যত চাপ আসুক বাংলাদেশ মাথা নত করবে না
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ০৮ জুন ২০২৩ । আপডেট ০৮:০০
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের জনগণ কখনোই কোনো বিদেশি চাপের কাছে মাথা নত করবে না। ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়েজিত এক আলোচনা সভায় সভাপতির ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের চুম্বক অংশ নিয়ে সাদিত কবির’র প্রতিবেদন
মানুষের ভাগ্য নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দেশি-বিদেশি চাপ যতই আসুক না কেন, বাঙালিরা কখনোই সেই চাপের কাছে মাথা নত করবে না। আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, এ দেশ আমাদের। এদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে আমরা কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেব না। আমরা (আওয়ামী লীগ) সংগ্রামের মাধ্যমে এদেশে গণতন্ত্র এনেছি। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আজ এগিয়েছে -উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরাই আমাদের দেশের মানুষের অধিকার রক্ষা করব। ছয়-দফা ছিল বাংলাদেশের জনগণের ‘মুক্তি সনদ’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে দেশের অগ্রযাত্রা সম্ভব হয়েছে এবং বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। আমরা রোল মডেল হিসাবেই এগিয়ে যাব। তিনি দেশের জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বাংলাদেশের জনগণকে আর কেউ দমন করতে পারবে না। তিনি বলেন, “গত সাড়ে ১৪ বছরে বাংলাদেশ ব্যাপক পরিবর্তন ও উন্নয়ন হয়েছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলব। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি দলের নেতাকর্মীদের এ বিষয়ে সচেতন হতে এবং দেশের মানুষের পাশে থেকে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার নির্দেশ দেন, যাতে তাদের ভাগ্য নিয়ে কেউ খেলতে না পারে।
আওয়ামী লীগ প্রতিবারই জনগণের ভোট পেয়ে ক্ষমতায় এসেছে: প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র তিনিই ২০০১ সালে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোটারবিহীন সাধারণ নির্বাচন এবং ২০০৬ সালে একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের জনগণকে মনে রাখতে হবে যে, খালেদা জিয়া ভোট জালিয়াতির অভিযোগে দু’বার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, জনগণ ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে আওয়ামী লীগ কখনো পরাজয় বরণ করেনি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ প্রতিবারই জনগণের ভোট পেয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং কখনো ক্ষমতা দখল করেনি। বিএনপি ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আজকে তারা ভোটার বিহীন নির্বাচনের কথা বলে। ভোটার বিহীন কে? খালেদা জিয়া, জিয়াউর রহমান ও এরশাদ ছিলেন ভোটার বিহীন। তারা ভোটার বিহীন ছিলেন বলে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী ব্যক্তির পকেট থেকে গঠিত দলের নেতারা এখন গণতন্ত্র, নির্বাচন ও ভোট কারচুপির কথা বলেন।তিনি বলেন, তোমরা ভোট ডাকাত, তোমরা গণতন্ত্র জানো না, তোমরা কারফিউ গণতন্ত্র জানো।” তিনি বলেন, এটা বাঙালিদের জন্য দুর্ভাগ্য, কারণ, তাদের কাছে গণতন্ত্রের কথা শুনতে হচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, বাঙালির দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, যারা দেশে গণতন্ত্র এনেছে তাদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা চলছে।
যাদের কথায় বিএনপি নাচে, তারাই বিএনপিকে ধ্বংস করবে: প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাইরের কোনো শক্তি বিএনপিকে ক্ষমতায় বসাতে পারবে না, বরং তাদের ব্যবহার করা হবে। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি ঘোষণার পর, বিএনপির উৎফুল্ল মেজাজ প্রসঙ্গে বলেন, তারা মনে করে- অন্য কোথাও থেকে কেউ এসে, তাদের আনন্দ-উল্লাস করে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। কেউই এটি করবে না (তাদের ক্ষমতায় আনতে) এবং কখনও কেউ তা করে না, বরং ব্যবহার করে। এটি (তাদের) ব্যবহার করবে, কিন্তু তাদের ক্ষমতা দেবে না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগই গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষা করেছে এবং দেশে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেছে। শেখ হাসিনা বলেন, আজকে তারা (বিএনপি) আন্দোলন-সংগ্রাম করবে। এক দিক থেকে এটি ভাল, যে তারা যদি অগ্নিসংযোগ সহিংসতা অবলম্বন করে এবং মানুষকে হত্যা করে, তবে তারা মার্কিন ভিসা পাবে না। তিনি বলেন, যাদের কথায় তারা (বিএনপি) নাচে, তারা তাদের (বিএনপি) ধ্বংস করবে। তিনি বলেন, “আমাদের কিছু করার নেই। এ নিয়ে আমাদের ভাবারও কিছু নেই।” তিনি (সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে) আগেই বিএনপিকে আন্দোলন করতে দিতে বলে দিয়েছেন উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, তারা কতো আন্দোলন করতে পারে, করতে দিন। আমরা কিছু বলব না। তবে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সবসময় তাদের চোখ খোলা এবং ক্যামেরা চালু রাখতে বলেছেন, যাতে তারা ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালের মতো অগ্নিসংযোগ সহিংসতা, মানুষ পুড়িয়ে মারা এবং মানুষ হত্যার পুনরাবৃত্তি করতে না পারে। তবে তিনি বলেন, তারা (বিএনপি) উসকানি দিয়ে দেশের বাইরে ছবি পাঠাতে পারে। তারা জনগণের শক্তিতে বিশ্বাস করে না।
