জাপানে কেন ধর্ষণের সংজ্ঞা বদলে দেওয়ার আলোচনা চলছে?

জাপানে কেন ধর্ষণের সংজ্ঞা বদলে দেওয়ার আলোচনা চলছে?

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ০৯ জুন ২০২৩ । আপডেট ১১:০০

ধর্ষণের ঘটনার কয়েকদিন পরেও, মেগুমি ওকানো বলছেন, তারা জানতেন যে ধর্ষণকারীর কোনো শাস্তি হবে না। যিনি ধর্ষিত হয়েছেন মেগুমি তাকে ‘তারা’ বলে উল্লেখ করেছেন। মেগুমি ধর্ষণকারীকে চিনতেন এবং তিনি জানতেন তাকে কোথায় পাওয়া যাবে। কিন্তু মেগুমি এও জানতেন যে এই ঘটনায় কোনো মামলা হবে না। কারণ, যা ঘটেছে জাপানি কর্তৃপক্ষ তাকে ধর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করবে না। একারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্রী ঘটনাটি পুলিশকে না জানানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমি তার বিচার চাইতে পারবো না, তাই সে মুক্ত ও সহজ জীবন যাপন করবে। এটা আমার জন্য কষ্টকর।’

তবে এতে হয়তো পরিবর্তন আসছে। জাপানি সংসদে বর্তমানে ঐতিহাসিক এক বিল নিয়ে আলোচনা চলছে যেখানে যৌন হামলার বিষয়ে বিদ্যমান আইন সংস্কারের বিষয়ে বিতর্ক হচ্ছে। এসব আইন গত এক শতাব্দীর ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। এই বিলে বেশ কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ যে পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে তা হলো- ধর্ষণের সংজ্ঞা। ধর্ষণের নতুন সংজ্ঞায় ‘জোরপূর্বক যৌন মিলন’ কথাটির জায়গায় ‘সম্মতি-বিহীন যৌন মিলন’ কথাটি বসানোর ব্যাপারে আইন-প্রণেতারা আলোচনা করছেন। এমন একটি সমাজে অনুমতির এই বিষয়টিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে যেখানে এই ধারণা খুব একটা পরিষ্কার নয়।

জাপানের বর্তমান আইনে যে যৌন মিলন ‘জোরপূর্বক’ এবং ‘আক্রমণ অথবা ভয়-ভীতি প্রদর্শন’ অথবা একজন ব্যক্তির ‘অচেতন অবস্থা অথবা প্রতিরোধের অক্ষমতার’ সুযোগ নিয়ে করা হয় তাকে ধর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যান্য অনেক দেশের আইনের সঙ্গে এখানেই জাপানি আইনের তফাৎ।

উদাহরণ হিসেবে টোকিওতে ২০১৪ সালের একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এক ব্যক্তি ১৫ বছর বয়সী একটি মেয়েকে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে তার সঙ্গে যৌন মিলন করে। এসময় মেয়েটি তাকে বাধাও দিয়েছিল। কিন্তু পরে তাকে ধর্ষণের অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আদালতের আদেশে বলা হয়েছে ওই লোকটি যা করেছে সেটা ঠেকানো ওই মেয়েটির জন্য ‘খুব বেশি কঠিন ছিল না’।

যৌন হামলার শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি গ্রুপ স্প্রিং-এর একজন মুখপাত্র ইও তাদোকোরো এ বিষয়ে বলেন, ‘একেক বিচার প্রক্রিয়া ও সিদ্ধান্ত একেক রকমের হয়ে থাকে- কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্মতি ছাড়া যৌন মিলন করার বিষয়টি প্রমাণ করা গেলেও বিবাদীকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না কারণ সেখানে আক্রমণ অথবা ভয়-ভীতি প্রদর্শনের তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরা সম্ভব হয় না।’ আর একারণেই মেগুমি বলছেন যে সহপাঠী এক ছাত্রের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েও ছাত্রীটি ঘটনাটি রিপোর্ট করতে পুলিশের কাছে যান নি।

মেগুমি বলছেন ওই দু’জন একসাথে টিভি দেখছিলেন। তখন তার একজন সহপাঠী মেগুমির সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করতে এগিয়ে আসে। মেগুমি তখন তাকে ‘না’ বলে দেন। তখন সে আক্রমণ করে। ওই দু’জন কিছুক্ষণ ‘ধ্বস্তাধস্তি’ করেন, বলেন মেগুমি। একপর্যায়ে মেগুমি নিশ্চল হয়ে যান এবং বাধা দেওয়া বন্ধ করে দেন। অধিকার-আন্দোলনকারীরা বলছেন যৌন হামলা ঠেকাতে এধরনের আচরণ কখনো কখনো বর্তমান আইনে বিবেচনা করা হয় না।

তারা এও শুনেছেন যে যারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে ধর্ষণের জন্য বরঞ্চ তাদেরকেই দোষারোপ করা হয়েছে। এছাড়াও পরে তদন্তের সময় পুলিশ ও হাসপাতালের স্টাফদের দিক থেকে তারা এমন অসংবেদনশীল আচরণের শিকার হন যে তারা ‘দ্বিতীয়বার ধর্ষণের’ শিকার হন।

পরিবর্তনের দাবি

মেগুমি একা নন। জাপানে এসংক্রান্ত যতো মামলা হয় তার মাত্র এক শতাংশ আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই হার সাধারণ অপরাধের বিচারের হারের তুলনায় সামান্য কম। তবে এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য সাধারণ লোকজনের দাবি ক্রমশই বাড়ছে। জাপানে ২০১৯ সালে মাত্র এক মাসের মধ্যে একের পর এক চারটি যৌন হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত ধর্ষণকারীরা খালাস পেয়ে গেলে জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের তৈরি হয়। একটি ঘটনা ছিল ফুকোকা শহরে। এক ব্যক্তি মাতাল এক নারীর সঙ্গে যৌন মিলন করে। এই ঘটনা অন্যান্য কিছু দেশে যৌন হামলা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আদালতে বলা হয় যে ওই নারী একটি রেস্তোরাঁতে গিয়ে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয় এমন এক মদপানের আসরে এই প্রথমবারের মতো যোগ দিয়েছিলেন।

রিপোর্টে বলা হয়, পুরুষটি বলেছেন তিনি ভেবেছিলেন এধরনের আসরে ‘পুরুষরা সহজেই যৌনকাজে লিপ্ত হতে পারে’, কারণ এধরনের আসর যৌন স্বাধীনতার ব্যাপারে সুপরিচিত, এবং যারা এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে তারাও তাকে বাধা দেননি। তিনি আরো ধরে নিয়েছিলেন যে ওই নারী তাকে সম্মতি দিয়েছেন কারণ যৌন মিলনের এক পর্যায়ে ওই নারী তার চোখ খুলেছেন এবং তিনি ‘কিছু আওয়াজ’ করেছেন।ধর্ষণের নতুন সংজ্ঞার অংশ হিসেবে নতুন আইনটিতে আটটি পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছে যেখানে ভিকটিমের পক্ষে ‘তার অসম্মতির কথা প্রকাশ করা’ কঠিন।

যৌন সম্পর্কের ধারণা

তবে এই সংস্কার পরিকল্পনায় সমস্যার একটি মাত্র দিক তুলে ধরা হয়েছে, বলছেন অধিকার-আন্দোলনকারীরা। তারা এই বিষয়টিকে আদালতের বাইরে থেকেও দেখার দাবি জানিয়েছেন। বলেছেন সেখানে কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজন। জাপানে যৌন হামলার বিষয়ে কথা বলা এখনও সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ বিষয়। বহুল আলোচিত কিছু মামলার কারণে সম্প্রতি এবিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে।

কাজুকো ইতো বলছেন, এবং সমস্যার একটি অংশ হচ্ছে জাপানে কয়েক প্রজন্ম যারা ‘সেক্স ও যৌন সম্মতির ব্যাপারে বিকৃত ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠেছে।’ একদিকে সীমিত কিছু পরিসরে যৌন শিক্ষা দেওয়া হয় কিন্তু তাতে সম্মতির ব্যাপারে কিছুই বলা হয় না। মিস ইতো বলছেন, জাপানি শিশুরা খুব সহজেই পর্নোগ্রাফি দেখতে পারে। এসব পর্নোগ্রাফিতে সাধারণত দেখানো হয় যে একজন নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্ক করার পরেও তিনি তা উপভোগ করছেন।

ইউডি/এ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading