জায়েদ-নিপুণ দ্বন্দ্বে চলচ্চিত্র শিল্পীদের বিভক্তি বাড়ছে

জায়েদ-নিপুণ দ্বন্দ্বে চলচ্চিত্র শিল্পীদের বিভক্তি বাড়ছে

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৩ । আপডেট ১৪:১০

গত ২০২১-২০২৩ মেয়াদী চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনের পর থেকেই দ্বন্দ্ব যেন লেগেই আছে। মাঝে কিছুদিন চুপ থাকলেও আবারো সেটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এতে শিল্পীদের মাঝে বিভক্তি বাড়ছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে জায়েদ খান ও নিপুণ আক্তারের দ্বন্দ্বের এখনও চূড়ান্ত সুরাহা হয়নি। পদটি নিয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় না এলেও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নিপুণ। আর এর মধ্যেই সমিতি থেকে সাবেক সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খানের সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছে। এ নিয়ে মিলন গাজী’র প্রতিবেদন

এবার স্থগিত হলো জায়েদ খানের সদস্যপদ: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অশালীন ও মানহানিকর মন্তব্য করায় তার বিরুদ্ধে সর্বসম্মতিক্রমে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রবিবার (০২ এপ্রিল) আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্তটি জানান সংগঠনটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইমন সাদিক। তিনি বলেন, আমাদের কার্যনির্বাহী কমিটির ৯ম মিটিং হয়েছে। সেখানে একবাক্যে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সমিতির গঠনতন্ত্রের ৭(ক) ধারার আলোকে আমাদের সম্মানিত সদস্য জায়েদ খানের সদস্যপদ স্থগিত করা হলো। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অশালীন মন্তব্য করায় জায়েদ খানের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান সাইমন। কিন্তু এই স্থগিতাদেশের সিদ্ধান্ত এখনই চূড়ান্ত নয় বলেও জানান এই নেতা-অভিনেতা। তিনি জানান, আজকের সিদ্ধান্তের বিষয়টি আমাদের উপদেষ্টামণ্ডলী ও আইনজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাব। এদিকে সমিতির একই বৈঠকে কার্যনির্বাহী পরিষদের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় সুচরিতা ও রুবেলকে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা পর পর তিনটি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন এবং সমিতির উন্নয়নমূলক কোনো কাজে দেখা যায়নি। এ ব্যাপারে তাদের নোটিশ দেওয়া হলেও কোনোরকম সাড়া পাওয়া যায়নি।

জায়েদ খান

কী ধরনের মানহানিকর কথা বলেছিলেন জায়েদ?: গত ২২ ফেব্রুয়ারি নিপুণের কারণ দর্শানোর চিঠিতে জায়েদ খানকে বলা হয়, ‘বিগত কয়েক দিন যাবৎ আপনি (জায়েদ খান) বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল ও গণমাধ্যমে সমিতির একজন সদস্য ও সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নিপুণ আক্তারের বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তব্য প্রদান করেছেন, যা সমিতির সাধারণ সদস্য, চলচ্চিত্রের মানুষ তথা সারা দেশের দর্শকদের কাছে শিল্পীদের ও শিল্পী সমিতির ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন করেছে, যার প্রমাণ আছে। এমন বক্তব্য সমিতির সদস্য হিসেবে কাম্য নয়।’ এই চিঠির উত্তর দিতে পারেননি জায়েদ। শিল্পী সমিতির একটি সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী চিঠির উত্তর দিতে হয়। কিন্তু জায়েদ উত্তর দেননি। এই পরিপ্রেক্ষিতে আগামীকাল তাঁর সদস্যপদ স্থগিত করা নিয়ে আলোচনা হবে। অভিনেত্রী নিপুণ আক্তারের উদ্দেশে মানহানিকর কিছু বলেছেন কি না, জানতে চাইলে জায়েদ বলেন, ‘সে আমার সম্পর্কে বহুত খারাপ কথা বলছে। আমাকে দালাল, নির্লজ্জ…বহুত কিছু বলছে। আমি উত্তর দিতে গিয়ে হয়তো নির্লজ্জ, বেহায়া এমন শব্দগুলোই ব্যবহার করেছি। শুধু এ জন্যই অন্যায়ভাবে আমার সদস্যপদ বাতিলের চেষ্টা করবে? এটা হাস্যকর।

নিপুণ আক্তার

আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি জায়েদের: অভিযোগ নিয়ে জায়েদের ব্যাখ্যা, সংগঠনের উদ্দেশ্যাবলীর পরিপন্থী, স্বার্থের বিরুদ্ধে বা অবমাননাকর কোনো কার্যের সঙ্গে আমি কখনো সম্পৃক্ত ছিলাম না বিধায় তথাকথিত ২২ ফেব্রুয়ারি তারিখের কারণ দর্শানোর নোটিশটি উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং বেআইনি। চিঠির শেষ অংশে নিপুণকে ‘বিতর্কিত, অবৈধ, মানহানিকর ও আদালত অবমাননাকর’ কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন জায়েদ খান। অন্যথায় তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন সংগঠনটির সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক। চিঠির শুরুতে ‘বরাবর নিপুণ আক্তার’ লিখলেও, পদের স্থলে সচেতন জায়েদ খান উল্লেখ করেছেন চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ‘আর্টিস্ট রুম’-এর একজন হিসেবে!

সাইমন সাদিক

সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে ধোঁয়াশা চলছেই: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা ছিল। প্রথম দিকে নির্বাচনের ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পরে স্থগিত হয় সাধারণ সম্পাদকের পদ। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে যেতে হয় সাধারণ সম্পাদক পদের প্রার্থীদের। অবশেষে গত নভেম্বরে হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। সেই সময় আপিল বিভাগের আদেশের ফলে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে চিত্রনায়িকা নিপুণ দায়িত্ব চালিয়ে যেতে পারবেন বলে জানিয়েছেন তার অন্যতম আইনজীবী মুস্তাফিজুর রহমান খান। সেই সময় জায়েদ খান বলেছিলেন, হাইকোর্ট আগের যে অর্ডার ছিল, সেটা স্টে (স্থগিত) করেছেন। তাদের (নিপুণের) আইনজীবী যে আপিল করেছিলেন, সেটা হাইকোর্ট গ্রহণ করেছেন। এখন আবার আপিলের শুনানি হবে। চ‚ড়ান্ত রায় হয়ে গেছে, মামলা ডিসমিসÍবিষয়টা এমন নয়। এখনো সুযোগ আছে। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় হয়নি। এখন লিভ টু আপিলের সুযোগ রয়েছে। জায়েদ জানান, এখনো তিনি চ‚ড়ান্ত ন্যায়বিচার পাবেন, এমন আশায় রয়েছেন।

অরুণা বিশ্বাস

সমিতির গঠনতন্ত্রের ধারা নিয়ে প্রশ্ন: এ সময় প্রশ্ন ওঠে সমিতির গঠনতন্ত্রের ৭(ক) ধারায় এই স্থগিতাদেশ দেওয়া যায় কি না? বিচারাধীন একটি মামলার বিপরীতে নিপুণ আক্তার সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে পারেন কি না? কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক শেষে অভিনেত্রী অরুণা বিশ্বাস এই বিষয়ে গণমাধ্যমে বলেন, জায়েদ খানের সদস্যপদ স্থগিত করার পরিকল্পনা করেই তারা কার্যনির্বাহী কমিটির সভা ডেকেছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য হলো জায়েদ খানের সদস্যপদ স্থগিত করা। কন্তু আমরা কঠোরভাবে এর প্রতিবাদ করেছি। কেননা আমি যতদূর জানি সাধারণ সম্পাদকের পদটি এখনও বিচারাধীন। গুণী এই অভিনেত্রী বলেন, আমি মনে করি ইলিয়াস কাঞ্চন ভাই অনেক সহনশীল মানুষ। তিনি বলেছেন যা হবে আইন মেনে হবে, কিন্তু বাকিরা খুবই এরোগ্যান্টভাবে কথা বলেছেন। যা থেকে স্পষ্ট যে তারা জায়েদ খানকে বহিষ্কারের এজেন্ডা নিয়েই এসেছেন। সংগঠনটির গেলো নির্বাচনে সহ-সভাপতি পদে চিত্রনায়ক রুবেল এবং কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য পদে জয়লাভ করেন অভিনেত্রী সুচরিতা। গঠনতন্ত্র মোতাবেক তারা শপথও নিয়েছিলেন। তবে নিয়ম অনুযায়ী পরপর তিনটি সভায় উপস্থিত হননি। এই কারণ দেখিয়ে তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। ব্যাখ্যার জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৭(খ) ধারা অনুযায়ী কার্যকরী কমিটি থেকে তাদের পদ বাতিল করা হয়েছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি নিপুণ আক্তার সাক্ষরিত এক নোটিশে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। শিল্পী সমিতি বরাবর পাঠানো সুচরিতা ও রুবেলের জবাবের কথা একই, কেবল নাম ভিন্ন। তারা বলেছেন, সভায় অনুপস্থিতির বহু কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সমিতির গঠনতন্ত্রের ৯(ঘ) ধারা অনুযায়ী ‘সাধারণ সম্পাদক’ পদটি কার্যনির্বাহী পরিষদের ‘প্রধান নির্বাহী’ এবং এই ধরনের দাফতরিক চিঠিপত্র তারই সাক্ষরে প্রেরণ হওয়ার কথা। কোনো যৌক্তিক/বৈধ কারণে তিনি অনুপস্থিত থাকলে তার স্থলে গঠনতন্ত্রের ৯(ঙ) ধারা মোতাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক তা সম্পাদন করবেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও এক্ষেত্রে গঠনতন্ত্রের ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে আমার কাছে পত্রটি প্রেরিত হয়নি। তার চেয়েও বড় সত্য এই যে, প্রধান নির্বাহীর উক্ত পদের (সাধারণ সম্পাদক) বৈধতা নিয়ে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে একটি মামলা এখনো বিচারাধীন বা অমীমাংসিত। এমতাবস্থায় সমিতির প্রধান নির্বাহী সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব ও কর্মকাণ্ডকে পাশ কাটিয়ে যে কোনো সভা-সমাবেশ বা নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা কার্যক্রম অগঠনতান্ত্রিক এবং একইসঙ্গে সর্বোচ্চ আদালত অবমাননার সামিল। সুচরিতা-রুবেলের বক্তব্যে স্পষ্ট, সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে এখনো আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় না আসায় তারা ঐ ব্যক্তির নেতৃত্বে সংগঠনের কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন না।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৩ এপ্রিল ২০২৩. প্রথম পৃষ্ঠা

‘সদস্যপদ নিয়ে হস্তক্ষেপ আদালত অবমাননার সামিল’: নিপুণকে নিয়ে ‘মানহানিকর’ বক্তব্য দেয়ায় গত ২২ ফেব্রুয়ারি লিখিত নোটিশ পাঠানো হয় জায়েদের ঠিকানায়। যেখানে বলা হয়, নিপুণকে নিয়ে ‘মানহানিকর’ বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। এ কারণে সমিতির গঠনতন্ত্রের ৭(ক) ধারা মোতাবেক তার সদস্যপদ স্থগিতের কথা ভাবছে সংগঠন। এর জবাবে রবিবার (০২ এপ্রিল) নিপুণকে একটি নোটিশ পাঠান জায়েদ। জায়েদ খান তার জবাবে জানান, তিনি পেশাগত কাজে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি দেশের বাইরে গিয়েছিলেন। ফিরেছেন গত ৬ মার্চ। কিন্তু এর ফাঁকে ২২ ফেব্রুয়ারি তার ঠিকানায় ‘অবৈধ’ নোটিশটি পাঠানো হয়। যা আরো অনেক পরে, ৩১ মার্চ হাতে পান বলে দাবি এ নায়কের। হাইকোর্ট নয়, নিপুণকে সুপ্রিমকোর্ট দেখিয়ে জায়েদ খান বলেছেন, সাধারণ সম্পাদক পদটির বৈধতা নিয়ে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় আপনার নিজেকে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক দাবি করে উক্ত নোটিশ ইস্যু করা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবমাননার সামিল। বিচারাধীন মামলাটি ‘ফ্রাস্ট্রেট’ করার অসৎ উদ্দেশ্যে উক্ত ২২ ফেব্রুয়ারি নোটিশটি ইস্যু করা হয়েছে। সদস্যপদ নিয়ে যে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত অবমাননার সামিল।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading