বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার নীরব পদধ্বনি
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২২ । আপডেট ১০:৫৫
মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রকোপ ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ২০২০ সাল থেকেই বৈশ্বিক অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। সংকটের মধ্য দিয়েই ২০২২ সালও অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু কোনো আশার সঞ্চার নেই নতুন বছরেও। ২০২৩ সালও অর্থনীতিতে মন্দার নিরব পদধ্বনি বইবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞগণ। এ নিয়ে সিফাত আবদুল্লাহ’র বিশ্লেষণ
রেকর্ড মূল্যস্ফীতি বড় কারন: করোনার ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ২০২১ সালে কিছুটা গতি পেয়েছিলো বিশ্ব অর্থনীতি। কিন্তু ২০২২-এর শুরুতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়ায় দেশে দেশে রেকর্ড মূল্যস্ফীতি শুরু হয়। নতুন বছর ২০২৩ সালে এই সংকট অবসানের লক্ষণ তো নেই বরং পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়তে গিয়ে দেশে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যেভাবে একই সময়ে সুদের হার বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে, তার প্রতিক্রিয়ায় ২০২৩ সালে বিশ্বে মন্দা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে বিশ্ব ব্যাংক।
সূত্রপাত হতে পারে আমেরিকা থেকে: ব্রিটেনের সেন্টার ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ বলছে, ২০২৩ সালের এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার সাক্ষী থাকতে পারে গোটা বিশ্ব। ২০০৮ সালের মতো এবারও এই আর্থিক মন্দার সূত্রপাত হতে চলেছে সেই আমেরিকা থেকেই। আমেরিকার বিশ্বখ্যাত সাময়িকী ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’র এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, উচ্চমাত্রার মুদ্রাস্ফীতি, এবং অর্থনৈতিক সংকোচনের প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ মাসের মধ্যে আমেরিকায় অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে। ব্লুমবার্গে জোশ উইংগ্রোভের লেখা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বছরের মধ্যে আমেরিকায় অর্থনৈতিক ধস নামার সম্ভাবনা ১০০ শতাংশ, যা সে দেশের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জন্য একটি দুঃসংবাদ।
সতর্ক অবস্থানে সরকার: অর্থনৈতিক মহামন্দার এমন শঙ্কার পরিস্থিতি নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি স্পষ্ট করেই বলেছেন যে আগামী বছর বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা সবচেয়ে খারাপ আকার ধারণ করবে। তিনি এই মন্দা মোকাবেলায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন এবং এই লক্ষ্যে সবাইকে সাশ্রয়ী এবং উদ্যোগী হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন। সরকারপ্রধান বেশকিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছেন, যেমন দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি, দৈনন্দিন জীবনে সাশ্রয়ী হওয়া এবং রপ্তানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া। মন্দার শঙ্কা কাটাতে আমদানি ব্যয় হ্রাস করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে কার্যকরভাবে। আমদানি ব্যয় যাতে অকারণে বৃদ্ধি না পায় তার ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রায় সাশ্রয় হবে এবং সেই সঙ্গে দেশে দ্রব্যমূল্য কিছুটা হলেও কম হবে।
মূলত এসবই মন্দা মোকাবেলার জন্য এই মুহূর্তে সর্বোৎকৃষ্ট পদক্ষেপ এবং সে কারণেই এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে এখন থেকেই। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তারা যত দ্রুত এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে ততই আগামী বছরের আশঙ্কার মন্দা মোকাবেলার কাজটি অনেক সহজ হবে।
আইএমএফ’র পূর্বাভাস আশা জগাচ্ছে: তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এত কিছুর পরও মনে করছে, বিশ্ব অর্থনীতি ২০২৩ সালে সম্প্রসারিত হবে। প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ২ দশমিক ৭ শতাংশ, আর ওইসিডির পূর্বাভাস, প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ২ শতাংশ। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) বলছে, জি-২০ ভুক্ত ও উদীয়মান দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির গড় হার দাঁড়াবে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এই বাস্তবতায় দেশে দেশে সরকারের প্রতি ওইসিডির আহ্বান, পারিবারিক সহায়তা দেওয়া হোক।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফও এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে অর্থনীতির চাকা আরও স্লথ হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। আইএমএফ বলেছিল, ২০২২ সালে বিশ্বের মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ২.৯ শতাংশ বাড়তে পারে। তবে আইএমএফ এর মুখপাত্র গেরি রাইস বলেছেন, কিছু দেশ আগামী বছর মন্দার কবলে পড়লেও সেটা বিশ্ব মন্দার রূপ পাবে কি না, তা বলার সময় এখনও আসেনি।

স্থবিরতার কবলে পড়বে ইউরো অঞ্চল: অর্থনীতিবিদেরা ধারণা করছেন, জার্মানি ও ইতালি মন্দার কবলে পড়বে। ব্রিটেনের অর্থনীতি ইতিমধ্যে সংকুচিত হতে শুরু করেছে। ঋণমান নির্ণয়কারী সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মনে করছে, ইউরো অঞ্চল ২০২৩ সালে স্থবিরতার কবলে পড়বে।
ইউডি/কেএস

