাউথ কো-অপারেশন অ্যান্ড ভিশনারি অ্যাওয়ার্ড, আইসিটি সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি (ডব্লিউএসআইএস) উইটসা, এসোসিও অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।
ইউডি/কেএস

