বিদায় ইউরোপ, কেমন হবে মেসির আমেরিকা অভিযান?
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ০৯ জুন ২০২৩ । আপডেট ১৫:১০
স্পেন থেকে ফ্রান্স হয়ে এবার প্রতিবেশি মহাদেশে পা রাখছেন ল্যাটিন আমেরিকার ফটবল জাদুকর লিওনেল মেসি। তার জাদুতে আমেরিকার মেজর লিগ সকার (এমএলএস) কি উজ্জ্বল হবে ? এ নিয়ে আসাদ এফ রহমান’র প্রতিবেদন
মেজর লিগ সকার ও মেসি’র ইন্টার মায়ামি
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসিকে নিয়ে শেষ হলো তিন ক্লাবের লড়াই। কয়েক মাস ধরে চলা সেই ম্যারাথনে শেষ পর্যন্ত জিতে নিয়েছে ডেভিড বেকহামের মালিকানার আমেরিকান মেজর লিগ সকার (এমএলএস) ক্লাব ইন্টার মায়ামি। প্যারিসে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম স্পোর্তো ও মুন্দো দেপোর্তিবোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইন্টার মায়ামিতে নাম লেখানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন মেসি। বলেন, আমি বার্সেলোনায় ফিরে যাচ্ছি না, আমি ইন্টার মায়ামিতে যাচ্ছি।একটা সময় ছিলো যখন আমেরিকায় ফুটবল খেলা পছন্দ করতো না। কিন্তু এর রূপ পাল্টে যায় কিংবদন্তি পেলে যখন কসমসের হয়ে খেলতে যায়।
মার্কিনীরা ফুটবল খেলার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। যদিও দেশটি ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে খেলেছিল। ১৯৫০ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের মতো দলকে হারিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল গোটা দুনিয়াকে। তবে পেলের কসমসে আগমনকে মার্কিন ফুটবলের পুনরুজ্জীবন বলা হয়ে থাকে। এরপর অনেক বড় বড় তারকা সেখানে খেলতে গেলেও তারা বিশ্বজুড়ে মেজর লিগ সকারের জনপ্রিয়তাকে তুঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন নি। আমেরিকা ও অর্থের হাতছানি এবং বয়স বিবেচনায় অনেক বড় বড় তারকা তাদের ক্যারিয়ারের শেষ দিকে এই লিগে খেলেছেন। তবে, এবার মেসি বলে কথা, তার তো বয়স কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি কখনো। তার জনপ্রিয়তা বিশ্বের প্রতিটি কোণায় কোণায়। তবে কি এবার মেজর লিগ সকার নিজেদেরকে বিশ্বজুড়ে বিস্তৃতি ঘটাতে পারবে? আমেরিকার এই লিগের ফরম্যাট অন্য সব দেশের থেকে আলাদা। শুধু লিগ নয়, তার পাশাপাশি আরও দু’টি প্রতিযোগিতা হয় মেজর লিগ সকারে। এখানে সাধারণত প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে বা মার্চ মাসের শুরুর দিকে শুরু হয়।

ডেভিড বেকহাম
প্রতিযোগিতা চলে অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত। অর্থাৎ, এই মরসুমের প্রতিযোগিতা মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। এই লিগে এই মৌসুমে মোট ২৯টি দল খেলছে। তার মধ্যে ২৬টি দল আমেরিকার ও ৩টি দল কানাডার।২৯টি দলকে দু’টি গ্রুপে ভাগ করা হয়, যাদের বলা হয় ‘কনফারেন্স’। সেগুলি হল, ইস্টার্ন কনফারেন্স ও ওয়েস্টার্ন কনফারেন্স। এ বার ইস্টার্ন কনফারেন্সে রয়েছে ১৫টি দল। বাকি ১৪টি দল রয়েছে ওয়েস্টার্ন কনফারেন্সে। মেসির দল ইন্টার মায়ামি ইস্টার্ন কনফারেন্সের দল। প্রতিটি দল ৩৪টি করে ম্যাচ খেলে। তার মধ্যে নিজেদের কনফারেন্সে থাকা প্রতিটি দল বাকি দলগুলির সঙ্গে দু’টি (একটি হোম, একটি অ্যাওয়ে) করে ম্যাচ খেলে। বাকি ম্যাচগুলি খেলে অপর কনফারেন্সে থাকা দলের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ, ইস্টার্ন কনফারেন্সে থাকা একটি দল বাকি ১৪টি দলের বিরুদ্ধে ২৮টি ম্যাচ খেলবে। ওয়েস্টার্ন কনফারেন্সের ৬টি দলের বিরুদ্ধে একটি করে ম্যাচ খেলবে তারা। আবার ওয়েস্টার্ন কনফারেন্সের একটি দল বাকি ১৩টি দলের বিরুদ্ধে ২৬টি ম্যাচ খেলবে। বাকি ৮টি ম্যাচ ইস্টার্ন কনফারেন্সে থাকা দলের বিরুদ্ধে খেলবে তারা। লিগ শেষে শীর্ষে থাকা দলকে ‘সাপোর্টার্স শিল্ড’ পুরস্কার দেওয়া হয়। লিগের প্রথম ১৮টি দলের মধ্যে ‘মেজর লিগ সকার কাপ প্লে-অফ’ খেলা হয়। সেই প্রতিযোগিতা যে দল জেতে সেই দল ‘সাপোর্টার্স শিল্ড’ জেতা দলের বিরুদ্ধে ‘মেজর সকার লিগ কাপ’ খেলে। সেই ম্যাচের জয়ী দলকে লিগের চ্যাম্পিয়ন ধরা হয়।
মায়ামিতে ফলোয়ারের স্রোত, মার্কিন ফুটবলের প্রতি বাড়বে আগ্রহ
আর্জেন্টাইন বিশ্বজয়ী অধিনায়ক লিওনেল মেসির নামটাই যে পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। সেই সৌভাগ্যের প্রতীক পেয়ে রীতিমতো উড়ছে ইন্টার মিয়ামি। স্বাভাবিভাবেই মেসির আগমন যে তাদের জার্সি বিক্রি, স্পন্সর, টিভি স্বত্ব থেকে আয় থেকে শুরু করে সবকিছু বাড়িয়ে দেবে, তা আগে থেকেই অনুমেয়। এবার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টেও প্রতিদ্বন্দ্বী সব ক্লাবকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে মায়ামি। ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে তাদের ফলোয়ার বেড়েছে প্রায় তিন গুণ (৩৫ লাখ)।
মেসি মিয়ামিতে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেননি। কিন্তু তার মুখের কথাতেই হু হু করে বাড়ছে ডেভিড বেকহামের ক্লাবের অনুসারী। এর আগে পর্যন্ত এমএলএস দলগুলোর মধ্যে ইনস্টাগ্রামে লস অ্যাঞ্জেলেস গ্যালাক্সির অনুসারীসংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি প্রায় ১৪ লাখ। তাদের অনেক পেছনে পড়ে থাকা মায়ামি এক লাফে অনেক ওপরে ওঠে গেছে।

ক্রীড়া বিশ্লেষকগণ বলছেন, মেসি আমেরিকায় খেললে সারা বিশ্বের পুটবল অনুরাগীদের আগ্রহ বাড়বে মার্কিন ফুটবলের প্রতি। একই সঙ্গে নিজেদের ফুটবলকে বিশ্বে নতুন করে মেলে ধরতে পারবে দেশটির ফুটবল সংস্থা।
খেলাধুলাভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমে বিনিয়োগকারী গ্রুপ পম্প ইনভেস্টমেন্টসের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন জো পম্পলিয়ানো। তিনি নিজের টুইটের সময় থেকে আগের ৮ ঘণ্টার হিসাব কষেছেন। এই ৮ ঘণ্টায় মায়ামির ইনস্টগ্রামে নতুন অনুসারীসংখ্যা বেড়েছে ২১ লাখ। সংখ্যাটাকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন পম্পলিয়ানোÍএ সময়ের মধ্যে প্রতি ঘণ্টায় মায়ামিতে নতুন অনুসারীসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ জন করে। প্রতি মিনিটে তা ৪৩৭৫ জন এবং সেকেন্ডে ৭৩ জন করে নতুন অনুসারী পেয়েছে মায়ামির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট।
কত টাকা দিতে চেয়েছিলো আল হিলাল, মায়ামি দিলো কত?
বার্সেলোনায় ফেরার গুঞ্জন বাদ দিলেও অন্যদিকে ‘টাকার বস্তা’ নিয়ে মেসির অপেক্ষায় ছিল সৌদি প্রো লিগের ক্লাব আল হিলাল। দুই মৌসুমে তাকে ১ বিলিয়ন ইউরো দিতে চেয়েছিল ক্লাবটি। পরে সেটি বাড়িয়ে নাকি ১.৬ বিলিয়ন করেছিল। তাও সেখানে যাননি মেসি। এ প্রসঙ্গে আর্জেন্টাইন তারকা বলেন, টাকা আমার জন্য কখনোই সমস্যা (বাধা) ছিল না। তেমন হলে আমি সৌদিতে যোগ দিতাম। এদিকে, নতুন ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি ও বেতন নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানা না গেলেও আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ‘টিওয়াইসি স্পোর্টস’ বলছে, মেসির সঙ্গে ইন্টার মায়ামির চুক্তি হবে তিন মৌসুমের। আমেরিকান ক্লাবটি মেসিকে মৌসুমে ১০০ মিলিয়ন ইউরো বেতন দেবে বলেই গুঞ্জন। কোন কোন সংবাদমাধ্যম দুই মৌসুমের চুক্তির কথা বলেছে এবং মৌসুমে ৫০ মিলিয়ন ইউরো বেতন উল্লেখ করেছে। সদ্য সাবেক ক্লাব পিএসজি থেকেই ১০০ মিলিয়নের কাছাকাছি বেতন পেতেন মেসি।
চুক্তি ছাড়াও অ্যাপল ও অ্যাডিডাস থেকেও আয় করবেন মেসি
তবে বেতন ছাড়াও ইন্টার মায়ামিতে উপার্জনের আরও কিছু সুযোগ থাকছে মেসির। আমেরিকার সংবাদমাধ্যম ‘দ্য অ্যাথলেটিক’ জানিয়েছে, অ্যাপল ও অ্যাডিডাস থেকেও আয় করবেন মেসি। দুটি প্রতিষ্ঠান মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। এমএলএসের ম্যাচগুলো দেখায় অ্যাপল টিভি প্লাস। নতুন সাবস্ক্রাইবারদের ম্যাচ দেখিয়ে যে আয় হবে, সেখান থেকে একটি অংশ মেসিকে দেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করেছে অ্যাপল ও এমএলএস। প্রায় ১০ বছরের জন্য আড়াই বিলিয়ন ডলারের চুক্তি রয়েছে অ্যাপল ও এমএলএসের। তারা আরও জানিয়েছে, খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ার শেষে মেসি যেন এমএলএসে কোনো দলের মালিকানার অংশীদার হতে পারেন, ইন্টার মায়ামির সঙ্গে চুক্তিতে সেই সুযোগও রাখা হবে।

লস অ্যাঞ্জেলস গ্যালাক্সি ডেভিড বেকহ্যামের সঙ্গে চুক্তিতে এমন সুযোগই রেখেছিল এবং পরে মিয়ামি কিনে নেন ইংল্যান্ডের সাবেক এই মিডফিল্ডার। তবে মেসির সঙ্গে মিয়ামির চুক্তি যেহেতু এখনো সম্পন্ন হয়নি, তাই যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে সাতবারের বর্ষসেরা এই ফুটবলার কোন কোন খাত থেকে কী পরিমাণ অর্থ আয় করবেন, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এদিকে, আসন্ন ২০২৪ কোপা আমেরিকার আসর বসতে যাচ্ছে আমেরিকায়। এ টুর্নামেন্টটিতে মেসির খেলা নিশ্চিত।

এছাড়া ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক হলেও বেশিরভাগ ম্যাচ আমেরিকাতেই অনুষ্ঠিত হতে পারে। এছাড়া মেসির সঙ্গে ইন্টার মায়ামিতে আর্জেন্টাইন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের সতীর্থ লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও ডি মারিয়ারা যোগ দিতে পারেন বলেও শোনা যাচ্ছে। সব কিছু মিলিয়ে আমেরিকার লিগে খেলাকে সেজন্যও হয়তোবা বেশি যৌক্তিক মনে করেছেন।
মার্কিন মুল্লুক মাতিয়েছিলেন তারাও, কিন্তু কতটা?
আমেরিকার লিগে মেসিই ফুটবলের প্রথম বড় নাম নয়। ফুটবলের অনেক রথি-মহারথীর পায়ের ছাপ পড়েছে আমেরিকার ক্লাব অঙ্গনে। তাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় নাম ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলে। কখনো ইউরোপীয়ান ক্লাবে না খেলা পেলে ব্রাজিলিয়ান ক্লাব স্যান্তোস ছেড়ে পাড়ি জমান আমেরিকান মুল্লুকে। খেলেছেন নিউইয়র্কের ক্লাব কসমসের হয়ে।
শুধু পেলেই নয়, আমেরিকার লিগে খেলেছেন ডাচ কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ, জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, জার্ড মুলার, ব্রিটিশ তারকা ববি মুর ও জর্জ বেস্টও। সা¤প্রতিক অতীতে ডেভিড বেকহাম, থিয়েরি অঁরি, গ্যারেথ বেল, ডেভিড ভিয়া, দিদিয়ের দ্রগবা, ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড, বাস্তিয়ান শোয়েনস্টাইগার, জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, ওয়েইন রুনি, কাকারা খেলেছেন।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৯ জুন ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা
মেজর লিগ সকারকে বার্সার ‘খোঁচা’
পিএসজি থেকে ইন্টার মিয়ামিতে যোগদানকালে মেজর লিগ সকারকে ‘খোঁচা’ দিয়ে মেসিকে শুভ কামনা জানিয়েছে বার্সেলোনা। এক বিবৃতিতে বার্সেলোনা জানায়, সোমবারই মেসি তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছিলেন মেসির নতুন ঠিকানার কথা। বার্সেলোনার তাদের সেই বিবৃতিতে মেজর লিগ সকারকে কম চাহিদা এবং কম চাপের লিগ বলেও উল্লেখ করে।
বার্সেলোনা লিখে, কম চাহিদার লিগে, পাদপ্রদীপের আলো থেকে আরও দূরে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যতটা চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে, এর চেয়ে কম চাপের লিগে মেসির খেলতে চাওয়ার সিদ্ধান্ত বার্সেলোনা সভাপতি উপলব্ধি করতে পারছেন এবং সম্মানও করেন।
এদিকে, বিশ্বকাপজয়ী মেসি বার্সেলোনায় না ফেরার কারণও জানিয়েছেন। পুনরায় বার্সেলোনাতে যোগ দেয়ার সুযোগ থাকলেও সেখানে গিয়ে স্প্যানিশ ক্লাবটির বিপদ বাড়াতে চাননি মেসি। কারণ, মেসিকে নিতে হলে বার্সেলোনাকে একাধিক ফুটবলার ছাড়তে হতো, একই সঙ্গে বেতনও কমাতে হতো বাকি ফুটবলারদের।
ইউডি/এজেএস

