মোদি সরকারের তোপের মুখে বিবিসি
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১২:৫২
ক্ষমতাকে পুঁজি করে বিশ^জুড়েই গণমাধ্যমের কণ্ঠ চেপে ধরতে চায় প্রভাবশালীরা। গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে হরণ করতে মরিয়া হয়ে উঠে তারা। নিজেদের বিরুদ্ধে যায় এমন তথ্য প্রকাশকে কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারে না ক্ষমতাধররা, তারই এক নিদর্শন ইন্ডিয়ায় বিবিসি কার্যালয়ে অভিযান। সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদি’কে নিয়ে করা বিবিসি’র একটি তথ্যচিত্র নিয়ে ইন্ডিয়ায় আলোচনা তুঙ্গে। এরই মধ্যে দেশটির মুম্বাই ও দিল্লীতে বিবিসি কার্যালয়ে অভিযান চালিয়েছে আয়কর বিভাগ, যা স্পষ্টতই মোদি’কে নিয়ে তথ্যচিত্রের পাল্টা জবাব বলছেন বিশ্লেষকগণ। এ নিয়ে বিনয় দাস’র প্রতিবেদন
হঠাৎ আয়কর অভিযান আড়ালে আক্রোস: ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গাতে নরেন্দ্র মোদীর ভূমিকা নিয়ে সম্প্রতি একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছিল বিবিসি। যা নিয়ে সমালোচনা করেছিল দেশটির সরকার। নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে ‘বিতর্কিত’ তথ্যচিত্র ঘিরে বিবিসি বহুদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। সেই জায়গা থেকে সুপ্রিম কোর্টের কাছে এই তথ্যচিত্র ব্লক করার কেন্দ্রীয় নির্দেশের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়। এদিকে মামলা দায়ের হয়েছিল ইন্ডিয়ায় বিবিসির কার্যক্রম বন্ধের আর্জি জানিয়েও। সেই তথ্যচিত্র ‘বিতর্কের’ মধ্যেই ইন্ডিয়ায় ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের (বিবিসি) দিল্লি ও মুম্বাই অফিসে অভিযান চালিয়েছে দেশটির আয়কর বিভাগ। মঙ্গলবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) এ অভিযান পরিচালনা করে তারা। বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়েছে, এ সময় বিবিসি’র গণমাধ্যমকর্মীদের ফোনও নিজেদের দখলে নেয় আয়কর বিভাগ। তবে কাউকে আটক করা হয়নি। যদিও এই অভিযানকে ‘সার্ভে’ আখ্যা দিয়েছে সংস্থাটি। কর্মকর্তাদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইন্ডিয়ার গণমাধ্যমকে বলেন, কিছু ব্যাপারে অস্পষ্টতা ছিল। সেসব দূর নিরীক্ষার জন্য আমরা এখানে এসেছি। (বিবিসির) ব্যাংক হিসাব সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য আমরা খতিয়ে দেখব। এটা কোনো তল্লাশি নয়।

গুজরাট হত্যাকান্ড: তথ্যচিত্র মোদীর প্রতিশোধ: ‘ইন্ডিয়া দ্যা মোদী কেয়েশ্চন’ শীর্ষক ওই বিতর্কিত তথ্যচিত্র ইন্ডিয়ায় দেখায়নি বিবিসি। তবে তা ইউটিউবে আপলোড করা হয়েছিল। তবে ইন্ডিয়ার সরকার সেই তথ্যচিত্রটি ‘ব্লক’ করে দিয়েছিল। এদিকে গত সোমবার সংবাদসংস্থা এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেন, ২০০২ সালের পর থেকেই মোদীর পিছনে পড়ে রয়েছে বিবিসি। এর আগে বিবিসির এই তথ্যচিত্র নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়েছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি বিবিসির বিতর্কিত তথ্যচিত্র নিয়ে বলেছিলেন, ‘এই তথ্যচিত্রটির পিছনে নির্দিষ্ট অ্যাজেন্ডা রয়েছে।’ প্রসঙ্গত, ‘ইন্ডিয়া:দ্য মোদী কোয়েশ্চন’-এর দুই পর্বে ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গায় মোদীর ‘ভূমিকা’ তুলে ধরা হয়েছে। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকও জানিয়েছিলেন, এই তথ্যচিত্রের মোদীর চরিত্রায়ণের সঙ্গে তিনি একমত নন। এই তথ্যচিত্রটিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তথা গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘ভুল চরিত্রায়ণ’ হয়েছে। তবে বিবিসি জানিয়েছে, এই তথ্যচিত্রে বহু মানুষের প্রতিক্রিয়া নেওয়া হয়েছে। তাতে যেমন প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন, তেমনই বিজেপির সদস্যদের প্রতিক্রিয়াও আছে।

‘বিনাশকালে বুদ্ধি নাশ’পতিবাদে সোচ্চার: ইন্ডিয়ার প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল কংগ্রেস অবশ্য বলেছে, গুজরাট দাঙ্গায় নরেন্দ্র মোদির সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তথ্যচিত্র প্রকাশের জেরেই বিবিসিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় সরকার। এই অভিযানের বিষয়টি নিয়ে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে অন্যতম বিরোধী দল কংগ্রেস। তারা বলছে, এই পদক্ষেপেই বোঝা যাচ্ছে দেশে অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। আগে বিবিসি ডকুমেন্টারি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং এখন সেখানে অভিযান চালানো হয়েছে। এটি একটি অঘোষিত জরুরি অবস্থা। সরকারকে আক্রমণ করে কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ বলেছেন, ‘বিনাশকালে বিপরীত বুদ্ধি’ দেখাচ্ছে বিজেপি। তিনি বলেছেন, এই অভিযানই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে দেশে অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে। তিনি বলেন, একদিকে আমরা আদানির মামলায় যুগ্ম সংসদীয় কমিটির দাবি করছি। অন্যদিকে সরকার শুধু একটি তথ্যচিত্রের জন্য বিবিসি অফিসে অভিযান চালিয়েছে। এদিকে, এই ঘটনায় বিবিসি দিল্লি ও মুম্বাই শাখার সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে লিখিত বার্তা দিয়েছে লন্ডনের মূল কার্যালয়। সেই বার্তায় সংবাদকর্মীদেরকে সরকারের সঙ্গে ঝামেলায় না জড়াতে ও ভীত না হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে তারা। বার্তায় হেডকোয়ার্টার বলেছে, আমরা বিবিসি ইন্ডিয়ার দিল্লি ও মুম্বাইসহ অন্যান্য শাখার কার্যালয়ের কর্মীদের অনুরোধ করছি আপনারা আতঙ্কিত হবেন না এবং সরকারের সঙ্গে কোনো প্রকার ঝামেলায় জড়াবেন না। পুরো পরিস্থিতি আমরা সামাল দিচ্ছি।
ইউডি/সুপ্ত/কেএস

