প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ: ক্যানসার পরিস্থিতি ও বাস্তবতা

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ: ক্যানসার পরিস্থিতি ও বাস্তবতা

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১০:১০

প্রতিবছর ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বজুড়ে ক্যানসার দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘ক্লোজ দ্য কেয়ার গ্যাপ’ অর্থাৎ ‘বৈষম্য কমাই ক্যানসার সেবায়’। বিশিষ্ট সাংবাদিক হানজালা শিহাব ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছেন গত ৮ মাস ধরে। এ সময় তিনি দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবার মান ও ধরণ নিজেই অবলোকন করেছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসাসেবার ধরণ নিয়ে নিয়ে হানজালা শিহাবের পর্যবেক্ষণ

সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিশ্চয়তা চান রোগীরা: আমার কাছে এবারের দিবসটি ভিন্নরকম আবেগ ও অনুভূতি সৃষ্টি করেছে। আমি একজন ক্যানসারের রোগী। আমার মতো দেশে আরো কয়েক লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত। ওইসব নারী-পুরুষের কষ্টের কথা বলার হয়তো সুযোগও নেই। ১০ বছর আগে ফেব্রুয়ারিতেই ক্যানসারে মা হারিয়েছি। মারা গেছেন ছোট মামাও। এখন ক্যানসারের সহযাত্রী আমি। গত বছর জুনে আমার রেক্টামে (মলদ্বার) কোলন ক্যানসার শনাক্ত হয়। এরপর ৮ মাসে নানা ঘাত-প্রতিঘাতে বেশ অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে। বাধ্য হয়েছি পত্রিকায় সংবাদ ছেপে মানবিক সহায়তা চাইতে। জানি না, শেষ পরিণতি কী অপেক্ষা করছে! আমার রেক্টাম ক্যানসার শনাক্তের পর বেসরকারি হাসপাতালে অপারেশন ও কেমোথেরাপি নিয়েছি। এখন রেডিওথেরাপি প্রয়োজন। এজন্য ঢামেকে যেতে হয়েছে। দুই সপ্তাহ হলো, থেরাপির সিরিয়াল পাইনি। কবে পাব তাও বলা কঠিন। বলা হচ্ছে, মার্চ-এপ্রিলের আগে সিরিয়াল দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ব্লাডে দ্রুত ক্যানসারের জার্ম বাড়তে থাকা একজন রোগী বিনা চিকিৎসায় সেই পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন- এ নিশ্চয়তা কে দেবেন!

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা

মৃত্যুহার বৃদ্ধির শঙ্কা বাড়ছে: দেশে প্রতি এক লাখে ২৬০ জন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। গবেষকগণ বলছেন, ঠিকমতো উদ্যোগ না নিলে ২০৫০ সালে প্রতি লাখে এক হাজার ১৫০ জন মারা যেতে পারে। বাংলাদেশে ৬০ ভাগ ক্যানসার রোগী প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে মারা যায়। কিন্তু সেভাবে বাড়ছে না ক্যানসার চিকিৎসার পরিধি। আমেরিকা প্রবাসী ফিজিশিয়ান ডা. মুজিবুল হকের মতে, কেউ যদি প্যাকেটজাত খাবার, কোমল পানীয়, ফাস্ট ফুড, পোড়া মাংস, সয়াবিন তেল, ডুবন্ত তেলে ভাজা খাবার, সাদা চিনি ও চিনিযুক্ত খাবার, ফার্মের মুরগি, চাষের মাছ এবং ফরমালিনযুক্ত খাবার গ্রহণ করেন, তাহলে এগুলো শরীরে জমে এক সময় আপনি অসুস্থ হবেন, এটা নিশ্চিত। হয় ক্যানসারে আক্রান্ত হবেন, নয়তো কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস কোনো না কোনো রোগ হবেই। তা আজ হোক আর কাল হোক। বাস্তবে ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক প্রতিনিয়ত এ জাতীয় খাবার আমরা গ্রহণ করছি এবং এসব দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্তও হচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। তবে নিরাপদ খাদ্য এখনো নাগালের বাইরে। গত ২ ফেব্রুয়ারি দেশে নিরাপদ খাদ্য দিবস পালিত হলো। বাস্তবে ভেজালমুক্ত নিরাপদ খাদ্য সাধারণ মানুষের জন্য এখনো সুদূর পরাহত। ফলে দেশে এখন প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কেউ না কেউ ক্যানসার, হৃদরোগ, কিডনি, ডায়াবেটিসসহ দূরারোগ্য নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত। এ থেকে মুক্তি পেতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

সরকারি বরাদ্দ ও বাজেট বাড়ানোর দাবি: দেশে ক্যানসার রোগী ও তাদের পরিবার চিকিৎসা নিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন অহরহ। একদিকে দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ায় রোগীসহ স্বজনরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন। অন্যদিকে চিকিৎসা করতে গিয়ে বাড়তি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই আজ দেশে বিশ্ব ক্যানসার দিবস পালিত হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, যদি সেবার মান উন্নত করা না যায়, ক্যানসার চিকিৎসায় সরকারি বরাদ্দ ও বাজেট না বাড়ে, শুধু দিবস পালন তাদের কোনো উপকারে আসবে না। আক্রান্ত রোগী ও তাদের স্বজনরা বলছেন, চিকিৎসার জন্য প্রতিদিনই অপেক্ষা করতে হয় শতাধিক ক্যানসার রোগী ও তাদের স্বজনদের। প্রত্যেকেই নানাভাবে ভোগান্তি আর হয়নির শিকার হচ্ছেন। কারণ, ঢামেকে রেডিওথেরাপির জন্য দুটি মেশিন থাকলেও দীর্ঘদিন একটি নষ্ট। দ্বিতীয় মেশিনটি বেশ পুরোনো। ১৯৯০ সালে কেনা মেশিনটি দিয়ে প্রতিদিন শত শত ক্যান্সার রোগীর থেরাপি দেওয়া বাস্তবেও সম্ভব নয়। ফলে সঠিক সময় প্রত্যাশিত চিকিৎসা বঞ্চিত হচ্ছেন অনেক ক্যানসার রোগী। শুধু ঢাকা মেডিকেল নয়, জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের চিত্র আরো ভয়াবহ। প্রতিদিন সেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো ক্যানসার রোগী ভিড় করছেন। এত রোগীর চিকিৎসা বা থেরাপি দেওয়ার সক্ষমতা নেই প্রতিষ্ঠানটির। সেখানে একজন রোগী ভর্তির সিরিয়াল পেতে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকেন। ফলে চিকিৎসার আওতায় আসার আগেই কোনো কোনো রোগীর পরিণতি হয় ভয়ানক।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading