সিপিডি’র জরিপ : দুর্নীতি নির্মূলে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক
মোহম্মদ সাজেদুল ইসলাম । শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১০:৪০
‘র্দুনীতি’ শব্দটি নেতিবাচক শব্দ। এটি ইতিবাচক শব্দ ‘নীতি’ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। আভিধানিক অর্থে ‘দুর্নীতি’ হলো নীতিবিরুদ্ধ, কূনীতি ও অসদাচরণ। দুর্নীতি বলতে সাধারণত ঘুষ, বল প্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন, প্রভাব বা ব্যক্তি বিশেষকে বিশেষ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে অফিস-আদালতকে ব্যক্তিগত স্বার্থ লাভের জন্য অপব্যবহার করাকে বুঝায়। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এ উপরোক্ত অপরাধমূলক কর্মকান্ডকে দুর্নীতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একটি দেশের সামগ্রিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে যদি প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দুর্নীতি বড় ধরনের কারণ হয়, তবে তা কতটা উদ্বেগের বলার অপেক্ষা রাখে না।
প্রসঙ্গত, বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন খাতেই দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে। এ ক্ষেত্রে বলা দরকার দুর্নীতি রোধে সামগ্রিক পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। দুর্নীতির কারণে ব্যবসাবাণিজ্যের পরিবেশের উন্নতি হচ্ছে না। ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে চ্যালেঞ্জ, আমলাতন্ত্র ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ব্যবসার পথে বাধার সৃষ্টি করেছে। আর এ কারণে ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যবসার পরিবেশের কোনো উন্নতি হয়নি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। শুধু তাই নয়, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার হতে হচ্ছে। এছাড়া লাইসেন্স নেওয়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস সেবা ও কর দেওয়ার ক্ষেত্রেও দুর্নীতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। ফলে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়েছে। এই বিষয়গুলো উঠে আসার পাশাপাশি বর্তমানে এ পরিস্থিতি আগের তুলনায় আরও খারাপ হয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে। আর এ জন্য দায়ী করা হচ্ছে দুর্নীতিকে। সবচেয়ে উৎকণ্ঠার বিষয় হলো, গত বছর এই দুর্নীতিই ছিল ব্যবসায় উন্নতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা! মূলত সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) এক যৌথ জরিপে উঠে এসেছে এসব তথ্য। গত রোববার রাজধানীর ধানমন্ডির সিপিডি কার্যালয়ে জরিপের ফল উপস্থাপন করে সিপিডি। আমরা বলতে চাই, যখন দুর্নীতি সংক্রান্ত এসব তথ্য উঠে আসছে তখন তা আমলে নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে গত বছর দুর্নীতিই ছিল ব্যবসায় উন্নতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা- এই বিষয়টিকে সামনে রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করা অপরিহার্য বলেই প্রতীয়মান হয়। কেননা, এটা অনুধাবন করা জরুরি যে, ব্যবসার উন্নতির সঙ্গে দেশের সামগ্রিক উন্নতির বিষয়টি জড়িত। ফলে এই খাতের উন্নতির ক্ষেত্রে দুর্নীতি বাধা হলে সেটি শঙ্কাজনক বাস্তবতাকেই সামনে আনে- যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। সিপিডি এবং ডব্লিউইএফের যৌথ জরিপের তথ্য মতে, ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত জরিপ চালানো হয়। এতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের ৭৪ জ্যেষ্ঠ ব্যবসায়ীর মতামত নেওয়া হয়েছে। জরিপে বলা হয় যে, বিগত বছরগুলোর মতো ২০২২ সালেও দুর্নীতি ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

অন্যদিকে, দুর্নীতি ছাড়াও অবকাঠামোগত দুর্বলতা, ব্যাংক থেকে ঋণ প্রাপ্তির চ্যালেঞ্জ, দুর্বল আমলাতন্ত্র, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার উত্থান-পতন ও নীতিগত সমস্যা ব্যবসার জন্য প্রতিবন্ধক এটিও সামনে এসেছে। আর জরিপ বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের অগ্রগতি দেখা যায়নি। আমরা মনে করি, জরিপে উঠে আসা তথ্য বিশ্লেষণ করে উদ্যোগ নিতে হবে সংশ্লিষ্টদেরই। এছাড়া এটাও বিবেচ্য যে, আর্থিক খাতে বড় ধরনের সংস্কার, ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধন, ঋণে সুদহারের সীমা তুলে নেওয়া, বকেয়া ঋণে স্বচ্ছতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথোরিটির (আইডিআরএ) কার্যকর ভূমিকা বৃদ্ধির পরামর্শ দেয় সিপিডি। যা আমলে নিতে হবে। সর্বোপরি আমরা বলতে চাই, বিভিন্ন সময়েই দুর্নীতি রোধে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতি রোধ হয়নি। সঙ্গত কারণেই দুর্নীতির সামগ্রিক চিত্র আমলে নিতে হবে। আর এবারে যে জরিপের তথ্য উঠে এসেছে সেটি পর্যবেক্ষণ করে করণীয় নির্ধারণ ও তার যথাযথ বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। স্মর্তব্য, এটিও আলোচনায় এসেছে দুর্নীতির কারণে শুধু উৎপাদন খরচ নয়, সেবার মূল্যও অনেকখানি বেড়ে যায়। এই মূল্যের ঘানিটা সাধারণ মানুষেরই ওপর পড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতি হলে শুধু ব্যবসার পরিবেশ নয়, অর্থনৈতিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে এই বিষয়গুলো এড়ানো যাবে না। ব্যবসার উন্নতির ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল দুর্নীতি- এটি আমলে নেওয়ার পাশাপাশি; দেশের সামগ্রিক চিত্র পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে যে কোনো খাতে দুর্নীতি কিংবা অনিয়ম পরিলক্ষিত হলে- তা রোধ করতে সংশ্লিষ্টরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে এবং যথাযথ পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে এমনটি কাম্য।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/আতা/এজেএস

