তিন পরাশক্তির প্রভাব বিস্তার: টার্গেট বাংলাদেশ
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১৩:৪০
দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট দেশ হলেও ভৌগলিক কারণে বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক। অর্থনৈতিক খাত বিবেচনায় সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ এশিয়ান ‘টাইগার’ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এরই প্রভাবে বিশ্বের পরাশক্তি দেশগুলোর টার্গেটে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। তাইতো আমেরিকা, চীন, রাশিয়ার মতো দেশগুলো বাংলাদেশে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে সাদিত কবির’র প্রতিবেদন
বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহের নেপথ্যে: ইন্ডিয়ান ওশেন সম্পৃক্ত উপক‚লীয় দেশ হিসেবে দক্ষিণ এশিয়া এবং ইন্ডিয়ান ওশেনে পরাশক্তিগুলোর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল বাংলাদেশ। এই ভৌগলিক কারনসহ নিজেদের অর্থনৈতিক খাত সম্প্রসারণে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারে লড়ছে আমেরিকা, রাশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তিরা। সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন দ্য ডিপ্লোম্যাট। ভৌগলিকভাবে ব্যাপক প্রভাবের কারনে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইন্ডিয়া ওইসকল পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারে অনেকটাই এগিয়ে বলছে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞগণ। বাংলাদেশের অর্থনীতি আমেরিকার ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল; বাংলাদেশি পণ্যের একক বৃহত্তম বাজারও আমেরিকা। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে দৃঢ় অর্থনৈতিক সম্পর্ক। বাংলাদেশে বেইজিংয়ের বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা কোনো একক দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বেশি। ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে আমেরিকার তৎকালীন ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট স্টিফেন ই বিগান বাংলাদেশকে কোয়াডে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেসময় তিনি বলেন, বাংলাদেশ এই অঞ্চলে আমাদের (আমেরিকার) কাজের কেন্দ্রবিন্দু হবে। বাংলাদেশকে মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে টানতে আমেরিকার সেই প্রচেষ্টার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল চীন। চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং সতর্ক করে দেন, চার দেশের ছোট ক্লাব অর্থাৎ কোয়াড-এ বাংলাদেশ যোগ দিলে ‘চীনের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে’।

‘ট্রামকার্ড’ যখন পররাষ্ট্রনীতি: ১৯৭১ সালে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি যে নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে, তা হলো- ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। পররাষ্ট্রনীতির এই কৌশল বাংলাদেশের জন্য ভালো কাজ করেছে। তবে দিন যত যাচ্ছে বড় পরাশক্তিগুলো তাদের বৈশ্বিক প্রতিদ্ব›দ্বীদের মধ্যে যেকোনো একটি পক্ষকে বেছে নিতে ঢাকাকে ক্রমবর্ধমানভাবে চাপ দিচ্ছে। এদিকে, চীন-আমেরিকা দ্বৈরথের মধ্যে বাংলাদেশে ইন্ডিয়ার প্রভাব ব্যাপক। প্রথমত, বাংলাদেশ-ইন্ডিয়ার ক‚টনৈতিক সম্পর্ক বহু পুরনো। ইন্ডিয়ার উত্তরের বিচ্ছিন্ন প্রদেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখার অন্যতম করিডর হলো বাংলাদেশ। চীনের পর বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে ইন্ডিয়া থেকে। অন্যদিকে, ইন্ডিয়ার প্রবাসী আয়ের তৃতীয় বৃহত্তম খাত বাংলাদেশ। সম্প্রতি দু-দেশের মধ্যকার যোগাযোগ ও জ্বালানি খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে। ভৌগলিক অবস্থান ও সংস্কৃতির সাদৃশ্যতা বিবেচনায় আমেরিকা-চীন ও রাশিয়ার থেকে বাংলাদেশে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে অনেকটাই এগিয়ে ইন্ডিয়া।
আমেরিকা-চীন-রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থান: আমেরিকা ও চীনা ক‚টনীতিকরা সাম্প্রতিক অতীতের তুলনায় অনেক বেশি বাংলাদেশ সফর করছেন। গত ১৪ জানুয়ারি আমেরিকার দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু ঢাকা সফর করেন। এর আগে হোয়াইট হাউসের একাধিক ক‚টনীতিকও ঢাকা সফর করেন। অন্যদিকে, আমেরিকার ক‚টনীতিকদের ঢাকায় আসার মধ্যেই চীনের নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন গ্যাং ঢাকার বিমানবন্দরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। প্রথা ভেঙ্গে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথমবারের মতো বিদেশ সফর হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নেয়। কিনের ওই সফরের পরপরই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসে। উভয় দেশই বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা দিয়ে যান। এদিকে বাংলাদেশ নিয়ে সম্প্রতি রাশিয়াও নিজেদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। এমনকি আমেরিকার সঙ্গে টুইট যুদ্ধ করেছে দেশটির ক‚টনীতিকগণ যার উপলক্ষ্য ছিলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যু ও হস্তক্ষেপ প্রসঙ্গ। তাতে বাংলাদেশ নিয়ে রাশিয়ার আগ্রহের পরিধিরও প্রমাণ মেলে। সবকিছু বিবেচনায় বিশ্লেষকগণের মতে, আমেরিকা ‘গণতন্ত্রের লাঠি’ ব্যবহার করে বাংলাদেশকে নিজেদের দিকে টানছে, সেখানে চীন ও রাশিয়া বাংলাদেশকে আর্থিক সহায়তাসহ নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে আসছে যেন নিজেদের প্রভাব অক্ষুণ্ন থাকে।
ইউডি/এজেএস

