তীব্র তাপদাহে জনজীবনে নাভিশ্বাস: এত গরম সহ্য হয় না!

তীব্র তাপদাহে জনজীবনে নাভিশ্বাস: এত গরম সহ্য হয় না!

উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ০৯ মে ২০২৩ । আপডেট ১২:৩৫

দেশজুড়ে বয়ে চলেছে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ। আর তীব্র এই গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। গত একদিনে রাজধানীসহ সারা দেশের গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা বেড়ে আরও দুই-তিনদিন অব্যাহত থাকবে বলে জানাচ্ছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। শুধু দেশেই নয় পুরো এশিয়াজুড়েই চলছে দাবদাহ। জলবায়ুবিদরা বলছেন, চলতি বছর হতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণতম বছর। এ নিয়ে বিনয় দাস’র প্রতিবেদন

তাপমাত্রার পারদ আবারও চূড়ায়

রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র তাপমাত্রা গত একদিনে বেড়েছে প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়ার অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়, ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের ২৪ ঘণ্টায় এই চুয়াডাঙ্গাতেই দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৩৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা সোমবার ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের ২৪ ঘণ্টায় এ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সূর্যের খরতাপে সবচাইতে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন খেটে খাওয়া মানুষজন। আপাতত বৃষ্টিপাতের কোনো সম্ভাবনা না থাকায় আরও দুই-তিন অবস্থা এমনই থাকবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। রাজধানী ঢাকায় তীব্র গরমে নাজেহাল অবস্থায় রয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। পর্যাপ্ত গাছ আর ছায়াযুক্ত স্থান না থাকায় রোদের উত্তাপ থেকে রেহাই মিলছে না। গরমের পাশাপাশি দীর্ঘ যানজট যেন গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো যন্ত্রণায় ফেলছে সাধারণ মানুষদের। তীব্র গরমে খেটে খাওয়া মানুষ সীমাহীন কষ্ট ভোগ করছেন। দাবদাহ উপেক্ষা করেই মাঠেঘাটে কাজ করছেন তারা, চালাচ্ছেন রিকশা, ঠেলাগাড়ি। প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই বাইরে বের হচ্ছেন না। তীব্র গরমে মানুষের শরীরের ত্বকে যেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বয়স্ক মানুষ, শিশু, অন্তঃসত্ত্বা, খেলোয়াড় এবং যাঁরা বাইরে কায়িক পরিশ্রমের পেশার সঙ্গে জড়িত তাঁরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন তাপপ্রবাহের সময়। সরাসরি সূর্যের নিচে যাঁদের কাজ করতে হয় তাঁদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

তাপমাত্রা মাপার পরিমাপক যন্ত্র

তিন কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাপমাত্রা, বলছে আবহাওয়া অধিদপ্তর

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ এ কে এম নামজুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, তিনটি কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে। এক, এপ্রিল ও মে মাস দেশের উষ্ণ মাস। গত এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে। এ দুই মাসের বৈশিষ্ট্যের কারণেই এখন গরম বেশি।
গরম হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হলো কম বৃষ্টি হওয়া। মে মাসের শুরুতে দেশের বিভিন্ন স্থানে কিছু কিছু বৃষ্টি হলেও গত দুই দিন বৃষ্টি একেবারেই কম। আর এ কারণে গরম বাড়ছে। গরম বেড়ে যাওয়ার তৃতীয় কারণ হিসেবে নাজমুল হক সাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কথা বলেন। তার মতে, এখন সাগর থেকে হাওয়া আসছে না; বরং ভ‚পৃষ্ঠের হাওয়া সাগরের দিকে ছুটছে। আর এ কারণে গরম বেশি।
গরম বাড়তে থাকলেও গত এপ্রিল মাসে যেভাবে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর গেছে, এ মাসে তেমন না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, গরম বেশি অনুভ‚ত হওয়ার কারণ, বাতাসে আর্দ্রতা বেশি। তিনি জানান, আরও অন্তত দু-তিন দিন এমন গরম থাকতে পারে।
আবহাওয়াবীদ কাজী জেবুননেছা জানান, লঘুচাপের প্রভাবে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়বে, সেই সঙ্গে বাড়বে তাপপ্রবাহের বিস্তার। তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠলে তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ, ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে মাঝারি তাপপ্রবাহ এবং তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে উঠে গেলে তাকে তীব্র তাপপ্রবাহ বলে। এ বছর এপ্রিল মাসে ২৬ দিন ছিল তাপপ্রবাহময়। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৬৬ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে এবার। ১৬ এপ্রিল ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ওঠে ৪০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা গত ৫৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। আর ১৭ এপ্রিল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছিল ঈশ্বরদীতে, যা দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।

বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ: আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’

দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাপপ্রবাহের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয়েছে একটি লঘুচাপ, যা ঘনীভ‚ত হয়ে ধাপে ধাপে ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিতে পারে। লঘুচাপটি ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিলে তার নাম হবে মোখা, এটা ইয়েমেনের দেওয়া নাম। আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেয় বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সাইক্লোন সংক্রান্ত আঞ্চলিক সংস্থা এসকাপ। এ অঞ্চলের ১৩টি দেশের দেওয়া নামের তালিকা থেকে পর্যায়ক্রমে নতুন নতুন ঘূর্ণিঝড়ের নাম ঠিক করা হয়।
সহকারী আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুননেছা গণমাধ্যমকে বলেন, দক্ষিণ পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ আন্দামান সাগরে দুদিন আগে একটি ঘূর্ণিচক্রের (সাইক্লোনিক সার্কুলেশন) সৃষ্টি হয়, যা সোমবার লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। লঘুচাপ তৈরির পর সুস্পষ্ট লঘুচাপ, নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ ধাপ পেরিয়ে তবেই ঘূর্ণিঝড় হবে। মঙ্গলবার এটি নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে, তখন এর গতি-প্রকৃতি নিয়ে পরবর্তী পর্যবেক্ষণ জানাবে আবহাওয়া অফিস।
তবে ইন্ডিয়ান আবহাওয়া অফিস তাদের পূর্বাভাসে বলেছে, আজ মঙ্গলবার নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার পর আগামীকাল বুধবার ঘূর্ণিঝড়ের রূপ পেতে পারে ওই ঘূর্ণিবায়ুর চক্র। প্রথম দিকে উত্তর উত্তর পশ্চিম দিকে অগ্রসর হলেও ১১ মে ঘূর্ণিঝড়টি ধীরে ধীরে বাঁক নিয়ে উত্তর উত্তর পূর্ব দিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার উপক‚লের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তবে সম্ভাব্য সেই ঘূর্ণিঝড় কবে কোন এলাকা দিয়ে উপক‚ল অতিক্রম করবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা স্পষ্ট হবে।
কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক পিএইচডি গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ দু’টি আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল বিশ্লেষণ করে ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ খুবই শক্তিশালী হবে এবং এটি বাংলাদেশ উপক‚লে আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক এই পিএইচডি গবেষক লিখেছেন, সোমবার (০৮ মে) ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল নির্দেশ করছে- সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ সরাসরি খুলনা ও বরিশাল বিভাগের উপর দিয়ে ১৪ মে রাত ১২টার পরে থেকে আঘাত হানতে পারে বাংলাদেশে। অন্যদিকে আমেরিকান আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল অনুসারে- ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ সরাসরি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার উপর দিয়ে ১৪ মে সকাল ৬ টার পর থেকে স্থল ভাগে আঘাত করার সম্ভাবনা রয়েছে।তিনি আরো লিখেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পান (২০২০ সলের ২০ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আঘাত হেনেছিলো- যার বাতসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৭৫ কিলোমিটার) স্থল ভাগে আঘাত করার দিন যত বেশি কাছাকাছি এসেছিলো ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল নির্দেশিত পথ তত বেশি সঠিক প্রমাণিত হয়েছিলো।

মানুষের পাশাপাশি পশু-পাখিও গরমে অতিষ্ঠ

২০২৩ সাল হতে পারে উষ্ণতম বছর, জলবায়ুবিদদের শঙ্কা

চলতি বছর (২০২৩ সাল) পৃথিবীর উষ্ণতম বছর হতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন জলবায়ুবিদরা। এল নিনো ধরনের আবহাওয়ার প্রভাবে ২০২৩ সালের শীত শেষ হতে না হতেই তাপমাত্রার পারদ যেভাবে চড়ছে, তা বিশ্বের উত্তর গোলার্ধের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর জন্য রীতিমতো অশনি সংকেত বলে মত বিশ্বের জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের। জলবায়ুবিদদের মতে, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে শুরু হতে যাওয়া এল নিনো আবাহাওগত প্যাটার্ন এই দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রাবাহের জন্য মূলত দায়ী এবং একে আরও অসহনীয় করে তুলছে মানবসৃষ্ট কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ব্যাপারটি। এল নিনোর প্রভাবে প্রশাসন্ত মহাসাগরের উপক‚লবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলে খরা বা অনাবৃষ্টি দেখা দেয়। কোনো কোনো অঞ্চলে অতিবর্ষণও ঘটে থাকে। আমেরিকা ও ইউরোপের জলবায়ু মডেলগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছর প্রশান্ত মহাসাগরে লা নিনা আবহাওয়া প্যাটার্ন ছিল। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ থাকা সত্তে¡ও খানিকটা কম ছিল বৈশ্বিক তাপমাত্রা; কিন্তু চলতি বছরের মাঝামাঝি বা তার কিছু পর থেকে লা নিনা শেষ হবে, শুরু হবে এল নিনো প্যাটার্ন।

রেকর্ড তাপদাহে পুড়ছে এশিয়ার বেশ কিছু দেশ

শুধু বাংলাদেশেই নয়, এশিয়া জুড়েই বইছে তাপ প্রবাহ। গত রবিবার এশিয়ার দেশ ভিয়েতনামের গড় তাপমাত্রা ছিল ৪৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার এই দেশটির ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড। তাপমাত্রার প্রভাবে বিদ্যুতের চাহিদায় আকস্মিক উল্লম্ফন এবং তার জেরে ভিয়েতনামে প্রায় ভেঙে পড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। প্রতিবেশী দেশ লাওসেও এ দিন রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রা ছিল। দক্ষিণপূর্ব এয়িশার অপর দেশ ফিলিপাইনে প্রায় প্রতিদিন তাপমাত্রার সূচক ‘বিপজ্জনক’ পর্যায়ে থাকায় স্কুলের সময়ঘণ্টা কমাতে বাধ্য হয়েছে সরকার।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৯ মে ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা
তাপপ্রবাহ থেকে থেকে মুক্তি পাচ্ছেনা ফিলিপাইনের দুই প্রতিবেশী থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়াও। গত সপ্তাহে প্রতিদিনই থাইল্যান্ডের উত্তর ও মধ্যাঞ্চালে তাপমাত্রা ছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর। তাপপ্রবাহের কারণে স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদাও। থাই জলবায়ুবিদরা সরকারের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, সামনের তিন বছর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে খরা দেখা দিতে পারে; সরকারের উচিত আসন্ন এই দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রাখা। খরার আশঙ্কায় আছে মালয়েশিয়াও। দেশটির আবহাওয়া দপ্তর এক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, চলতি বছর মালয়েশিয়ায় বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। যদি সত্যিই এমন হয়, সেক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পাম ওয়েল উৎপাদনকারী এই দেশটির ভোজ্যতেলের মূল কাঁচামাল পামের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তসরকারি প্যানেল (আইপিসিসি) এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা যেভাবে বাড়ছে, তা মানুষের জন্য বহুমাত্রিক বিপদ ডেকে আনবে।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading