সর্বস্ব বাজি রেখে সাগর পথে ইউরোপ যায় কিশোর-তরুণরা

সর্বস্ব বাজি রেখে সাগর পথে ইউরোপ যায় কিশোর-তরুণরা

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১৫ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১০:৩০

লাল-সাদা রঙের উদ্ধার জাহাজটি নিয়মিত ভূমধ্যসাগরে বিশাল এলাকা চষে বেড়ায়। জাহাজটি থেকে সেদিন হঠাৎ দূরে চোখে পড়লো বাতাসে ফোলানো নীল রংয়ের একটি রাবারের নৌকা। ভেতরে গাদাগাদি করে মানুষ, তাদের মাথাগুলো ঢেউয়ে ওঠানামা করছে। জাহাজে উপস্থিত ত্রাণ সংস্থা এসওএস মেডিটেরানির কর্মীরা দ্রুত মাথায় হেলমেট এবং লাইফ জ্যাকেট পরে ফেললো। কয়েকটি স্পিড বোটে উঠে তারা ওই রাবারের নৌকাটির দিকে ছুটে গেল। তারপর এক এক করে নৌকার অভিবাসীদের স্পিডবোটে তুলে জাহাজে ওঠালো। তাদের অধিকাংশই কিশোর-তরুণ। সিংহভাগই গাম্বিয়া থেকে আসা। ত্রিপলির কাছে লিবিয়ার উপকূলীয় শহর কাসটেলভার্দে শহর থেকে ১৫ ঘণ্টা আগে নৌকায় রওয়ানা দিয়ে ৫৪ নটিক্যাল মাইল এগিয়েছে। সবাই ক্লান্ত, অবসন্ন।

বিবিসির প্রতিবেদক অ্যালিস ক্যাডি বলছেন, তাদের কজন আমাকে জানায় উদ্ধারের কিছুক্ষণ আগে নৌকার ভেতর বড় ধরনের মারামারি লেগে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কেউ কেউ চাইছিল কপালে যাই ঘটে এগিয়ে যেতে হবে, বাকিরা চাইছিল এ-দফায় ফিরে গিয়ে আবার চেষ্টা করতে। ধস্তাধস্তির মধ্যে একজনের মোবাইল ফোন সাগরে পড়ে যায়। তাদের একজনের গায়ে ছিল ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাবের হালকা নীল টি-শার্ট। অনেকের হাতে আইফোন। কারো কারো হাতে পানির বোতল, প্যাকেট খাবার। নৌকার যাত্রীদের অনেকেই সাঁতার জানে না। তাদের সঙ্গে রয়েছে গাড়ির টায়ারের ভেতরের ফোলানো অংশ, যাতে নৌকা যদি ডোবে, সেগুলো ধরে যেন ভেসে থাকা যায়।

উদ্ধারকাজ চলার সময় তাদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে কারণ দূরে হঠাৎ চোখে পড়ে লিবিয়ার উপকূল-রক্ষী বাহিনীর একটি জাহাজ। তাদের অনেককেই এর আগে লিবিয়ার কোস্ট গার্ডের হাতে ধরা পড়ে ফিরে যেতে হয়েছে। আফ্রিকা থেকে সাগর-পথে অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন লিবিয়ার কোস্ট গার্ডকে জাহাজ, টাকা-পয়সা এবং প্রশিক্ষণ দিয়েছে। উদ্ধারের জন্য যাওয়া স্পিড বোটে উঠে বেশ ক’জন তরুণের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। একজন সেলফি তুলে ফেললো। তাদের একজন পরে আমাকে বলেছে একজন উদ্ধারকারীর হাত ধরার পর তার মনে হয়েছিল, ‘আমি ইউরোপে ঢুকে গেছি।’

ঝুঁকি জেনেই নৌকায় ওঠা

জাহাজের ডেকে অভিবাসীদের থাকা এবং চিকিৎসার জন্য ঘরের মতো বেশ কটি অস্থায়ী কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সেগুলোতে তাদের কয়েকজনের সঙ্গে আমার কথা হয়। তাদের অনেকেই বেশ ইংরেজি বলতে পারে। তাদের যে নাম ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো ছদ্মনাম। এই অভিবাসীরা আমাদের কাছে স্বীকার করেছে যে এই যাত্রায় চরম ঝুঁকির কথা তারা জানতো। তাদের অনেকেই এর আগেও একাধিকবার ইউরোপ আসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। অনেকে মরতে মরতে বেঁচে গেছে। লিবিয়ার উপকূল বাহিনী বা জেলে নৌকা তাদেরকে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে গেছে। ১৭ বছরের এক তরুণ বললো, ‘আমি এ নিয়ে সাতবার চেষ্টা করেছি’।