দু-একদিনের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বলেছেন, জাতীয় গ্রিডে আরও বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার ফলে চলমান বিদ্যুতের পরিস্থিতি আগামী ১০-১৫ দিনের মধ্যে স্বাভাবিক হবে। তিনি বলেন, আমরা লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছি। আমি জানি, মানুষ কষ্ট পাচ্ছে, মানুষের দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করতে পারি। আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করছি। আগামী দু-একদিনের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। ১০-১৫ দিনের মধ্যে আরও বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। তখন আর কোনো কষ্ট থাকবে না।প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্ভাগ্যবশত, এবার মানুষকে প্রচন্ড গরম সহ্য করতে হচ্ছে যা অস্বাভাবিক। তিনি বলেন, বাংলাদেশে তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রিতে উঠবে তা আমরা ভাবতেও পারতাম না।তিনি বলেন, বৃষ্টি নেই, এতে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ‘উপায় খুঁজতে আমরা বারবার মিটিংয়ে বসেছি এবং এই কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একাই শুধু বৈশ্বিক কারণে সৃষ্ট এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে না। তিনি বলেন, তাঁরা বাংলাদেশকে ভালো অবস্থানে রেখে প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতি সবকিছুকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি: কিছু মানুষ সুযোগটা নিচ্ছে: রাশিয়া-ইউইেন যুদ্ধ পরিবহন ব্যয়ও বাড়িয়ে দিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্যাংশন পাল্টা স্যাংশনে প্রত্যকটা জিনিসের দাম বেড়ে গেল। এ জাহাজে এল কেন? ওই জাহাজে এল কেন? এটা ভিড়তে দেবে না, ওটা ভিড়তে দেবে না। শুধু দেশের ওপর স্যাংশন নয়, জাহাজের ওপরেরও স্যাংশন দিয়ে বসে আছে আমেরিকা। ফলে প্রত্যেকটা দেশে আজকে মুদ্রাস্ফীতি। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সীমিত আয়ের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, কিছু লোক আছে সুযোগটা নেয়, মজুদ করে রাখে। পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে তার বক্তব্যে। বলেন, “উৎপাদন যখন করেছি তখন দাম হু হু করে বেড়ে গেল। আমদানি করার কারণে ওমনিই দাম কমে গেছে। মজুদদারা অপকর্ম না করলে উৎপাদিত পেঁয়াজ দিয়েই আমাদের হত। আমারও জানি কখন কোন জবাবটা দিতে হয়, কখন কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের যারা জ্ঞানী-গুণী আছেন বুদ্ধি বেচে জীবিকা নির্বাহ করে যাহারা-বুদ্ধিজীবী। অনেক পড়াশোনা জানে এটা ঠিক। অনেক কিতাব পড়ে। ওই কিতাবই পড়েছে। আমি বিদ্যুৎ দিয়েছি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে তারা বক্তৃতা করে। ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি। সেটার সুযোগ নেয়। প্রাইভেই টেলিভিশন আওয়ামী লীগ দিয়েছে। সেই সুযোগ নিয়ে টকশো করে বলে দেবে এই বাজেট আওয়ামী লীগ কোনোদিনই বাস্তবায়ন করতে পারবে না। আমি স্পষ্ট করতে চাই, কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারব এটা জেনেই বাজেট দিয়েছি।
দেশে কি পরিমাণ খাদ্য ও গ্যাসের মজুত আছে জানালেন সরকারপ্রধানঃ দেশে বর্তমানে ১৬ দশমিক ২৭ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মজুত খাদ্যশস্যের মধ্যে চাল ১২ দশমিক ২৫ মেট্রিক টন, গম ৩ দশমিক ৯৬ মেট্রিক টন এবং ধান ৯ হাজার মেট্রিক টন। বুধবার (০৭ জুন) জাতীয় সংসদে কাজিম উদ্দিন আহম্মেদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য জানান। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী জানান, খাদ্য মজুত বাড়াতে বর্তমান বোরো সংগ্রহ মৌসুমে ৪ লাখ মেট্রিক টন ধান ও ১২ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন চালসহ চাল আকারে সর্বমোট ১৫ দশমিক ১০ লাখ মেট্রিক টন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ মেট্রিক টন নির্ধারণ করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অধিকতর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত ছয় দশমিক ৩৪ লাখ মেট্রিক টন চাল ও ছয় দশমিক ৮০ মেট্রিক টন গম আমদানি করা হয়েছে। আলী আজমের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের নতুন নতুন এলাকায় ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ ও সার্ভে কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩২ হাজার ৫৮১ লাইন কিমি ২ডি এবং ৬ হাজার ২২২ বর্গ কিমি ৩ডি সিসমিক সার্ভে সম্পন্ন হয়েছে। এ সময়ে ২০টি অনুসন্ধান কূপ, ৫৪টি উন্নয়ন কূপসহ ৭৪টি কূপ খনন এবং ৪১টি কূপে ওয়ার্কওভার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। ফলে ৬টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। দেশে এ পর্যন্ত খননকৃত মোট অনুসন্ধান কূপের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বর্তমান সরকারের আমলে হয়েছে। ভোলার ইলিশায় নতুন আবিষ্কৃত ২৯তম গ্যাসক্ষেত্রের মজুতসহ বর্তমানে গ্যাসের মজুত ২৮ দশমিক ৭৬ ট্রিলিয়িন ঘনফুট বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
ইউডি/কেএস

