স্বর্গীয় সন্তান
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১৫:০০
সারাহ ইসলাম, ২০ বছর বয়সী তরুণী। পৃথিবী থেকে চলে গেলেন কিন্তু স্থাপন করে গেলেন এমন এক দৃষ্টান্ত যা তাকে অমর করে রাখবে চিরকাল। মাত্র ১০ মাস বয়স থেকেই দুরারোগ্যে রোগে আক্রান্ত সারাহ তার দেহটাকেই দান করে দিয়ে যান। তার দানকৃত কিডনি ও কর্ণিয়া পেয়ে চারজন মানুষ তাদের নতুন জীবনের আলো খুঁজে পেয়েছেন। ‘স্বর্গীয় সন্তান’ সারাহ’কে নিয়ে বিস্তারিত সাদিত কবির’র প্রতিবেদন
সারাহ’র অঙ্গদান অনুপ্রেরণা জাগাবে: সারাহ ইসলাম মাত্র ১০ মাস বয়সে দুরারোগ্য টিউবেরাস স্ক্লেরোসিস রোগে আক্রান্ত হন। প্রায় ১৯ বছর ধরে রোগটির সঙ্গে লড়াই করেন তিনি। এমন রোগ নিয়েও ছোট্ট জীবনে লড়াই করেছেন এই তরুণী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সারাহ জড়িত ছিলেন বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও। সুন্দর ছবি আঁকতেন তিনি। রোগশয্যায় থাকাকালেই নিজের অঙ্গদান করার ইচ্ছার কথা পরিবারকে জানিয়েছিলেন। এ কাজে সবচেয়ে বড় অবদান তার মা শবনম সুলতানা’র। গর্ভধারিণী মায়ের সম্মতিক্রমেই সারা’র দুটি কিডনি ও দুটি কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের সুযোগ মেলে। একইসঙ্গে দেশে অঙ্গ প্রতিস্থাপন চিকিৎসায় যে বড় ধরনের জট লেগেছিল সেই জট খুলে খুলে যায়। আর এর মাধ্যমেই বাংলাদেশও নতুন এক অধ্যায়ের যাত্রা শুরু করলো। সারা’র দেখাদেখি অনেকেই অনুপ্রাণিত হবেন অঙ্গদানে, আর তাতে বেঁচে যাবে আরও কিছু প্রাণ। অস্ত্রোপচার দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, মৃত ব্যক্তির শরীর থেকে অঙ্গ নিয়ে প্রতিস্থাপন এত সহজ ছিল না। পরিবার থেকেই নানা বাধা থাকে। এক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। ইসলামে প্রাণ বাঁচানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হলেও অনেকে ভুল বোঝেন, দান করতে চান না। এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের মানুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, সারাহকে বীরের মর্যাদা দেওয়া উচিত। মরণোত্তর কিডনি দানে উদ্বুদ্ধ করতে এই দান মানুষের কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে।

মানুষকে ভালো রাখাই ছিল ধ্যান-জ্ঞান: সারাহ ইসলামের মা শবনম সুলতানা গণমাধ্যমকে জানান, ২০ বছর বয়সী সারাহ রোগশয্যায় থেকে নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করার ইচ্ছা মাকে জানিয়েছিলেন। শবনম সুলতানা বলেন, সারাহ সত্যি স্বর্গীয় সন্তান ছিল। ও আমাকে বলেছিল, আমার সবকিছু গবেষণার জন্য দিয়ে দিতে পারো মা। তিনি আরও বলেন, সারাহ যেখানে যেত, ব্যবহার দিয়ে সবাইকে মোহিত করে রাখত। সারাহর ইচ্ছা ছিল, ওর ব্রেন নিয়ে গবেষণা হোক। শবনম সুলতানা আরও বলেন, আমার মেয়ে দানশীল, মানবপ্রেমী ছিল। মানুষকে আনন্দ দেয়াই ওর ব্রত ছিল। নিজে অসুখী ছিল এটা কখনও প্রকাশ করতো না। মানুষকে ভালো রাখাই ছিল ধ্যান-জ্ঞান স্কুলশিক্ষক মা তার কন্যাকে হারিয়েছেন। কিন্তু ব্রেন ডেড হয়ে যাওয়া কন্যার দুটি কিডনি প্রতিস্থাপন করে বেঁচে গেল দুটি জীবন। তার দুটি কর্নিয়া দুজন অন্ধ মানুষকে পৃথিবীর আলো দেখার সৌভাগ্য নিশ্চিত করবে। এ ঘটনা ব্রেন ডেড হওয়া রোগীদের কিডনি দানে স্বজনদের উৎসাহ জোগাবে। যে সিদ্ধান্তের কল্যাণে বেঁচে যাবে অনেক মানুষ। এ বিষয়ে বিএসএমএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, অঙ্গদাতা সারাহ ইসলামের নাম চিকিৎসাক্ষেত্রে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তার এ ত্যাগের মাধ্যমে মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি হবে। অনেক মানুষ নতুন জীবন পাবে।
দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে বড় সাফল্য: সারাহ’র দুইটি কিডনি দু’জন নারীর দেহে প্রতিস্থাপন করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চিকিৎসাজগতে প্রথমবারের মতো একটি ঘটনা ঘটে গেল। দেশে এ প্রথম কোনো মৃত ব্যক্তির দান করা কিডনি প্রতিস্থাপন করা হলো অন্য ব্যক্তির দেহে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ও জাতীয় কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালে দুই রোগীর দেহে দুটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। চিকিৎসাশাস্ত্র অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ‘ব্রেন ডেথ’ ঘোষিত হওয়ার পর কিডনি, হƒৎপ্লি, ফুসফুস, যকৃৎ বা লিভার, অগ্ন্যাশয় (প্যানক্রিয়াস) ও খাদ্যনালির মতো অঙ্গ অন্য ব্যক্তির দেহে প্রতিস্থাপন করা যায়। এছাড়া মৃত ব্যক্তির শরীরের কর্নিয়া, অস্থি, মজ্জা বা চামড়াও প্রতিস্থাপনযোগ্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে কিডনি রোগীদের তথ্য সংরক্ষণে জাতীয় পর্যায়ের কোনো উদ্যোগ নেই। জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দুই কোটির বেশি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে বছরে রোগের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে ৩৫-৪০ হাজারের মতো রোগী। তবে যাদের কিডনি পুরোপুরি অকেজো তাদের খুব কমসংখ্যক চিকিৎসার আওতায় আসছে। কিডনি দরকার, কিন্তু কিডনি পাওয়া যাচ্ছে না এর থেকে উত্তরণের পথ কী। উত্তরণের একটি পথ ‘ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্ট’ বা মৃত মানুষের অঙ্গ প্রতিস্থাপন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই জটিল পথে অনেক দেশে অনেক আগেই হেঁটেছে। বাংলাদেশ মাত্র হাঁটা শুরু করল।
ইউডি/এজেএস

