পদ্মা সেতুতে পরীক্ষামূলক চলল ট্রেন, অপেক্ষা নতুন সম্ভাবনার
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৩ । আপডেট ১৮:০০
স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে পরীক্ষামূলক চলল ট্রেন। মঙ্গলবার (০৪ এপ্রিল) দুপুর ১টার দিকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া পর্যন্ত পদ্মা সেতু হয়ে পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচল কার্যক্রম উদ্বোধন করেন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। পরে ১টা ২০ মিনিটে ট্রেনটি ছেড়ে যায়।
যাত্রা শুরু রাগের রেলমন্ত্রী সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তার স্বপ্ন একটা একটা করে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। তারই অংশ হিসেবে আজ ট্রায়াল ট্রেন চলছে।’
তার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ব্রিগেডিয়ার সাইদ আহমেদ। তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজ শুরু করতে আমাদের তিন মাস সময় দেরি হয়েছিল। তার পরেও সময় মতো কাজ শেষ করতে পারায় আমরা আনন্দিত। ইতোমধ্যে আমাদের এই অংশের কাজের ৯২ ভাগ শেষ হয়েছে। বাকি কাজই প্রকল্প মেয়াদ এর মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।
এদিকে আজ পদ্মা সেতুতে পরীক্ষামূলক ট্রেন চললেও ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত সরাসরি যাত্রী নিয়ে রেলপথে ট্রেন চলবে সেপ্টেম্বরে। আর আগামী বছর ট্রেন চলবে ঢাকা-যশোর রেলপথে।
পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্পের মাওয়া-ভাঙ্গা অংশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাঈদ আহম্মেদ জানান, গ্যাংকার দিয়ে ভাঙ্গা থেকে মাওয়া পর্যন্ত সাড়ে ৪১ কিলোমিটার রেলপথ পরীক্ষা করে দেখা হবে। এই পথে ডিজাইন-স্পিড ১২০ কিলোমিটার থাকলেও ৩০-৪০ কিলোমিটার বেগে টেস্ট-রান চালানো হবে।
পরীক্ষামূলকভাবে গ্যাংকার ট্রেনটি ভাঙ্গা থেকে রওনা হয়ে পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়ে মাওয়া আসবে। ট্রেনটি মূলত নির্মিত রেলপথ ইন্সপেকশনের কাজে ব্যবহার করা হয়।
সম্ভাবনার নতুন দ্বার উম্মোচন
পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলকে আনা হবে। এ জন্য পদ্মা সেতুতে নির্মিত হচ্ছে প্রথম ব্যালাস্টলেস রেলপথ। দোতলা পদ্মা সেতুর ওপরতলা দিয়ে চলাচল করছে যানবাহন এবং নিচতলা দিয়ে চলবে রেল। সেতুর উভয় প্রান্তেই ভায়াডাক্টে বসানো হয়েছে দেশের প্রথম ব্যালাস্টলেস বা পাথরবিহীন রেললাইন। পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে নির্মাণ করা হচ্ছে চারটি রেল স্টেশন। মাওয়ার রেল স্টেশনটি হবে তুলনামূলক নান্দনিক ও আর্কষণীয়। দেশের সবচেয়ে আধুনিক রেল জংশনের কাজ পুরো দমে চলছে।
পদ্মা রেল প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার মধ্য দিয়ে রেল যোগাযোগব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে। বর্তমানে যশোর থেকে ট্রেনে ঢাকায় যেতে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে রেলসংযোগ চালু হলে মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টায় আসা-যাওয়া করা যাবে। শুধু ব্যক্তিযোগাযোগই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যেও নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। চাইলে যশোর থেকে ঢাকায় গিয়ে অফিস করে আবার যশোরে ফেরা যাবে। এমন কথা আগে কল্পনাও করা যায়নি। পদ্মা সেতুতে রেল লিংক হচ্ছে বলেই এরকম ভাবা সম্ভব হচ্ছে। পদ্মা সেতু দিয়ে রেল চলাচল শুরু হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ত্রিমাত্রিক (সড়ক, নৌপথ ও রেলযোগাযোগ) যোগাযোগের যুগে প্রবেশ করবে।
বর্তমানে সেতু চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের দক্ষিণ- পশ্চিমাঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সম্ভাবনার দ্বার তৈরি হয়েছে আর এই সম্ভাবনাকে আরও ত্বরান্বিত করবে পদ্মার সেতু রেলপথ। দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার অপূর্ব মনোরম সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটা, খানজাহান আলীর মাজার ও ষাটগম্বুজ মসজিদসহ অনেক দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন স্পট রয়েছে, যা এত দিন উত্তাল পদ্মা নদী পেরিয়ে যাতায়াতের অসুবিধার কারণে জমে ওঠেনি। পদ্মা সেতুর মেলবন্ধন দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিতে যেমন নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, একইভাবে সেখানে শিল্পায়নে নতুন নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি পর্যটন খাতেও অপার সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের জিডিপি অন্তত ৩.৫ শতাংশ বাড়বে। আর দেশের জিডিপি বাড়বে অন্তত আরও ১.২৬ শতাংশ। ট্রান্স-এশিয়ান রেল ও সড়ক এই সেতুর মাধ্যমেই যুক্ত হবে।
এডিবি বলছে, ২০৫০ সালে ৬৭ হাজার যান চলাচল করবে এই সেতু দিয়ে। জরিপে আরও বলা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যেই ৫ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুবিধা পাবে এই সেতুর কল্যাণে। দক্ষিণাঞ্চলের দারিদ্র্য প্রতিবছর ১ শতাংশেরও বেশি হারে কমবে। অর্থাৎ, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথে আমাদের যাত্রা আরও ত্বরান্বিত হবে। এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।
জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদি এসডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ কাজ করেছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্ন রয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন অনেকটা হাতের কাছে চলে এসেছে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রায় তিন কোটি মানুষ উপকৃত হওয়ার স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে আরও নানান শিল্প, পর্যটনকেন্দ্র। এসব সারা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চার করবে। এতে রেল সংযোগের থাকবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
ইউডি/এ

