জ্বালানি ছাড়াই প্রতিদিন মিলছে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ
উত্তরদক্ষিণ। বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, আপডেট ০৯:০০
দেশের সর্ববৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র ‘তিস্তা সোলার লিমিটেড’ থেকে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার থেকে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। তেল বা কয়লার মতো কোনো জ্বালানি ছাড়াই সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এই প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নের তিস্তা নদীর চরাঞ্চলে গড়ে উঠেছে এই বিশাল সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। একসময়ের ধূ-ধূ বালুচরে এখন সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে চলছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাযজ্ঞ। প্রতি ঘণ্টায় ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই কেন্দ্রটি দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।
বিগত তিন বছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় সোয়া ১০ লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে; যার বাজারমূল্য প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। অথচ সমপরিমাণ বিদ্যুৎ ডিজেল পুড়িয়ে উৎপাদন করতে গেলে সরকারকে এর প্রায় তিন গুণ অর্থ ব্যয় করতে হতো। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কেন্দ্রের প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় কিছুটা বেশি হলেও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অত্যন্ত কম।
তিস্তা সোলার লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজার ফয়সাল হাবীব বলেন, ‘প্রাথমিক খরচ বেশি হলেও এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অনেক কম। আমরা কোনো জ্বালানি ছাড়াই শুধু সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছি।’
প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ মাশরাত হাসান জানান, গড়ে প্রতিদিন তাদের এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়।
বর্তমানে দেশে ১৪ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। এই ঘাটতি মোকাবিলায় এবং জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌরশক্তি একটি শক্তিশালী বিকল্প। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৫০ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। যেখানে ভারত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫১ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে এবং কম্বোডিয়া ও পাকিস্তান তাদের ব্যবহৃত বিদ্যুতের যথাক্রমে ৬২ ও ৪৬ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পেয়েছে; সেখানে বাংলাদেশে এই হার মাত্র ৩ শতাংশ।
এ বিষয়ে প্রকৌশলী জাহিদুল করিম বলেন, ‘ফ্যান, এসিসহ বিদ্যুতের ব্যবহার নিয়মিত বাড়ছে। প্রতিটি বাড়িতে দুই কিলোওয়াট হিসেবে ধরলেও আগামী দুই-চার বছর পর ১০ কিলোওয়াট দিয়েও চলবে না।’
তিস্তা সোলার লিমিটেডের এক ব্যবস্থাপক বলেন, ‘নীতিনির্ধারকরা যদি একটি সুষ্ঠু পলিসি করে দেন, তবে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। এটি অবশ্যই দেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় সেতু ও রেলপথের দুই ধার এবং রেল স্টেশনগুলোতে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) কনসালটেন্ট মোজাহারুল হক বলেন, ‘রেল স্টেশনে যেসব জায়গায় বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, সেখানে আমরা সোলার ব্যবহার করতে পারি। হাটে-বাজারেও এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। আমাদের বিদ্যুতের যে সংকট রয়েছে, তা মোকাবিলা করার জন্য সৌরবিদ্যুতের পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।’
বেসরকারি সংগঠন ‘ডপস’-এর তথ্য অনুযায়ী, শুধু ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকেই বছরে ২৬ হাজার ৫১৪ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
গাইবান্ধার এই সর্ববৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি প্রমাণ করেছে যে, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে সাশ্রয়ী মূল্যে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এ ধরনের আরও প্রকল্প গড়ে তোলা গেলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সংকট দূর করা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা আরও সহজ হবে।
ইউডি/কেএস

