চীনা বেলুন মারতে আমেরিকা কেন কামান দাগলো!
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১৩:০০
অনেক হিসেব-নিকেশের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আমেরিকার আকাশ সীমায় প্রবেশ করা চীনের ‘গোয়েন্দা’ বেলুনটি ধ্বংস করেছে মার্কিন বিমানবাহিনী। বেলুনটি ধ্বংস করতে মার্কিন প্রশাসন যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আমেরিকার সার্বভৌমত্বে আঘাত হানার কারণেই যুদ্ধবিমান দিয়ে এই অভিযানটি ইচ্ছাকৃতভাবেই তারা পরিচালনা করেছে। অন্যদিকে, চীন এই অভিযানের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। এ নিয়ে মিলন গাজী’র প্রতিবদেন
বেলুনের ভয়ে কড়া জবাব আমেরিকার: চীনের বেলুনটি কয়েক দিন ধরে উত্তর আমেরিকার আকাশসীমায় উড়ছিল। আমেরিকার দাবি, বেলুনটি তাদের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় নজরদারি করছিল। বেলুনটিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, এফ-২২ যুদ্ধবিমান থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে বেলুনটি ধ্বংস করেছে তারা। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন এ অভিযানকে ‘ইচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ড’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, আমেরিকার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে চীন। আর এর জবাবেই অভিযানটি চালানো হয়েছে। পেন্টাগনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চীনের ‘নজরদারি’ বেলুনের হাত থেকে ‘সংবেদনশীল’ তথ্যের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিয়েছে আমেরিকা; কিন্তু আমেরিকার আকাশে ওড়া ওই বেলুনের গোয়েন্দা মূল্যও কম নয়। আমরা বেলুন ও এর সরঞ্জামাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছি, যা খুবই প্রয়োজনীয়। পেন্টাগনের অপর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত বুধবারই বেলুনটি ধ্বংসের পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তবে তিনি বলেছিলেন, এটা করতে গিয়ে যেন কোনো মার্কিন নাগরিকের জীবন ঝুঁকির মুখে না পড়ে। বিষয়টি তিনি দেখবেন।

ওয়াশিংটন-বেইজিং টানটান উত্তেজনা: আমেরিকার আকাশে চীনের ‘গোয়েন্দা’ বেলুন বিশ্ব রাজনীতিতে দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটের জন্ম দিয়েছে। এর একটি হলো, আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে নজরদারি করার জন্য চীন কেন তুলনামূলক কম আধুনিক উপকরণ ব্যবহার করল। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, সম্ভবত বেইজিং ওয়াশিংটনকে এ বার্তা দিতে চাইছে যে তারা সম্পর্কের উন্নয়ন চায়, তবে অব্যাহত প্রতিযোগিতা চালিয়ে যেতেও প্রস্তুত। আর এ প্রতিযোগিতা তারা চালিয়ে যাবে দুই পক্ষের মধ্যকার উত্তেজনা ভীষণভাবে বাড়ানো ছাড়াই যেকোনো পন্থা অবলম্বন করে। চীনের পাঠানো নির্দিষ্ট ওই বেলুনের উদ্দেশ্য ও সক্ষমতা যাই থাকুক না কেন, আমেরিকা এটিকে এক গুরুতর হুমকি হিসেবে নিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির বেলুনগুলো ভ‚পৃষ্ঠ থেকে সাধারণত ২৪-৩৭ কিলোমিটার (৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার ফুট) উচ্চতায় ভেসে বেড়াতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব বেলুনে গুপ্তচর ক্যামেরা ও রাডার সেন্সরের মতো আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা সম্ভব। আর নজরদারিতে এমন বেলুন ব্যবহার করার কিছু সুবিধা আছে। প্রধানতম সুবিধা হলো, এটি কম ব্যয়বহুল ও ড্রোন বা স্যাটেলাইটের চেয়ে মোতায়েন করা তুলনামূলক সহজ।

যুদ্ধবিমানের আঘাতে চীন বেজায় নাখোশ: ‘বেলুন’ ধ্বংস করায় আমেরিকার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমেরিকা এ ঘটনায় মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন করেছে। রবিবার (০৫ ফেব্রুয়ারি) বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, চালকবিহীন বেসামরিক আকাশযানটিতে হামলায় আমেরিকা যে শক্তি ব্যবহার করেছে, তা নিয়ে চীন তীব্র অসন্তোষ ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, শান্ত, পেশাদার ও সংযত হয়ে যথাযথভাবে পরিস্থিতি সামলানোর জন্য আমেরিকাকে তারা অনুরোধ করেছিল। এর আগে, এক বিবৃতিতে ওই বেলুনটি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বেইজিং। তাদের দাবি, মূলত আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের জন্য বেলুনটি আকাশে ওড়ানো হয়েছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট পথে না গিয়ে সেটি আমেরিকার আকাশে চলে গেছে। প্রসঙ্গত, গত নভেম্বরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এক বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে বলেছিলেন, ‘আমরা নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধ চাই না।’ এভাবে চীন-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে আশার আলো সঞ্চার হয়। চলতি মাসের ৫ তারিখে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের দুইদিনের বেইজিং সফর শুরু হওয়ার কথা ছিল। এর আগেই আমেরিকার আকাশসীমায় ভেসে ওঠে চীনা ‘গোয়েন্দা’ বেলুন। ফলে, ‘বেলুন কাণ্ডে’ ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এ ঘটনার জেরে চীন সফর বাতিল করেছেন ব্লিঙ্কেন। গত শুক্রবার চীনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইকে তিনি বলেছেন, চীনা বেলুনের অনুপ্রবেশ একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ। এটা আমেরিকার সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
ইউডি/এজেএস