আমি যাদের সঙ্গে কথা বললাম তাদের প্রত্যেকেরই পরিচিতি এবং বন্ধু-বান্ধবদের কেউ না কেউ ইউরোপে আসতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে। ক’দিন আগে গ্রিসের উপকূলের কাছে নৌকা ডুবে প্রায় ৭৫০ জনের মৃত্যুর খবরও তারা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জেনেছে। তারাও লিবিয়ার উপকূল থেকেই রওয়ানা হয়েছিল। একজন বললো ওই ঘটনায় সে তার সংকল্প থেকে সরেনি। ‘সবার মনোভাব এমন যে – হয় ইউরোপ পৌঁছুবে, না হয় সাগরে ডুবে মরবে’, ওই তরুণ বলে, ‘বিকল্প এই দুটোই’। তার দৃঢ় বিশ্বাস, গ্রিসে ডুবে যাওয়া অভিবাসীরাও এই মনোভাব নিয়েই নৌকায় উঠেছিল। এসওএস মেডিটেরানি এই রাবারের বোটটির সন্ধান পায় ‘অ্যালার্ম ফোন’ নামে একটি জরুরি হেল্প-লাইনের মাধ্যমে যারা সাগরে দুর্গত অভিবাসী নৌকার খবর দেয়। ইউরোপীয় সীমান্ত এজেন্সি ফ্রনটেক্সও খবর দিয়েছিল।

বয়স ১৮ বা তারও কম

এই অভিবাসীদের ৮০ শতাংশেরই বয়স ১৮ বছরের কম। তাদের সঙ্গে কোনো অভিভাবক নেই। তাদের অনেকেই লিবিয়া থেকে নৌকায় ওঠার কয়েক বছর আগেই পরিবার, দেশ ছেড়েছে। অনেকে বলেছে তাদের বাবা অথবা মা নেই, অথবা দু’জনের কেউই বেঁচে নেই। পরিবারের সন্তান হিসেবে প্রিয়জনদের দেখভাল করার জন্য ইউরোপে গিয়ে আয়ের তাড়না থেকে নিজের গ্রাম-শহর ছেড়ে এসেছে।

এই দলটির অধিকাংশই গাম্বিয়া থেকে আসা, যে দেশটি লিবিয়ার দুই হাজার মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে। গাম্বিয়া বিশ্বের অন্যতম একটি দরিদ্র দেশ। জাতিসংঘের হিসাবে, জনসংখ্যার অনুপাতে আফ্রিকার মধ্যে এই দেশটি থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি অভিবাসন হয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে গাম্বিয়া থেকে ৩২,০০০ মানুষ অবৈধভাবে ইউরোপে ঢুকেছে। ২০২০ থেকে ২০২২ পর্যন্তও এই প্রবণতা একই রকম ছিল। ভূমধ্যসাগরের কেন্দ্রাঞ্চল ইউরোপে অবৈধ অভিবাসনের প্রধান রুট। ফ্রনটেক্স জানিয়েছে এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে নৌকা দিয়ে ইউরোপে পাড়ি দেওয়া লোকের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫০,৩১৮। এই সংখ্যা ২০১৭ সালের পর সবচেয়ে বেশি। এসব অভিবাসীর সবাই যে আফ্রিকার নাগরিক তা নয়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া, ইরান এবং আফগানিস্তান থেকেও বহু মানুষ লিবিয়া হয়ে এই রুটে ইউরোপে আসার চেষ্টা করে। আফ্রিকা থেকে বিভিন্ন পথে এরা লিবিয়ায় পৌঁছে। মানব পাচারকারীদের পয়সা দিয়ে অনেক সময় কয়েকটি দেশ পার হতে হয় তাদের।

ইউরোপে অনিশ্চিত জীবন

জাহাজের ক্ররা এই দলটিকে কাজ চালানোর মতো খুবই সহজ কিছু ইটালিয় ভাষা শিখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। খুব উৎসাহ নিয়ে সেগুলো আত্মস্থ করার চেষ্টা দেখা যায় তাদের মধ্যে। তাদের মধ্যে কারো কারো পরিচিত বন্ধু বা স্বজন আগেই ইটালিতে পৌঁছে তাদের নতুন জীবনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছে। তবে ইউরোপ সম্পর্কে এদের অনেক ধারণাই কাল্পনিক। অনেকেই তাদের প্রিয় ফুটবল ক্লাব বা ফুটবলার দিয়ে ইউরোপকে চেনে।

কিন্তু এই কিশোর-তরুণদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। জাহাজটি যখন বারি বন্দরে নোঙর করছিল, ডেকের চিত্র যেন অনেকটাই বদলে গেল। যারা গত দুদিন গান গাইছিল, নাচছিল, তারা হঠাৎ যেন চুপ হয়ে গেলে। হাতে কম্বল আর আইডি হাতে নিয়ে নামার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের অনেকেই যেন ভয়ে কাঁপছিল। বন্দরে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন স্বাস্থ্য এবং সীমান্ত-রক্ষী বিভাগের কর্মকর্তারা। রেডক্রস এবং জাতিসংঘ কর্মীরাও ছিলেন। হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ক’জনকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো। বাকিদের অভিবাসীদের রাখার জন্য তৈরি সেন্টারে নেওয়ার জন্য বাসে তোলা হলো। সেখানে তাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে যাচাই-বাছাই করা হবে।

ইউডি/এ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading