ইয়ারলুং জাংবোতে চীনের বাঁধ: বিপাকে ইন্ডিয়া

ইয়ারলুং জাংবোতে চীনের বাঁধ: বিপাকে ইন্ডিয়া

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১২:৩০

পানি নিয়ে যেন যুদ্ধই করতে যাচ্ছে দুই প্রতাপশালী রাষ্ট্র চীন-ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়ার সীমান্ত ঘেঁষে চীনের বৃহৎ বাঁধ নির্মাণের বিপরীতে ইন্ডিয়াও শুরু করেছে নয়া প্রকল্প। পানি নিয়ে উভয় দেশের এই কর্মকাণ্ডের মধ্যখানে অবস্থান নেয়া বাংলাদেশের জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলছেন বিশেষজ্ঞগণ। ইন্ডিয়া-চীনের ‘পানি যুদ্ধ’ ও বাংলাদেশের শঙ্কা নিয়ে বিনয় দাস’র প্রতিবেদন

তিব্বত থেকে ইন্ডিয়া-চীনের বিশাল বাঁধ: তিব্বত থেকে ইন্ডিয়া পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের ওপর ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিশাল বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে চীন। ইন্ডিয়ার অরুণাচল প্রদেশের খুব কাছে অবস্থিত মেডোগে এই বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে দেশটি। বড় স্টোরেজ ক্যাপাসিটি নিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। ইন্ডিয়ার অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তের মেদোগে ইয়ারলুং জাংবোতে (ব্রহ্মপুত্র) ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই চীনা প্রকল্প একাধিক কারণে ইন্ডিয়ার জন্য উদ্বেগের বিষয় হতে পারে। যেমন চীন পানি সরিয়ে নিলে বা নদীর গতিমুখ বদলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে পানির অভাব দেখা দেবে, আবার হঠাৎ পানি ছেড়ে দিলে আসাম ও অরুণাচল প্রদেশের লক্ষাধিক মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং একইসঙ্গে পরিবেশগত উদ্বেগও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন মেডোগ বাঁধকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবেও ব্যবহার করতে পারে, যা ইন্ডিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় হতে পারে। সূত্রের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান গণমাধ্যম বলছে, বাঁধ নির্মাণের পর চীন ব্রহ্মপুত্রের পানি অন্য দিকে সরিয়ে দিতে পারে, এটা চিন্তার বিষয়। শুধু তাই নয়, যে কোনও সময় এই বাঁধ দিয়ে প্রচুর পানিও ছাড়তে পারে, যা অরুণাচল প্রদেশ ও আসামে বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

ফারাক্কা বাঁধের কষ্ট ইন্ডিয়া এবার বুঝবে : ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত গঙ্গার ওপর নির্মিত ইন্ডিয়ার ফারাক্কা বাঁধের প্রতিক্রিয়া যেমন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো উন্নয়ন প্রক্রিয়া ও জনজীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে, তেমনি মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয়ের দিকেও নিয়ে যাচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধের ফলে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ ন্যায্য পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, পলি জমে নদী তল ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানির চাপ সহ্য করতে পারছেনা নদী। ফলে প্রায়ই দেখা দিচ্ছে বন্যা। তেমনি শীত মৌসুমে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেয়ায় বাংলাদেশ মারাত্মক পানিশূণ্যতার সম্মুখীন হচ্ছে। শুকনো মৌসুমে হ্রাসকৃত পানি প্রবাহের ফলে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকার কৃষিক্ষেত্র মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। চীনের ব্রক্ষপুত্র নদে চীন বাঁধ নির্মাণ করলে একই সমস্যার সম্মুখীণ হতে যাচ্ছে ইন্ডিয়া। ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের যে সমস্যা সৃষ্টি করেছে চীনের ওই বাঁধ ইন্ডিয়ায়ও একই সমস্যা সৃষ্টি করবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। ব্রহ্মপুত্রে চীনের এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তর-পূর্ব ইন্ডিয়ায় পানিসঙ্কট দেখা দিতে পারে, তাতে পরিবেশ বিপর্যয়ের মত পরিস্থিতিও দেখা দিতে পারে। আরও ভাটিতে থাকা বাংলাদেশেও এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। তবে সেই প্রভাব কতটা হতে পারে, সে বিষয়ে কোনো ধারণা তারা এখনও দিতে পারছেন না। অরুণাচল প্রদেশে ইন্ডিয়ার ১১ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চীনা বাঁধের বিরূপ প্রভাব কমিয়ে দেবে। তবে অরুণাচল প্রদেশ ঘিরে ইন্ডিয়া ও চীন যে ধরনের বিবাদে লিপ্ত, তাতে জ্বালানির জন্য অদরকারি হলেও ভূরাজনৈতিক প্রয়োজনে তারা বাঁধের জবাবে বাঁধ বানাতেও পারে। সেই ভারতীয় বাঁধ যত নিচের দিকে হবে, বাংলাদেশের দিকে পানিপ্রবাহ তত কমবে। এর মানে হলো, তিব্বতে চীনের পানি আটকে রাখায় যত সমস্যা হবে, অরুণাচলে বাঁধ হলে তা আরও বাড়বে; যেহেতু অরুণাচল থেকেই ব্রহ্মপুত্র বেশি জলধারা পায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ যে পানিটা পায়, তার বেশিরভাগ আসে ইন্ডিয়া থেকে। যে নদীগুলো শেয়ার করছে দু’দেশ, সেগুলোতে ইন্ডিয়া বাঁধ দিচ্ছে; কিন্তু তারা বাংলাদেশের ক্ষতি স্বীকার করতে চায় না।

উত্তরদক্ষিণ । ২১ জাুয়ারি ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা

জলবিদ্যুৎ প্রকল্প দিয়ে ইন্ডিয়ার জবাব: চীনের ‘ওয়াটার ওয়ারস’-এর হুমকির আশঙ্কায় ইন্ডিয়ার অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরিতে ১১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন নিজেদের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প শুরু করেছে ইন্ডিয়া। এছাড়া উত্তর-পূর্বে নিজেদের সীমানার কাছাকাছি চীনের বাঁধগুলোর প্রতিক্রিয়ায় মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ এবং বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের নীতিগত অনুমোদনের পরে এনএইচপিসিতে সম্ভাব্য বরাদ্দের জন্য তিনটি স্থগিত প্রকল্পও ত্বরান্বিত করছে দেশটি। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ইন্ডিয়ার ২ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন লোয়ার সুবানসিরি প্রকল্প চলতি বছরের মাঝামাঝিতে শেষ হবে। বহুমুখী এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়াও বিভিন্ন কাজে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে চীন অস্বাভাবিকভাবে ব্যাপক পরিমাণে পানি ছেড়ে দিলে বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চীনা ডাইভারশনের ক্ষেত্রে এক বছর পর্যন্ত পানির ঘাটতি পূরণেও এই প্রকল্প সহায়তা করবে বলে আশা করছে ইন্ডিয়া। এদিকে ইন্ডিয়ার স্বাদুপানির ৩০ শতাংশ আসে ওই ব্রহ্মপুত্র থেকে এবং একইসঙ্গে দেশটির মোট জলবিদ্যুতের ৪০ শতাংশের যোগান আসে এই নদ থেকে। তবে ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার প্রায় ৫০ শতাংশ চীনা ভূখøে রয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার প্রায় ৫০ শতাংশ চীনা ভূখøে থাকায় উত্তর পূর্ব ইন্ডিয়ায় বিশেষ করে চীনের সঙ্গে লাগোয়া অরুণাচল প্রদেশে হাইড্রো ইলেকট্রিক প্রকল্পগুলোকে দেশটির জন্য কৌশলগত পদক্ষেপ হিসাবে দেখা হয়। কারণ এসব প্রকল্পের মাধ্যমে চীনা বাঁধসহ চীনের নির্মাণাধীন নানা প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলা করতে চায় ইন্ডিয়া।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading