নিরাপদ খাদ্য ও মানবতার ভবিষ্যৎ : সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ০৭ জুন ২০২৩ । আপডেট ১৪:২৫
আজ বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উদ্যোগে প্রতি বছরের মতো এবারও ৭ জুন বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এ বছর বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘খাদ্যের মান জীবন বাঁচায়’। নিরাপদ খাদ্য ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে মিলন গাজী’র প্রতিবেদন
বিশ্বের ৩১০ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই
বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা ইস্যুতে সচেতনতা বাড়াতে ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস পালন করা হচ্ছে। এরপর থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সদস্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি অন্যান্য স্টেকহোল্ডাররাও যৌথভাবে দিবসটি পালন করে আসছে। বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ বড় চ্যালেঞ্জের। যার ফলে মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা সংশয়।
বিশ্বে ৩১০ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য ‘এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্য অধিকার এবং কৃষি খাদ্যব্যবস্থা সম্মেলন ২০২৩’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার (০৬ জুন) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০২২ সালের প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭ সাল থেকে বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালে বিশ্বের তিনজনের মধ্যে প্রায় একজন অর্থাৎ ২৩৭ কোটি মানুষের পর্যাপ্ত খাবারে প্রবেশাধিকার ছিল না এবং ২০২০ সালে প্রায় ৩.১ বিলিয়ন মানুষ পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করতে পারেনি। এফএও’র গবেষণায় বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতির চিত্রে প্রতীয়মান হয়, বিশ্বের জনসংখ্যার ৩০.৪ শতাংশ অর্থাৎ ২৪০ কোটি মানুষ মাঝারি বা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হয়েছে।
দেশে ভেজাল খাদ্যে বাড়ছে রোগ-বালাই, মৃত্যু ঝুঁকি
বাংলাদেশেও অনিরাপদ খাদ্যের ঝুঁকি প্রবল। তবে কখনও কখনও নিরাপদ খাদ্যের চেয়ে খাদ্য প্রাপ্তিই বড় হয়ে দেখা দেয়। গত ৩ বছর করোনা মহামারি এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের দামামায় বাংলাদেশে তেল, চাল, ডাল, চিনি, পেঁয়াজ, মাংস, দুধ, ডিমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে সরবরাহ ঘাটতি এবং দামের উত্তাপে সেটি আঁচ করা যায়। জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটির এক গবেষণায় বলছে, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লাখ, কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ। এ ছাড়া গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। এই পরিসংখ্যানটি আমাদের ভাবিয়ে না তুলে পারে না।
ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার। খাদ্যে ভেজাল ও নকল ওষুধ দেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা শহরের ৭০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৫০ শতাংশ খাদ্যে ভেজাল। এক গবেষণা সূত্রে জানা যায়, আমাদের শরীরে ৩৩ শতাংশ রোগ হওয়ার পেছনে রয়েছে ভেজাল খাদ্য। এই ভেজাল খাদ্য ও নকল ওষুধের বিরুদ্ধে সরকারকে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তা নাহলে, এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। খাদ্যে ভেজাল শুধু যে শারীরিক ক্ষতি তা নয়, এর কারণে জাতীয় উন্নতিও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। রাস্তার খাবারের ৯০ ভাগই মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি বলছেন বিশেষজ্ঞরা। রাস্তার খাবার খেয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ নানা বয়সী মানুষ ক্যান্সারসহ নানা দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন।
বিশ্লেষকগণ বলছেন, প্রতিদিন মোট জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষ দিনের কোন না কোন সময় রাস্তার খাবার খাচ্ছে। এর মধ্যে ৪০ ভাগ পুরুষ ও ৬০ ভাগ নারী রয়েছে। রাস্তার খাবার তৈরীর সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা জানে না কোন খাবার কিভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, কিভাবে পরিবেশন করতে হবে। এসব না জানার কারণে খাবারের মাধ্যমে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াসহ বিভিন্ন জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে খাবার সংরক্ষণের বিষয়ে উৎপাদনকারীদের ভাল ধারণা নেই। ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি দিন দিন বেড়েই চলছে।
বছরে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় ভেজাল খাবারে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়। যার থেকে মারা যায় ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষ। এ ছাড়া ৫ বছরের চেয়ে কম বয়সী শিশুদের ৪৩ শতাংশই অনিরাপদ খাবারজনিত রোগে আক্রান্ত হয়, যার থেকে প্রতি বছর মৃত্যুবরণ করে ১ লাখ ২৫ হাজার শিশু। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য মতে, বিশ্বে এখন প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ খাদ্যের অভাবে দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত।

২০২২ সালে অক্সফ্যাম প্রতিবেদনে প্রকাশ করে যে, করোনা মহামারী, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং বৈষম্যের মধ্যে অপুষ্টির শিকার। মানুষের জন্য খাদ্য সংকট বড় অন্তরায় হিসেবে যোগ হয়েছে। ৭৫টি দেশের মানবিক বিভিন্ন সংস্থা ৭৭তম জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাছে চিঠিতে অনুমান করেছে যে, প্রতি চার সেকেন্ডে একজন মানুষ ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রত্যেকের পর্যাপ্ত খাবারের চেয়ে বেশি উৎপাদন হলেও তথ্য এবং যোগানের অভিগম্যতার অভাবের কারণে মহামারী, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা আবার ব্যাপকভাবে লিঙ্গ বৈষম্যকে নির্দেশ করে, যা শুধুমাত্র নারীদেরই নয় বরং তাদের শিশুদেরও প্রভাবিত করে।
আইন আছে, দরকার যথাযথ প্রয়োগ বলছেন বিশ্লেষকগণ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, খাদ্যনিরাপত্তার চারটি ‘পিলার’ বা স্তম্ভ আছে। এগুলো হলো সহজলভ্যতা, প্রবেশাধিকার, উপযোগিতা ও স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশে শুধু নয়, সারা বিশ্বে নিরাপদ খাদ্য ভোক্তার অধিকার হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত। বাংলাদেশে সংবিধান অনুযায়ী মানুষের জীবনধারণের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার অন্যতম হলো খাদ্য। বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা সাংবিধানিকভাবে মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত না হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃত। জনস্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধানে ব্রিটিশ আমল থেকে অনেক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তায় দেশে ২০১৩ সালে আইন হয়েছে। ২০১৫ সালে গঠন করা হয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। ভেজালবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি তারা কাজ করছে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেজালবিরোধী অভিযান তো আছেই। তার পরও কমছে না ভেজালের ব্যাপকতা। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেয়া এবং ভেজাল খাদ্য বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ১৪ বছরের কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বিশ্লেষক ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ বলেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। ভেজাল পণ্য ও অসাধু ব্যবসায়ীদের ঠেকাতে অভিযান নিয়মিত থাকলে ভেজালকারীদের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা যায়।

তবে ভেজাল ঠেকাতে সচেতনতার বিকল্প নেই। শুধু আইন দিয়ে ভেজাল ঠেকানো সম্ভব নয়। এ জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে ২৫ লাখ ক্ষুদ্র বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায়ী ও ১৮টি মন্ত্রণালয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া দেশে প্রায় ৪৮৬টি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের অধীন প্রায় ১২০টি আইন ও নীতিমালা রয়েছে। সর্বস্তরে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যত আইন রয়েছে, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সেগুলো কার্যকর করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: সরকার, উৎপাদক ও ভোক্তা, সকলেরই দায়িত্ব
দেশে খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণ বেড়েই চলেছে। মানব স্বাস্থ্য পতিত হচ্ছে চরম ঝুঁকিতে। সুস্বাস্থ্য লাভের জন্য পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবারের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো বর্তমান সময়ে এসে দেশে যথাযথ পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার পাওয়া একপ্রকার দুষ্কর হয়ে পড়েছে। দেশের প্রতিটি মানুষের দেহ এখন খাদ্যে ভেজালের কারণে স্বাস্থ্যহানির সম্মুখীন। শিশুদের খাদ্য থেকে শুরু করে কোনো খাদ্যই এখন ভেজালমুক্ত নয়। আর ভেজালযুক্ত এসব খাদ্য গ্রহণের কারণে মানবদেহে তৈরি হচ্ছে অনিরাময়যোগ্য হরেক রকমের রোগ। এগুলো একজন মানুষকে অনায়াসে নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে। খাদ্যে ভেজাল রোধ করা এখন সময়ের অন্যতম দাবি।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৭ জুন ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা
তবে খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণ রোধে প্রশাসনের তরফ থেকে কঠোর অবস্থান নেই বললেই চলে। খাদ্যে ভেজাল রোধে প্রশাসন মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। ফলমূল, শাকসবজির অধিকাংশই আমাদের দেশে উৎপাদিত হয়। এই নির্ভেজাল খাদ্যগুলোকে দুষ্ট ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা বেশি দিন ধরে টিকিয়ে রাখতে এবং মৌসুমি ফলমূল যাতে দীর্ঘ সময় ভালো রাখতে পারে, সেজন্য ফরমালিন মিশিয়ে সেগুলোকে করে তুলছে বিষাক্ত। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার, উৎপাদক ও ভোক্তা, সকলের। প্রত্যেকেরই খাদ্য উৎপাদন হতে শুরু করে খাদ্য গ্রহণ করা পর্যন্ত খাবার যেন নিরাপদ হয় তা নিশ্চিত করায় ভূমিকা রাখতে হবে। বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস- এর মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা খাদ্য সুরক্ষাকে জনগণের মূলধারার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষযয়ের সাথে যুক্ত করার কাজ করে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সমগ্র পৃথিবীতে খাদ্যের কারণে যে সকল রোগ ছড়ায় তা হ্রাস করার চেষ্টা করছে।
ইউডি/এজেএস

