সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম: মানব পাচারের ভয়ঙ্কর ফাঁদ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম: মানব পাচারের ভয়ঙ্কর ফাঁদ

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১১:১০

করোনা মহামারির প্রকোপের মধ্যে মানব পাচারের মতো অপরাধ কমে আসলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা আবারও বেড়েছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন বলছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনে মানব পাচারের পরিমাণ অনেক বেশি। পাচারকারীরা তাদের কৌশল পাল্টে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টিকটক, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপের আশ্রয় নিচ্ছে। তাদের ফাঁদে পড়ছেন দেশের নারী ও শিশুরা। এ নিয়ে বিনয় দাস’র প্রতিবেদন

প্ররোচনার শিকার নারী ও শিশু: এক সময়ে পরিচিতদের মাধ্যমে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফুঁসলিয়ে বা লোভ দেখিয়ে করা হতো মানব পাচার। এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে এ কাজ করছে পাচারকারীরা। বাংলাদেশে নারী এবং মেয়েশিশুরা এই ফাঁদে পড়ে পাচার ও যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের এক গবেষণা বলছে মানব পাচারকারীরা বর্তমানে অনলাইনে অনেক বেশি সক্রিয়। ফেসবুক, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো ব্যবহার করে তারা নারীদের প্রেমের সম্পর্ক গড়া, টিকটকের মডেল বানানোর কথা বলছে।

অভিবাসন সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর গড়ে ৫,০০০ মানুষ বাংলাদেশ থেকে উন্নত দেশগুলোয় যাওয়ার চেষ্টা করে। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে প্রবেশ করেছে ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছে মানুষ। অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে, সারাদেশের অন্তত ১৫ জেলায় মানব পাচারের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত দেশী-বিদেশী ১৮ চক্র। এর মধ্যে দেশের ভেতরে ১৪ চক্রের সদস্য সংখ্যা ৩ শতাধিক। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার কাজে লিবিয়ায় সক্রিয় আছে আরও ৪ চক্র। এই ১৮ চক্র মিলে লিবিয়া হয়ে ইতালি-ইউরোপে মানব পাচার করছে দেশী-বিদেশী চক্র।

মানব পাচার বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে: ভিয়েনাভিত্তিক জাতিসংঘের মাদক এবং অপরাধবিষয়ক সংস্থার (ইউএনওডিসি) ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনকে মানব পাচারের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৬ জানুয়ারি) ইউএনওডিসির মানব পাচারবিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন ঢাকায় প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনে মানব পাচার বেড়ে যাওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয় ২০২০ সালে বাংলাদেশে ৭৩০টি মানবপাচারের ঘটনা ঘটেছিল, যা ২০১৭ সালে ছিল ৭৭৮ এবং ২০১৮ সালে ৫৬১টি। বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইস বলেন, ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ১৪১টি দেশের সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে মানব পাচারবিষয়ক এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে ইউএনওডিসি। ইউএনওডিসির আঞ্চলিক প্রতিনিধি মার্কো টেক্সেরিয়া বলেন, অনলাইনে মানব পাচারের নিয়োগ এবং সাইবার অপরাধের মাধ্যমে মানব পাচারের মতো বিষয়গুলো উঠে এসেছে প্রতিবেদনটিতে।

পাচার রোধে কৌশলগত পরিবর্তন জরুরি: করোনা মহামারির প্রকোপে মানব পাচারের প্রবণতা কমে আসলেও যুদ্ধ এবং সংঘাত পাচারকারীদের সুযোগ করে দেয়। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মানবপাচারের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার বলেছেন, আমরা এ ভয়াবহ অপরাধের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছি। পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সব পক্ষের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। মানব পাচার প্রতিরোধে অনলাইনে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকার কাজ চালিয়ে যাবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনও ইে বিষয়ে জানিয়েছিলেন, পাচারকারীরা একটি নির্দিষ্ট দেশে প্রযুক্তির ব্যবহারে ভালো হতে পারে এবং তাদের কাছে উন্নত প্রযুক্তি থাকতে পারে। প্রযুক্তির মাধ্যমে মানব পাচারকারীরা আরো বেশি ক্ষতি করে। তবে সরকারি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে পাচারকারীর প্রচেষ্টাকেও প্রতিহত করতে পারে। মানব পাচার নিয়ে জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব আমিনুল ইসলাম খান জানান, এ ধরনের জটিল সংকটের সমাধানের জন্য সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। বিশেষ করে সংঘবদ্ধ অপরাধীরা তাদের অপরাধের ধারায় পরিবর্তন এনেছেন। তাই মানব পাচার প্রতিহত করতে হলে আইন, বিধিসহ নানা ধরনের প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে কৌশলগত পরিবর্তন আনার কোনো বিকল্প নেই।

মানব পাচারকারী শুধু যৌন নিপীড়ন নয়, মানব দেহের অঙ্গ পাচারেও যুক্ত বলা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ও কোভিড-১৯-এর পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মন্দায় হতদরিদ্ররা মানব পাচারের ঝুঁকিতে আছেন।

ইউডি/সুপ্ত/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading