দ্বি-রাষ্ট্র নয়, অভ্যূত্থানের পক্ষে ফিলিস্তিনের তরুণরা

দ্বি-রাষ্ট্র নয়, অভ্যূত্থানের পক্ষে ফিলিস্তিনের তরুণরা

উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ১৫ জুন ২০২৩ । আপডেট ১১:৩০

ফিলিস্তিনে যাদের বয়স ৩০ এর কম, তারা কখনই সেখানে কোনো নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি এবং অনেকেই বলেন ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের প্রতি তাদের আস্থা কম। এই তরুণ সম্প্রদায় ইসরোয়েল ফিলিস্তিনি সঙ্কট সমাধানে যে দ্বি-রাষ্ট্র তত্ত্বের কথা বলা হয় ক্রমশই তা প্রত্যাখ্যান করছে। অনসন্ধানী এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে বিবিসি।

দেশটির ১৭-বছর বয়সী জান্না তামিমি বেশ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেন, “খুবই গতানুগতিক এই ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ – পশ্চিমের তৈরি। এখানে বাস্তব পরিস্থিতির দিকে নজরই দেয়া হয়নি,” তার প্রশ্ন: ‘সেটাই যদি হবে, তাহলে সীমান্ত কোথায়?’ জান্না জানালেন, তিনি বিশ্বে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত সবচেয়ে কম বয়সী সাংবাদিকদের একজন। মাত্র সাত বছর বয়সে মায়ের টেলিফোন ধার করে অধিকৃত পশ্চিম তীরে তার নিজের শহর নাবি সালাহ থেকে প্রতিবাদের খবর রিপোর্ট করতে শুরু করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমি ইসরায়েলি বাহিনীর রাতের বেলা এবং দিনের বেলাতেও হানা দেবার খবর দিই, এসব অভিযান চালানো হয় প্রায়শই। আমি সবগুলোর ভিডিও তুলতে পারি না, তবে আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করি। আসলে স্কুল আর অন্য সবদিক সামলে কাজটা একটু কঠিন হয়ে পড়ে। তার পরও সবসময়ই দেওয়ার মতো খবর থাকে।’

ইন্তিফাদার প্রতি সমর্থন ঊর্ধ্বমুখী

জান্নার জন্মের পর থেকে ফিলিস্তিনি এলাকায় একটাও সাধারণ নির্বাচন বা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়নি। শেষবার নির্বাচন হয়েছিল ২০০৬ সালে। যার অর্থ হল ৩৪ বছরের কম বয়সী কেউই জীবনে কখনও ভোট দেবার সুযোগ পাননি। শেষবার ভোটের পর থেকে যেটা হয়েছে সেটা হল ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে পড়েছে। একই সঙ্গে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান তত্ত্বের প্রতি সমর্থনের পাল্লাও ক্রমশ নিম্নমুখী হয়েছে, যে তত্ত্বের মূল ফর্মূলা হলো ইসরায়েলের পাশাপাশি একটা স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের মধ্যে দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা। পশ্চিম তীরে প্যালেস্টাইন সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিসার্চ নামের একটি সংস্থা গত দুই দশকে জনসাধারণের মধ্যে মনোভাবের পরিবর্তন কীভাবে ঘটেছে সে বিষয়ে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করেছে এবং ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ওপর চালানো তাদের গবেষণার তথ্য তারা বিবিসির সাথে শেয়ার করেছে।

ওই সেন্টারের গবেষণার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন ফিলিস্তিনি অথরিটির (পিএ) প্রতি এই প্রজন্মের সমর্থন স্পষ্টভাবে কমছে এবং গত দশকে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান তত্ত্বের প্রতি সমর্থনও নিরবচ্ছিন্নভাবে নিম্নমুখী হয়েছে। সেন্টারটির পরিচালক ড. খালিল শিকাকি বলেন, বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অসন্তোষের মূল কারণ হলো প্রধানত রাজনৈতিক পদ্ধতির মধ্যে তাদের দৃষ্টিতে বৈধতার অভাব। দেখুন, আমাদের একজন প্রেসিডেন্ট আছেন, যিনি গত ১৪ বছর ধরে নির্বাচনী বৈধতা ছাড়াই শাসন চালিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের রাজনৈতিক কাঠামো মূলত কর্তৃত্বপরায়ণ। এই ব্যবস্থা প্রধানত এক-ব্যক্তি কেন্দ্রিক। কাগজে কলমে আমাদের একটা সংবিধান আছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা সংবিধানের তোয়াক্কা করি না।

একই সঙ্গে, ৩০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাতের প্রতি সমর্থন খুবই বেশি। তাদের ৫৬ শতাংশই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইন্তিফাদা বা অভ্যূত্থানের পক্ষে- এই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে মার্চ মাসে চালানো সবশেষ জরিপ থেকে। গত এক বছরে পশ্চিম তীরে উত্তরাঞ্চলীয় দুই শহর নাবলুস আর জেনিনে অসংখ্য নতুন বিদ্রোহী গোষ্ঠি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, যারা ক্ষমতাসীন পিএ এর নিরাপত্তা বাহিনীর বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো লায়ন্স ডেন এবং জেনিন ব্রিগেডস্, যারা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের ওপর হামলাও চালিয়েছে।

বলপ্রয়োগের ভাষা

বিবিসির সাংবাদিক জানান, জেনিন বিগ্রেডের সদস্যদের সঙ্গে এক রাতে ২টার সময় আমরা যোগ দিয়েছিলাম। তখন তারা জেনিন শরণার্থী শিবিরের গোলকধাঁধাঁর মতো অলিগলিতে প্রশিক্ষণ মহড়া চালাচ্ছিল। দলের প্রত্যেক সদস্যের হাতে ছিল এমসিক্সটিন অ্যাসল্ট রাইফেল। আপাদমস্তক ঢাকা ছিল কালো পোশাকে। নিঃশব্দে তারা এসে দাঁড়ালো একটা লাইনে। বন্দুকগুলো সামনে ধরে অলিগলি আর ছাদের মাথা নিশানা করে তারা এগোতে লাগল। তাদের বেশিরভাগই পুরুষ যাদের বয়স বিশের কোঠায়। তাদের দাবি তারা কোন বড় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত নয় বা তাদের অংশও নয়- তারা স্বাধীন গোষ্ঠি এবং ফিলিস্তিনি অঞ্চলের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনরকম সংশ্রব তারা প্রকাশ্যেই প্রত্যাখ্যান করে থাকে।

একজন যোদ্ধা, ২৮-বছর বয়সী মুজাহিদ বললেন, বর্তমান নেতৃত্ব তাদের প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে না। তিনি বলেন, গত ৩০ বছরের রাজনৈতিক পদ্ধতির ওপর ফিলিস্তিনের তরুণরা আর আশা রাখতে পারছেন না, তাদের আশা ভঙ্গ হয়েছে। তাহলে কি তিনি সহিংস পথে সমাধানে বিশ্বাসী? এ প্রশ্নে তার জবাব, দখলদাররা প্রতিদিন এখানে ঢোকে, প্রকাশ্য দিবালোকে ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ খুন করে। এই দখলদাররা শুধু বলপ্রয়োগের ভাষাই বোঝে।

রাজনৈতিক তাপমাত্রা

ফিলিস্তিনে দীর্ঘদিন সাধারণ বা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন না হওয়ায় রাজনৈতিক তাপমাত্রা বোঝার একমাত্র ব্যারোমিটার হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নির্বাচনগুলো। পশ্চিম তীরে বিরজেইৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশে এবং সেখানকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে নির্বাচনগুলোতে ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক মনোভাব প্রতিফলিত হয়। সেখানেও মনোভাবের স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ফাতাহ ছাত্র সংগঠন, যা শাসক গোষ্ঠি ফিলিস্তিনি অথরিটিতে প্রভাবশালী ফাতাহ পার্টির ছাত্র শাখা, তারা সবসময়ই বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে বিরোধী ইসলামপন্থী দলের চেয়ে এগিয়ে ছিল, এমনকি ফাতাহর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হামাসের ছাত্র শাখাও ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে তেমন সুবিধা করতে পারেনি। কিন্তু গত বছর পরিস্থিতি বদলেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২২ এর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ প্যালেস্টাইনের ছাত্র প্রতিনিধি মুস্তাফা বলেন, ‘সেটা ছিল একটা বড় বিস্ময়’। তার কথায়, ‘সাধারণত ফাতাহ আর হামাসের ছাত্র শাখার মধ্যে হারজিত হয় এক থেকে দুই আসনের ব্যবধানে। এবারে হামাস জিতেছে ১০টি আসনের ব্যবধানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নির্বাচনে হামাসের এই অভূতপূর্ব এবং নিরঙ্কুশ বিজয়কে প্রধানত দেখা হচ্ছে শাসক পিএ-র বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ হিসেবে। গত মাসের নির্বাচনেও হামাস এই কৃতিত্ব ধরে রাখতে পেরেছে যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠতার হার এবারে কিছুটা কম ছিল। মুস্তাফা আরও বলেন, যদি সাধারণ নির্বাচন হতো সেখানেও বিরজেইৎ-এর মতোই ফলাফল আসত। কারণ ফিলিস্তিনি অথরিটি (পিএ) যেভাবে সব কিছুর মোকাবেলা করছে তাতে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে, সেটা রাজনৈতিক কারণে আটক, কর, হত্যা, বা বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার মতো যেকোন ইস্যুতে।

ধামাচাপার হাতিয়ার

ফিলিস্তিনি এলাকার ভবিষ্যত নিয়ে মতপ্রকাশের সুযোগ না পেয়ে বেড়ে উঠেছে যে প্রজন্ম, তাদের কাছে এটা আত্মপরিচয় নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংস্কৃতি ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করে নিরপেক্ষ একটি সংস্থা কাত্তান ফাউন্ডেশানের কিউরেটর হিসাবে কাজ করেন মজিদ নাসরাল্লাহ। তার কর্মস্থল পশ্চিম তীরের রামাল্লা শহরে, কিন্তু তার জন্ম উত্তর ইসরায়েলের একটি শহরে। ইসরায়েলি জনসংখ্যার ২০ শতাংশ হলেন ইসরায়েলের আরব নাগরিকরা। তার প্রজন্মের অনেকের মত তিনিও নিজেকে ‘ফ্রম ৪৮’ হিসাবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। ‘ফ্রম ৪৮’ বলতে তাদের বোঝায় যারা ১৯৪৮ সালে যে ভূখণ্ড ইসরায়েল রাষ্ট্র হয়ে যায়, সেখানেই থেকে গেছেন। ফলে মজিদকে ফিলিস্তিনি সমাজের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

মজিদ নাসরাল্লাহ বলেন, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি শাসন ব্যবস্থায় আমার কোনো স্বীকৃত স্থান নেই। ফিলিস্তিনের নির্বাচনে আমার ভোট দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। আসলে, ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী আমার এখানে (রামাল্লায়) থাকারই কথা নয়। ইসরায়েলি আইনে ইসরায়েলের কোন নাগরিকের নিরাপত্তার কারণে পশ্চিম তীরের কোন ফিলিস্তিনি এলাকায় যাওয়া নিষেধ। ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তার কোন কণ্ঠ না থাকায় মজিদও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান তত্ত্বে বিশ্বাস করেন না।

তিনি বলেন, ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের বিষয়টি আসলে একটি রাজনৈতিক প্রকল্পের লাশমাত্র। ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন নির্যাতন চালিয়ে যাবার জন্য এটা ধামাচাপা দেবার একটা হাতিয়ার। আমাকে যদি জিজ্ঞস করেন, আমি বলব এখানে রাষ্ট্র গঠনের কোন ব্যাপারই নেই। মানচিত্রের দিকে তাকালে একটা পাঁচ বছরের শিশুও বলে দিতে পারবে এটা অবাস্তব এবং অকার্যকর।

ইউডি/এ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading