আসাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাইডেনকে কী বার্তা দিলেন যুবরাজ সালমান

আসাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাইডেনকে কী বার্তা দিলেন যুবরাজ সালমান

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৪ জুন ২০২৩ । আপডেট ১১:০০

ইউক্রেন ও সুদানে চলমান দুটি উত্তপ্ত যুদ্ধের কারণে এমন একটি ঘটনা সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে, যা অন্য সময় ঘটলে বড় বড় শিরোনামে খবর হতো এবং অনেক তর্কবিতর্ক হতো। সেই ঘটনাটি হলো, সিরিয়ায় ১২ বছরের যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে আরব লীগের দেওয়া বিরল স্বীকৃতি। এই স্বীকৃতি হিসেবে আরব লীগের নেতারা প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে আবার আরব লীগে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

আরব লীগের সিরিয়া নীতি পরিবর্তনের ধারা গত এক বছরের বেশি সময় ধরে চলছিল। তবে গত মাসে সেই পরিবর্তনের গতি জোর পেয়েছে। আরব লীগের এই নীতি পরিবর্তন আমেরিকা ও পশ্চিমা সরকারগুলোকে একধরনের বিভ্রান্তি ও সংকটে ফেলে দিয়েছে। আরব নেতারা মনে করছেন, আসাদ সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করা হলে ওই অঞ্চলে শান্তি আসবে। দ্রুত সিরিয়া পুনর্গঠন করা সম্ভব হলে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া সিরীয় নাগরিকেরা আবার তাদের নিজেদের ভিটেবাড়িতে ফিরতে পারবেন।

তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলেছেন, আমেরিকা কোনো অবস্থাতেই সিরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ‘স্বাভাবিকীকরণ’ করার বিষয়ে আগ্রহী হবে না। এ বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া আরও খারাপ। আমেরিকা সিরিয়ার ওপর ‘সিজার স্যাংশন’ নামে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, তার মেয়াদকাল ২০২৫ সালে শেষ হবে। সেই মেয়াদকাল ২০৩২ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য মার্কিন কংগ্রেসে একটি বিল আনা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় কোনো দেশ সিরিয়ার অবকাঠামো পুনর্গঠনে বিনিয়োগ করলে সে দেশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা আছে।

সিরিয়ায় থাকতে চায় আমেরিকা

বারাক ওবামার প্রশাসন আড়ালে আবডালে স্বীকার করে নিয়েছিল, ২০১৫ সালে সিরিয়ায় রাশিয়া হস্তক্ষেপের পর বাশার আল-আসাদের পতন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এরপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন প্রকাশ্যেই সে কথা স্বীকার করেছে। তা সত্ত্বেও আমেরিকা সিরিয়ায় অবরোধ চালিয়ে যাবে এবং সিরিয়ান কুর্দি বাহিনীর সঙ্গে জোট বাহিনী হিসেবে সেখানে ৯০০ মার্কিন সেনা অবস্থান করবে। উইলিয়াম রোবাক নামের একজন মার্কিন কূটনীতিকের (যিনি সিরিয়ায় মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন) মতে, এই নেতিবাচক মার্কিন নীতির এখন একটি ইউক্রেনীয় মাত্রা আছে। একটি ওয়েবিনারে তিনি বলেন, আসাদ ও পুতিনকে যেকোনো ধরনের জয়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত করতে আমেরিকা সিরিয়ায় থাকতে চায়।

যশুয়া ল্যান্ডিস নামের সিরিয়াবিশেষজ্ঞ ওই একই ওয়েবিনারে বলেছেন, আমেরিকা মূলত সিরিয়ায় অবকাঠামো পুনর্গঠনের ওপর জোর দিয়েছে। তাঁর মতে, বাশারকে দুর্বল করে রাখতেই সিরিয়ায় বিদ্যুৎ-পানি সরবরাহ, স্কুল-হাসপাতাল ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে আমেরিকা বাধা দিচ্ছে। তবে আরব লীগ এখন বাশারের পাশে দাঁড়াতে যাচ্ছে।

১০ বছর আগে সৌদি আরব বাশারবিরোধীদের অস্ত্র এবং অর্থ দিয়েছে। সেই সৌদি এখন সম্পূর্ণ উল্টো অবস্থানে এসেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মোহাম্মাদ বিন সালমান তাঁর নীতি পরিবর্তন করে তিনটি চমক দিয়েছেন। প্রথম চমক হলো, ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এবং হুতিদের সঙ্গে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয় চমক হলো, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় চালু করা এবং তৃতীয়টি হলো, সিরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় চালু করা। এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরবসহ অন্য আরব দেশগুলো প্রকারান্তরে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে এবং নিজেরাই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস দেখাচ্ছে।

সৌদি-আমেরিকা সম্পর্কের টানাপোড়েন

মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি-আরব যেহেতু আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত মিত্র, তাই দুই দেশের সম্পর্কের চড়াই-উৎরাই প্রমাণ করে মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব। ২০১৮ সালের নভেম্বরে জামাল খাশোগী হত্যার নিন্দা করে আমেরিকা। মার্কিন আইনপ্রণেতারা খাশোগী হত্যা মামলায় সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) ভূমিকার প্রমাণ করে উদ্ধৃতি দেন, যা এমবিএস-কে আমেরিকার প্রতি রাগান্বিত করে তোলে। তাছাড়া ইয়েমেনে সৌদি হামলার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে মার্কিন নাগরিকরা সৌদি আরবে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবি তোলে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২১ সালে ইয়েমেনে হামলার জন্য সৌদি আরবকে কোনো প্রকার সমর্থন দেয়া বন্ধ ঘোষণা করেন, এবং খাশোগী হত্যার সমালোচনা করেন । সম্প্রতি জো বাইডেন সৌদি সফর করে তেল উৎপাদন ২ শতাংশ বৃদ্ধির কথা বলেন, ওপেক উল্টো ২ শতাংশ কমিয়ে দেয়।

ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের অধ্যাপক নাদের হাশেমির মতে, ‘এর দ্বারা সৌদি বোঝাতে চায়- আমি কখনো তোমাকে বলি না অস্ত্রের বেচাকেনা কমাও বা বাড়াও। আমার কথায় তোমার অস্ত্রের ব্যবসা চলে না, কেন তোমার কথায় আমি তেল বিক্রি কমাবো?’

ইউয়ানে তেল বিক্রি

সবচেয়ে বড় ধাক্কা হলো সৌদি আরবের চীনা মুদ্রা ইউয়ানে তেল বিক্রিতে রাজি হওয়া। লিবিয়ার শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি যখন ডলারের বিপক্ষে আফ্রিকা জুড়ে নতুন অর্থব্যবস্থা চালু করতে উদ্যত হন, তার পতন হয়। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন ডলার দিয়ে তেল বেচাকেনা হবে না। বাশার আল আসাদ, নিকোলাস মাদুরা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন ডলার দিয়ে তেল বিক্রি, কেউ সফল হননি।

শি ও এমবিএসের ডলারের বদলে ইউয়ানে তেল কেনাবেচা সৌদি-আমেরিকার সম্পর্কের অবনতিরই বহিঃপ্রকাশ। তাছাড়া, সৌদি আরব চীন থেকে নতুন করে ৪ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের অস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে বলে নিশ্চিত করেছে চীনা নিউজ মিডিয়া সিজিটিএন। গত বছর রিয়াদ ও আবুধাবি নতুন করে আমেরিকার হুথি গোষ্ঠীকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী দল অ্যাখ্যা দেয়াকে পুনর্বিবেচনা করতে আহ্বান জানায়।

বর্তমান বিশ্বে চীন অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি। চীন শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো পৃথিবীর সবগুলো রাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক দিক থেকে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চাচ্ছে। চীন-সৌদি আরব সম্পর্কের পেছনে উভয়ের স্বার্থই জড়িত। এমবিএস চাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যকে আগামীর ইউরোপ বানিয়ে তুলতে, নিয়েছেন ভিশন ২০৩০। তিনি চাচ্ছেন শুধু তেলের উপর নির্ভর না করে অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য নিয়ে আসতে, যাতে চীনের সহযোগিতা প্রয়োজন। অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার পাশাপাশি চীনের সাথে সম্পর্ক তৈরি করলে অর্থনীতিতে অনেক এগিয়ে যেতে পারবে সৌদি আরব।

ইউডি/এ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading