তাপদাহ : লাখো মৃত্যু রুখতে কতটা প্রস্তুত মধ্যপ্রাচ্য?
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ০৭ জুন ২০২৩ । আপডেট ১০:২০
ইরাকে কখনো কখনো তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসও (১২২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ছাড়িয়ে যায়। সেই অবস্থায় মানুষ বাঁচে কী করে? কী করে অফিসের কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য করেন? জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্রতিবেদকদের বাগদাদভিত্তিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা খোলুদ আল-আমিরি জানান, সেরকম গরমে ইরাকের বেশির ভাগ মানুষ ঘরেই থাকেন। তাপমাত্রা যে নাগালের বাইরে চলে যাবে সে বিষয়ে তথ্য আমরা সাধারণত রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত টেলিভিশন চ্যানেল আল ইরাকিয়ার কাছ থেকে আগেই পেয়ে যাই। কখনো কখনো তা সোশ্যালমিডিয়াও প্রচার করা হয়। তারা আমাদের কাজে না যেতে বলে দেয়। জার্মানভিত্তিক গণমাধ্যম ডয়চে ভেলে বলছে, যাদের স্বাস্থ্য খুব নাজুক তাদের বাইরে না যাওয়ার কথাও বলে দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, আমরা যেন পাখি বা অন্য প্রাণীদের জন্য গাছের নীচে পানি রেখে আসি- সে কথাও বলে দেওয়া হয় আমাদের। তিনি আরো জানান, সরকারের প্রতি আস্থা অতি অল্প বলে, তীব্র তাবদাহের সময় প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে বাঁচার কৌশলটা নিজে নিজেই শিখে নেয় ইরাকের মানুষ।
বিপর্যয়ের শঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব আফ্রিকা
গত মে মাসে বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল নেচার সাসটেইন্যাবিলিটি-র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫%-এর চেয়ে বেড়ে ভয়াবহ একটা অবস্থায় চলে যেতে পারে। গত এপ্রিলে ব্রিটেনের বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল ল্যান্সেট আগামী কয়েক দশকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ব্যাপক হারে বাড়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কী অবস্থা হতে পারে তা নিয়ে একটি সমীক্ষা প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, তীব্র তাবদাহের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে তাপদাহজনিত রোগে মৃত্যুহার অনেক বাড়বে। এখন তাপদাহজনিত রোগে ১০০০ জনের মধ্যে যেখানে মাত্র দুই জনের মৃত্যু হয়, তখন সেই সংখ্যাটা দাঁড়াবে ১২৩-এ। তাপদাহ এই হারে বাড়তে থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে শুধু ইরাকেই তাপদাহজনিত অসুস্থতায় মারা যাবে এক লাখ ৩৮ হাজারের মতো মানুষভ।
প্রবীণ এবং নগরবাষীদের ঝুঁকি বেশি
ল্যান্সেটের সমীক্ষায় বলা হয়, ২০৫০ সাল নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যের ৭০ ভাগের মতো মানুষ বড় বড় শহরে বসবাস শুরু করবে। এর প্রভাবে শহরাঞ্চলে তাপমাত্রা অনেক বাড়বে। ফলে তাপদাহজনিত কারণে মৃত্যুও বাড়বে। গবেষকরা বলছেন, মৃত্যু বেশি বাড়বে প্রবীণদের মাঝে। গবেষকরা আরো বলছেন, চলতি শতকে বিশ্বের কোনো কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা দুই থেকে ৯ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে।
কিন্তু জাতিসংঘের চিফ হিট অফিসার এলেনি মিরিভিলি বলেন, আবহাওয়াজনিত বিপর্যয়গুলোর মধ্যে চরম তাপমাত্রা সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠলেও সারা বিশ্বেই বিষয়টিকে অবমূল্যায়ন করা হয় বা খুব কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বড় বিপর্যয় এড়াতে হলে সরকারগুলোর উচিত চরম তাবদাহ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রস্তুতি এবং নিজেদের রক্ষার কৌশল নির্ণয়ের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা।
পরিকল্পনায় কী কী রাখা উচিত সরকারের? এই প্রশ্নের উত্তরটা সবচেয়ে সহজ করে দিয়েছেন আল-আমিরি, তাপদাহের সময়ের কথা মাথায় রেখে আমাদের জরুরি সেবা দেওয়ার জন্য ডেডিকেটেড ক্লিনিক গড়তে হবে, আগাম প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য তথ্য সরবারের ব্যবস্থা আরো উন্নত করতে হবে। এসবের পাশাপাশি প্রচুর গাছ লাগিয়ে সবুজের বিস্তার ঘটাতে হবে। তবে ল্যান্সেটের গবেষকরা মনে করেন, এসব করলে তাপমাত্রা আশানুরূপ কমবে না। তাদের মতে, তাবদাহজনিত মৃত্যুর ৮০ ভাগই হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে আর সেই বিপর্যয় এড়াতে হলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রির মধ্যে আটকে রাখতে হবে।
৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পরিণতি কী?
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার কিছু এলাকা এরইমধ্যে পৃথিবীর চরম উষ্ণ ও শুষ্ক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অদূর ভবিষ্যতে কিছু এলাকা বাস অযোগ্য হয়ে যাবে, কারণ তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (এমইএনই) অঞ্চলে বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসাবে দেখা দেবে পানির দীর্ঘস্থায়ী সংকট, চরম আবহাওয়ার কারণে খাদ্য উৎপাদনে অক্ষমতা। চরম তাপমাত্রার ফল হিসাবে খরা, উষ্ণতাজনিত মৃত্যু ও নানা স্বাস্থ্য সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করবে।
সাম্প্রতিক গবেষণার বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা। জার্নাল নেচারে বলা হয়, যদি গ্রিন হাউজ গ্যাসের বর্তমান নির্গমন হার অব্যাহত থাকে তাহলে ২১০০ সাল নাগাদ ৬০ কোটি অথবা এই অঞ্চলের ৫০ শতাংশ মানুষ ‘সুপার এক্সট্রিম’ আবহাওয়ার মুখে পড়বে। সপ্তাহজুড়ে কিংবা মাসজুড়েই দুঃসহ তাপ অব্যাহত থাকবে। গবেষণা জার্নালে বিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের অনুমান অনুসারে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা চলাকালে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার কিছু নগর ও মেগাসিটিতে তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবে। যা সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপর্যয়কর হয়ে উঠবে।
গবেষণার প্রধান লেখক জর্জ জিটিস আল জাজিরাকে বলেন, সমুদ্র অঞ্চলে বেড়ে যাওয়া বাষ্পীভবন থেকে উচ্চ আর্দ্রতা মানুষের বিপদ আরো বাড়িয়ে তুলবে। এই এলাকার কিছু কিছু জায়গায় গ্রীষ্মকালের চরম উষ্ণ মাসগুলোতে বেঁচে থাকা সক্ষমতা চরম সীমায় চলে যাবে অথবা তা অতিক্রম করে যাবে। বিশেষ করে উপসাগরীয়, আরব ও লোহিত সাগরের তীরবর্তী প্রধান নগর অঞ্চল যেমন দুবাই, আবুধাবি, দোহা ডারহাম ও বন্দর আব্বাসে চরম তাপমাত্রা এগুলোকে অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত করেছে। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাবে, নগরগুলোতে বাড়তি তাপ অনুভূত হচ্ছে ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ রাজধানী শহরে বছরের চার মাস চরম গরম থাকছে।
পৃথিবীর মোট পানি সংকটের ৭০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে। জলবায়ুর উষ্ণতা আর্থ-সামাজিক পতনকে ত্বরান্বিত করছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, রেকর্ড সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত ও খরার কারণে ইরাক ও সিরিয়ার ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ খাদ্য, পানি ও বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে না। সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে সুপেয় ও চাষাবাদের জন্য পানির অভাব। বর্তমানে সিরিয়া গত ৭০ বছরের মধ্যে ভয়াবহ খরার মুখে রয়েছে। সহায়তা কর্মীরা একে নজিরবিহীন বিপর্যয় বলে মন্তব্য করেছেন।
ইউডি/এ

