চলে গেলেন রাজনীতির ‘রহস্য পুরষ’
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১০ জুন ২০২৩ । আপডেট ১৩:৫৫
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সিরাজুল আলম খান আর নেই। শুক্রবার (০৯ জুন) ৮২ বছর বয়সে রাজধানীর একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সিরাজুল আলম খানের পরিচিতি ‘তাত্ত্বিক নেতা’ আর ‘রহস্য পুরুষ’ হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান ও রাজনীতির মাঠে লড়াই নিয়ে সাদিত কবির’র প্রতিবেদন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন ‘দাদা ভাই’
রাজনীতির অঙ্গনে পরিচিত ছিলেন ‘দাদা ভাই’ নামে। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার ভ‚মিকা অনস্বীকার্য। এমনই এক ‘রহস্যপুরুষ’ সিরাজুল আলম খানের বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান হলো শুক্রবার। সিরাজুল আলম খান কখনও জনসম্মুখে আসতেন না এবং বক্তৃতা-বিবৃতি দিতেন না; আড়ালে থেকে তৎপরতা চালাতেন বলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘রহস্য পুরুষ’ হিসেবে পরিচিতি পান। তবে রাজনীতিতে না এলেও স্বাধীনতার পরপরই জাসদ নেতাদের পরামর্শক হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন।
রাজনীতির এই রহস্য পুরুষ সিরাজুল আলম খান নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার আলীপুর গ্রামে ১৯৪১ সালের ৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা খোরশেদ আলম খান ছিলেন স্কুল পরিদর্শক আর মা সৈয়দা জাকিয়া খাতুন ছিলেন গৃহিণী। ছয় ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বাবার কর্মস্থল সূত্রে কিশোরকাল কাটে খুলনায়, ১৯৫৬ সালে খুলনা জিলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। তারপর ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে ভর্তি হন। সিরাজুল আলম খান ১৯৬৫ সাল থেকে জনসমক্ষে আসতেন না এবং বক্তৃতা-বিবৃতি দিতেন না। আড়ালে থেকে তৎপরতা চালাতেন বলে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘রহস্য পুরুষ’ হিসেবে পরিচিত।

ছবিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে (বাঁ থেকে) আব্দুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমেদ ও শেখ ফজলুল হক মনি। ছবি: সংগৃহীত
রাজনীতিতে যাত্রা, আন্দোলন-সংগ্রাম ও ‘নিউক্লিয়াস’
স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক প্রস্তুতিপর্ব থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের পরেও সিরাজুল আলম খান ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ। আবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম বিরোধী দল হিসেবে জাসদ গড়ে তোলা এবং সর্বশেষ সেনাবাহিনীতে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গঠনের মতো ইতিহাসের নানা টালমাটাল ঘটনাপ্রবাহের সাথেও উঠে আসে সিরাজুল আলম খানের নাম। রাজনৈতিক দলের সাথে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক না রেখেও কিভাবে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন রাজনীতির একজন নেপথ্য নিয়ন্ত্রকে। রাজনীতিতে সিরাজুল আলম খানের যাত্রা শুরু হয়েছিলো
১৯৫৯ সালে স্বৈরাচার আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে। সেই বছর হন ছাত্রলীগের সদস্য। এরপর ১৯৬১ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৩ সালে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। জাতীয়তাবাদী চেতনাকে বিকশিত করে বাংলাদেশীদের স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ’৬২ সালে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে যে নিউক্লিয়াস গড়ে উঠে তিনিই ছিলেন তার মূল উদ্যোক্তা। এই নিউক্লিয়াসের সদস্য ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদ। তারপর মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই নিউক্লিয়াসের মাধ্যমে সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। ছয় দফার সমর্থনে জনমত গঠনে ঐতিহাসিক ভ‚মিকা পালন করেন সিরাজুল আলম খান।
১৯৬২ সালে গঠিত নিউক্লিয়াস স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ নামেও পরিচিত ছিল। এটি গঠনের উদ্যোগে তার প্রধান সহকর্মী ছিলেন আবদুর রাজ্জাক এবং কাজী আরেফ আহমেদ। ১৯৬২-’৭১ পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলন, ৬-দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার আন্দোলন, ১১-দফা আন্দোলন পরিকল্পনা ও কৌশল প্রণয়ন করে এই ‘নিউক্লিয়াস’। আন্দোলনের এক পর্যায়ে গড়ে তোলা হয় ‘নিউক্লিয়াসে’র রাজনৈতিক উইং বি.এল.এফ এবং সামরিক ইউনিট ‘জয় বাংলা বাহিনী।
১৯৬৯-’৭০ সনে গণআন্দোলনের চাপে ভেঙে পড়া পাকিস্তানি শাসনের সমান্তরালে ‘নিউক্লিয়াস’র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংগঠন করা হয় ছাত্র-ব্রিগেড, যুব-ব্রিগেড, শ্রমিক-ব্রিগেড, নারী-ব্রিগেড, কৃষক-ব্রিগেড, সার্জেন্ট জহুর বাহিনী। ১৯৭০ সনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের নির্বাচিত করার দায়িত্ব পালন করে বিএলএফ। নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণআন্দোলনে গড়ে ওঠা জনমতকে সাংবিধানিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে গণরায়ে পরিণত করার এই কৌশলও নির্ধারণ করে বিএলএফ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সানন্দে এই সিদ্ধান্ত মেনে নেন। আন্দোলন, নির্বাচন, সমান্তরাল প্রশাসন এবং আসন্ন সশস্ত্র সংগ্রামকে হিসেবে নিয়ে বিভিন্ন বাহিনী গড়ে তোলার কৃতিত্ব সিরাজুল আলম খানের।
জাসদ গঠন এবং ‘অভ্যুত্থান’ এর নেপথ্য পরিকল্পনাকারী
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিল ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করতে প্রধান ভ‚মিকা পালন করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ শেষে স্বাধীন স্বদেশ ভ‚মিতে ফিরে আসলে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার বিপ্লবী জাতীয় সরকার গঠন প্রশ্নে মতভেদ দেখা দেয়। ফলে তার সিদ্ধান্ত ও তৎপরতায় গঠিত হয় নতুন রাজনৈতিক দল জাসদ। ১৯৭১ সনে স্বাধীনতার পর আন্দোলন-সংগ্রামের রূপ ও চরিত্র বদলে যায়। গড়ে ওঠে একমাত্র বিরোধী দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ।
১৯৭৫ সনের ৭ই নভেম্বরে অনুষ্ঠিত ‘অভ্যুত্থান’ বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে এক ঘটনা। জাসদ গঠন এবং ‘অভ্যুত্থান’ এর নেপথ্য পরিকল্পনাকারী ছিলেন সিরাজুল আলম খান। আর এই দুটি বৃহৎ ঘটনার নায়ক ছিলেন মেজর জলিল, আ স ম আবদুর রব এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহের। সিরাজুল আলম খান ভিন্ন ভিন্ন তিন মেয়াদে প্রায় ৭ বছর কারাভোগ করেন। কনভোকেশন মুভমেন্টের কারণে ১৯৬৩ সালের শেষদিকে গ্রেপ্তার হন। ১৯৭৬ সালে জিয়ার আমলে আবার গ্রেপ্তার এবং ১৯৭৯ সালে মুক্তি পান। ১৯৯২ সালে বিদেশ যাবার প্রাক্কালে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে ২৪শে মার্চ সিরাজুল আলম খানকে গ্রেপ্তার করা হলে ৪ মাস পর হাইকোর্টের রায়ে মুক্তি পান।
সিরাজুল আলম খান রাজনীতির অপরিহার্য অংশ, রাজনীতিবীদদের শোক
রাজনীতির রহস্য পুরুষ সিরাজুল আলম খানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতারা। শুক্রবার (০৯ জুন) গণমাধ্যমে পাঠানো পৃথক শোক-বিবৃতিতে রাজনীতিকরা বলেছেন, সিরাজুল আলম ছিলেন দেশের সব সংগ্রামের একজন অন্যতম অংশীজন। তিনি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অপরিহার্য অংশ।
গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের। তিনি বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে সিরাজুল আলম খানের অবদান অনস্বীকার্য। শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তার অবদান ছিল অসামান্য। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেছেন, সিরাজুল আলম খানের মৃত্যু মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি কালপর্বের অবসান এবং জাতির জন্য অপুরণীয় ক্ষতি।
সিরাজুল আলম খানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রব। তিনি বলেন, সিরাজুল আলম খান ছিলেন আমার রাজনৈতিক দার্শনিক শিক্ষক।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই সিরাজুল আলম খান প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (বাংলাদেশ ন্যাপ) চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া। তারা বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী সিরাজুল আলম খানের অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।বাংলাদেশের ইতিহাসে সিরাজুল আলম খানের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে উল্লেখ করে গণফোরাম সভাপতি মোস্তফা মোহসীন মন্টু ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে সিরাজুল আলম খানের মতো দেশপ্রেমিক আজীবন বিপ্লবীকে হারানো দেশ ও জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, দাদা ভাইয়ের ইন্তেকালে দেশ ও জাতি একজন অভিভাবককে হারালো।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১০ জুন ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা
আজ শোক পালন করবে জাসদ
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, প্রবীণ রাজনীতিক ও জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল আলম খানের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ (ইনু)। দলটির পক্ষ থেকে এ উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (০৯ জুন) জাসদের দফতর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন জানান, আজ ১০ জুন শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায় সিরাজুল আলম খানের মরদেহ বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ চত্বরে নিয়ে আসা হবে এবং সকাল ১০টায় সেখানেই তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তার মরদেহ নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার আলীপুর গ্রামে পৈত্রিক বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে এবং সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তার মায়ের কবরেই তাকে সমাহিত করা হবে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এক শোক বার্তায় দলের প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল আলম খানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, ৬০ দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম-স্বাধিকার সংগ্রাম, ৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান-স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মাঠে অগ্রণী ও অন্যতম প্রধান চিন্তক ও সংগঠক হিসেবে সিরাজুল আলম খানের ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তিতুল্য ভ‚মিকা ও অবদানের জন্য তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে জাতির জন্য তার এই ঐতিহাসিক ভ‚মিকা ও অবদান কখনোই ¤øান হবে না। জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল আলম খানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ আজ ১০ জুন শোক পালন করবে। শনিবার ভোর ৬টায় জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে।
ইউডি/এজেএস

