কেপটাউনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক: পশ্চিমা আধিপত্য রুখতে ব্রিকস জোটের নতুন পরিকল্পনা
কিফায়েত সুস্মিত । শনিবার, ০৩ জুন ২০২৩ । আপডেট ১১:৪৫
পশ্চিমা দেশগুলোর বাইরে বিশ্বব্যবস্থার এক নতুন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছে ‘ব্রিকস’। জোটটি মূলত পশ্চিমের দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা – এই দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত জোট ব্রিকসকে দেখা হয় শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট ‘জি-সেভেন’-এর বিকল্প হিসেবে। আগামী ২২ আগস্ট জোহানসবার্গে এই জোটের মূল সম্মেলন আয়োজিত হবে। সে সম্মেলনের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে শুক্রবার (২ জুন) সদস্য রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা কেপটাউনে বৈঠক করছেন। এই সম্মেলনে নতুন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ডাক দিলো জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। এমন খবর উঠে এসেছে বিবিসি ও রয়টার্সের সংবাদে। শুরু থেকে খুব একটি সক্রিয় না থাকলেও সম্প্রতি ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক জোরদারে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব আছে বলে জানা গেছে। পশ্চিমের বিধিনিষেধের সঙ্গে মানিয়ে চলতে ব্রিকস এর নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক রুশ প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ রেখেছে। এ ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়েও আজ আলোচনা হতে পারে বলে দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র জানিয়েছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে ব্রিকস নেতারা জানিয়েছেন, তারা তেল উৎপাদনকারী দেশসহ নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী। কর্মকর্তারা জানান, ইতোমধ্যে ভেনেজুয়েলা, আর্জেন্টিনা, ইরান, আলজেরিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ব্রিকস এর সদস্য হতে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন বা ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
‘নতুন ভারসাম্য’ প্রতিষ্ঠার জোরালো বার্তা: দক্ষিণ আফ্রিকার রাজধানী কেপটাউনে এই সম্মেলনে স্বাগতিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী নালেডি প্যান্ডর বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অসাম্য ও নিরাপত্তাহীনতায় বিভক্ত পৃথিবীকে এক বৈশ্বিক নেতৃত্ব দেয়াটাই হচ্ছে এ জোটের রূপকল্প। ব্রিকস দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা ৩২০ কোটিরও বেশি – যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ। কেপটাউনে দুদিনব্যাপি সম্মেলনের প্রথম দিন শুক্রবার (২ জুন) ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর বলেন, এই জোট থেকে অবশ্যই একটি জোরালো বার্তা দিতে হবে যে বর্তমান বিশ্ব বহু-মেরুভিত্তিক, এখানে নতুন ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে এবং পুরোনো পথে নতুন পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যাবে না। তিনি বলেন, আমরা যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন তার মূলে রয়েছে অর্থনীতির কেন্দ্রীভবন, এবং এর ফলে অনেকগুলো দেশ অল্প কয়েকটি দেশের দয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা ব্রিকসকে ‘বহু-মেরুভিত্তিক এক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে অপরিহার্য’ বলে বর্ণনা করে বলেন – এটি উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রয়োজনের প্রতিফলন ঘটাবে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেন, সৌদি আরব সহ এক ডজনেরও বেশি দেশ এ জোটে যোগ দেবার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মা ঝাওশু বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলো এবং বিকাশমান বাজার অর্থনীতির দেশগুলোকে সহায়তা দেবার জন্য ব্রিকস জোটকে সম্প্রসারিত করা যেতে পারে।
সম্মেলনে রয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধের ছায়া: বিবিসির সংবাদদাতা অলিভার স্লো জানিয়েছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ কেপটাউনের এ সম্মেলনের ওপর ছায়া ফেলেছে। এসব অভিযোগের কারণে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ( আইসিসি) । যেহেতু দক্ষিণ আফ্রিকা এ আদালতের একটি সদস্য দেশ – তাই আগস্ট মাসে এখানকার জোহানেসবার্গ শহরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলনে যদি পুতিন যোগ দিতে আসেন তাহলে তাকে তারা গ্রেফতার করতে পারবে। তবে দেশটির একজন উপমন্ত্রী এ সপ্তাহেই বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পুতিনকে গ্রেফতার করা হবে কিনা সরকারকে সে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার আইনে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিজ প্যান্ডরও এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন – এ ব্যাপারে তার দেশের চূড়ান্ত অবস্থান জানাবেন প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। কেপটাউনের সম্মেলনে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের উপস্থিতির প্রতিবাদ করে একদল বিক্ষোভকারী। তারা লাভরভের ছবিসম্বলিত প্ল্যাকার্ড তুলে ধরে যাতে লেখা ছিল ‘শিশু হত্যাকারী’। একজন বিক্ষোভকারী এএফপি বার্তা সংস্থাকে বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার কর্মকর্তারা লাভরভের সাথে হাত মেলাচ্ছেন – এ দৃশ্য দেখাটা যন্ত্রণাদায়ক। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষমতাসীন এএনসি দলের সাথে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে এবং ইউক্রেনে রুশ অভিযানের সমালোচনা করতেও অস্বীকার করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। গত মাসে জাপানের হিরোশিমা শহরে অনুষ্ঠিত জি-সেভেনের শীর্ষ সম্মেলনে ব্রাজিল ও ইন্ডিয়ার নেতারা যোগ দিয়েছিলেন এবং ওই সম্মেলনে জি-সেভেন দেশগুলো রাশিয়া ও চীনের তীব্র সমালোচনা করে।

পুতিনের অংশগ্রহণ কেন অনিশ্চিত?
আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন অংশগ্রহণ করতে পারবেন কি না, সেটি নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজধানী কেপটাউনে আলোচনা করেছেন ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। আলোচনায় উঠে এসেছে, চলতি বছরের আগস্টে জোহান্সবার্গে হতে যাওয়া সম্মেলনটিতে পুতিনের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত, কেননা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শুক্রবার (২ জুন) রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসের পাঁচটি দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের মধ্যে বৈঠকে এমন আলোচনা হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা আইসিসির সদস্য দেশ হওয়ায় দেশটিতে পুতিন গেলে তাকে তাত্বিকভাবে গ্রেফতারের কথা রয়েছে। তবে এর বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে ভাবছেন বলে জানিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নালেদি পান্ডোর। তিনি বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বিষয়টি নিয়ে দেশটির সর্বশেষ অবস্থান জানাতে পারবেন। চলতি বছরের মার্চে পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি। ইউক্রেনে আগ্রাসন ও জোরপূর্বক শিশুদের স্থানান্তরের দায়ে এমন পদক্ষেপ্প নেয় আইসিসি। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে মস্কো। জানুয়ারিতে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে পুতিনকে আহ্বান জানিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। বিষয়টি নিয়ে কোনও পরিকল্পনার কথা জানাননি পুতিন। ক্রেমলিন শুধু জানিয়েছে, ‘সঠিক পর্যায়ে’ অংশ নেবে রাশিয়া। বিশ্বকে বহু-মেরুকরণ করা নিয়ে মূলত বৈঠকে আলোচনা করেছেন ব্রিকস নেতারা।
ইউডি/কেএস

