নীরব ঘাতক থ্যালাসেমিয়া: আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক

নীরব ঘাতক থ্যালাসেমিয়া: আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক

উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ০৮ মে ২০২৩ । আপডেট ১৩:০০

আজ বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হবে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হলো-‘সচেতন হই, নিজে জানি, যত্নবান হই: থ্যালাসেমিয়া রোগীর যত্নে দক্ষতা বাড়াতে জোর।’ বাংলাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে প্রতি ১৪ জনে একজনের থ্যালাসেমিয়ার বাহক রয়েছে আর ৭০ হাজারের বেশি শিশু থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতাই থ্যালাসেয়া প্রতিরোধের পূর্বশর্ত। এ নিয়ে আসাদুজ্জামান সুপ্ত’র প্রতিবেদন

দেশের ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়া বাহক

দেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এখন থেকে একে প্রতিরোধ করতে না পারলে আগামী প্রজন্মের নিরাপত্তা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অনেক পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ে নিঃস্ব হবে, দেশ হবে মেধাশূন্য। এই রোগে আক্রান্তদের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই বাংলাদেশে। তবে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সেন্টারের মতে সেখানে নিবন্ধনকৃত রোগীর সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক প্রায় ২৫০ মিলিয়ন। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি ১৪ জনে একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক রয়েছে। বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া বাহকের সংখ্যা দেড় থেকে ২ কোটি বলে মনে করা হয়। প্রতি বছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ হাজার। তবে সচেতনতার অভাব ও শনাক্ত না হওয়ায় প্রতিনিয়ত এ রোগের বাহক ও রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, দেশের জনগণের ১০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ লোক থ্যালাসেমিয়া বাহক বা রোগাক্রান্ত। এছাড়াও প্রতি বছর আরও ৭ হাজারের বেশি নতুন শিশু থ্যালাসেমিয়া রোগের জিনসহ জন্মগ্রহণ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানের মাত্র ১০ ভাগ বাহককে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আগামী ৫০ বছরে এই সংখ্যা ৫০ শতাংশে উন্নীত হবে। দেশ ও জাতি হবে মেধাশূন্য, কমে যাবে মানুষের কর্মক্ষমতা ।থ্যালাসেমিয়া জিনগত অর্থাৎ বংশানুক্রমিক রোগ। এই রোগ থ্যালাসেমিয়ার জিনবহনকারী দুই বাবা-মায়ের মাধ্যমে সন্তানের দেহে সংক্রমিত হয়। তবে সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় অপ্রতুলতার কারণে দুই থ্যালাসেমিয়া জিন বাহকের বিবাহ বন্ধ করতে না পারায় এই রোগ ক্রমেই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে বিস্তার লাভ করছে। এই রোগে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে ত্রুটি হয়। ফলে এই রোগে মানুষ অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতাসহ বিভিন্ন রকম জটিলতায় ভুগে থাকে। চিকিৎসকরা বলছেন, আগামী ৫০ বছর পর বাংলাদেশে শতকরা ৫০ ভাগ লোক থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত বা বাহক হবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিকিৎসা পদ্ধতির ধরন ও ঝুঁকি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক সৌমিত্র পাল বলেন, আমাদের হাসপাতালে বহির্বিভাগে প্রতিদিনই এই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। যেহেতু থ্যালাসেমিয়া রোগীর মূল চিকিৎসা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন। এটি একটি ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি। রক্ত নিয়ে রোগী বেঁচে থাকে। কিন্তু এই রোগের মূল চিকিৎসা হলো এর প্রতিরোধ করা। আমরা বলতে পারি থ্যালাসেমিয়া রোগী বা বাহক যাতে না তৈরি হতে পারে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসায় একজন রোগীর ২০-৩০ বছরের জীবনে রক্ত দেওয়ার মাধ্যমে এবং এ সম্পর্কিত জটিলতায় যে পরিমাণ খরচ হয়। বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনে এর প্রায় দ্বিগুণ বা এর কাছাকাছি পরিমাণে খরচ হয়। ২০১৭ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, আমাদের দেশে একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর শুধু রক্ত সঞ্চালনের জন্যই প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ লাখ টাকা বার্ষিক খরচ হয়। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই চিকিৎসা পদ্ধতি আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত মাত্র দু’জন থ্যালাসেমিয়া রোগীর ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম না থাকায় বাংলাদেশে অনেকেই জানেন না যে তিনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না। তাই অজান্তেই থ্যালাসেমিয়া বাহকদের মধ্যে বিয়ে হচ্ছে এবং দিন দিন থ্যালাসেমিয়া রোগী বাড়ছে। বাবা-মা উভয়ই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার ঝুঁকি ২৫ শতাংশ, বাহক হওয়ার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ আর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ। আর বাবা-মার যেকোনো একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া বাহক হওয়ার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ, সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ, তবে থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার আশঙ্কা নেই। চাচাতো, মামাতো, খালাতো, ফুফাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে হলে থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান

‘বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস’ উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধে সমাজের সচেতন নাগরিকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি। তিনি বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধে থ্যালাসেমিয়া জিন বাহক নারী-পুরুষের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও ভয়াবহ বংশগত রক্ত স্বল্পতার এ রোগটি প্রতিরোধে জনসচেতনতা গড়ে তোলা খুবই জরুরি। রাষ্ট্রপতি বলেন, জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব। এ লক্ষ্যে ‘বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস’ পালন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেন, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তস্বল্পতাজনিত দুরারোগ্য ব্যাধি। এ রোগ প্রতিরোধে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বাংলাদেশে এই রোগের জীন বাহকের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। বাহকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দেশের সার্বিক সুস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। বাহকে-বাহকে বিয়ে হলে দম্পতির সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বিধায় বিবাহের পূর্বে এই রোগের জীন বাহক কিনা তা জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্বারোপ

থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এর জিন বাহকের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বন্ধ করতে না পারলে আগামীতে এই রোগ প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞগণ। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা-মায়ের একজনও যদি থ্যালাসেমিয়া জিনের বাহক না থাকে বা সুস্থ থাকে তাহলে তাদের পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে এই রোগ সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কম। এজন্য অন্যতম প্রধান প্রতিরোধ হিসেবে চিকিৎসকরা বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। থ্যালাসেমিয়া বাহকদের মধ্যে বিয়ে হলে তাদের সন্তান থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ও শিশু হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের বিভাগীয় চেয়ারম্যান ডা. এ টি এম আতিকুল ইসলাম বলেন, থ্যালাসেমিয়া নির্মূলে ‘প্রি-ম্যারিটাল থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং এবং আইডেন্টিফিকেশন অব থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার’ একটি কার্যকর পদ্ধতিতে রূপান্তর করতে হবে। এই পদ্ধতিতে বাহক যাচাই ও সচেতনতা বৃদ্ধি করে, বাহকের সঙ্গে বাহকের বিয়ের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করতে হবে এবং সমাজে এর ভয়াবহতার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে। তবে বাহকরা থ্যালাসেমিয়ামুক্ত মানুষকে বিয়ে করতে পারবেন। দরকার হলে এনআইডি বা জাতীয় পরিচয়পত্রে থ্যালাসেমিয়া স্ট্যাটাস ব্লাড গ্রুপের মতো করে উল্লেখ করার ব্যবস্থা করতে হবে। এমনকি বিবাহ রেজিস্ট্রিতে থ্যালাসেমিয়া স্ট্যাটাস নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, আগামী ৫০ বছর পর আমাদের দেশের শতকরা ৫০ ভাগ লোক থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত বা বাহক হবে। ফলে দেশ ও জাতি মেধাশূন্য ও কর্মক্ষমতা শূন্য হয়ে যাবে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৮ মে ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা

থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য সরকারের নানা উদ্যোগ

সরকার দেশের চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের চতুর্থ এইচপিএনএসপি’র আওতায় ৮টি সরকারি মেডিকেল কলেজে থ্যালাসেমিয়া ম্যানেজমেন্ট সেন্টার গঠন করেছে। এই সেন্টারগুলোয় ‘ন্যাশনাল গাইডলাইনস অন থ্যালাসেমিয়া মানেজমেন্ট ফর ফিজিশিয়ানস’ অনুযায়ী রোগীদের বিনা খরচে চিকিৎসা ও ওষুধ সরবরাহ করা হবে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের রেজিস্ট্রেশন করে তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ‘ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদরোগ এবং থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি’ থেকে সরকার থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করছে। এছাড়া থ্যালাসেমিয়ায় ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। হাসপাতালে রোগ নির্ণয়, বøাড ট্রান্সফিউশন ও ওষুধ সরবরাহ আলাদা আলাদা জায়গায় হবে না, এক স্থানে হবে। এই ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে ভোগান্তি কমবে। থ্যালাসেমিয়ার মতো রোগের ক্ষেত্রে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এই রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা। এই রোগ প্রতিরোধের জন্য সরকারের পাশাপাশি সমাজের সবাইকে সচেতনভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ে এ রোগের সেবা পৌঁছে দিতে পারলেই নির্মূল করা সম্ভব। তাছাড়া স্কুল পর্যায়ে থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে জানাতে পাঠ্য বইয়ে বিষয়টি সংযোজন করা যেতে পারে যেভাবে অটিজম রাখা হয়েছে। থ্যালাসেমিয়া বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা কঠোরভাবে মানার ব্যবস্থা করতে হবে।

ইউডি/এজেএস

Taanjin

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading