ইউক্রেনে ‘গেম চেঞ্জার’ হবে মার্কিন দূরাপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র!
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১৫ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১২:০০
ইউক্রেনকে দূরাপাল্লার আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেমস (এটিএসিএমএস) ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দূরপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারে। রাশিয়ার দখলকৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে যখন পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে কিয়েভ তখন এই অস্ত্র সরবরাহ করতে আগ্রহী হচ্ছে ওয়াশিংটন। মার্কিন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এ খবর জানিয়েছে।
এত দিন পর্যন্ত ইউক্রেন এটিএসিএমএস চাইলেও তা সরবরাহ থেকে বিরত থেকেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন। এটির রেঞ্জ প্রায় ২০০ মাইল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রণক্ষেত্র থেকে দক্ষিণ ও পূর্বে অনেক দূরে হামলা চালাতে পারবে ইউক্রেন। এর ফলে ব্রিটেনের স্টর্ম শ্যাডো ও ফ্রান্সের স্কাল্প ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বেশি সুবিধা পাবে কিয়েভ।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক মিলি মার্চ মাসে ‘ডিফেন্স ওয়ান’ নামের একটি ওয়েবসাইটকে বলেছেন, আমেরিকার কাছে এটিএসিএমএসের সংখ্যা খুব বেশি না। আমাদের নিজেদের অস্ত্রের মজুত রক্ষা করতে হবে। জুনের শেষ দিকে পেন্টাগনের প্রেস সচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল প্যাট রাইডার মিডিয়াকে বলেছিলেন, এটিএসিএমএস ইউক্রেনে পাঠানো নিয়ে শিগগিরই কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না।
কিন্তু সম্প্রতি কয়েকটি প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ইউক্রেনকে এই ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের সম্মতি দেওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মে মাসে ব্রিটেন ইউক্রেনকে স্টর্ম শ্যাডো এবং লিথুয়ানিয়ায় ন্যাটো সম্মেলনে ফ্রান্স স্কাল্প ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে এটিসিএএমএস আলোচনায় রয়েছে।
পাঁচ মিনিটেই ১৫৫ মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা
স্টর্ম শ্যাডো ও স্কাল্প দূরপাল্লার এবং আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। অপর দিকে এটিএসিএমএস হলো ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, উড্ডয়নের সময় নিজেদের গতিপথ কিছুটা পাল্টানোর সক্ষমতা রয়েছে। হফম্যান বলছেন, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের গতি বেশি, পাঁচ মিনিটের মধ্যে প্রায় ১৫৫ মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। স্টর্ম শ্যাডো ও স্কাল্প সময় নেয় ১৫ মিনিট।
তিনি বলেন, এগুলোর ইউক্রেনের জন্য আসলেই কার্যকর হবে যদি তারা সময়-সংবেদশীল নিশানায় হামলা করতে চায়। যেমন, চলমান নিশানা। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর গতি এবং নিশানা শনাক্তের পর নিজেই প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্পের উপ-পরিচালক ইয়ান উইলিয়ামস বলেছেন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের আগে সরে যেতে সক্ষম ভ্রাম্যমাণ লক্ষ্যবস্তু এটিএসিএমএস দিয়ে ধ্বংস করা যাবে। যদিও তুলনামূলক বিচারে তিন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় কাছাকাছি মানের। এটিএসিএমএসের মতোই প্রাণঘাতী স্টর্ম শ্যাডো ও স্কাল্প। কিন্তু শেষের দুটো নিক্ষেপ করার মতো খুব কম সংখ্যক যুদ্ধবিমান রয়েছে ইউক্রেনের।
মের্টেন্স বলেছেন, এটিএসিএমএস ভূপাতিত করার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারে রাশিয়া। কারণ অনেক সময় স্টর্ম শ্যাডো ভূপাতিত করতেও হিমশিম খেয়েছে রুশ সেনাবাহিনী। উইলিয়ামসও একই কথা বলেছেন। তার মতে, প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাওয়ার আগ পর্যন্ত ইউক্রেন যেভাবে রুশ ইসকান্দার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে ব্যর্থ হচ্ছিল, ঠিক সেভাবে এটিএসিএমএস ঠেকাতে জটিলতায় পড়তে পারে রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
মের্টেন্সের মতে, মোটামুটি নিরাপদ স্থান থেকে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী এই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারবে। কিন্তু স্টর্ম শ্যাডো বা স্কাল্প ছুড়তে তাদের সুখই-২৪ বিমান উড্ডয়নের ঝুঁকি নিতে হয়। তিনি বলেন, এটিএসিএমএস প্রকৃত অর্থে পার্থক্য গড়ে দেবে। রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নিশানায় আঘাত এবং পিছু হটিয়ে দিতে ইউক্রেন এগুলোকে কাজে লাগাতে পারে।
শুধু রেঞ্জ নয়, রুশ নিশানায় আঘাতের সুযোগও বাড়বে
পেন্টাগনের এক মুখপাত্র বলেছেন, ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী কীভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করবে তা নিয়ে কোনও ধারণা তারা করতে পারছেন না। তিনি যখন এই মন্তব্য করেছিলেন তখন পর্যন্ত এগুলো পাঠানোর বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। মে মাসে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ডেভিড হাম্বলিং বলেছিলেন, ব্রিটেনের পক্ষ স্টর্ম শ্যাডো পাঠানোর সিদ্ধান্তে চিন্তার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে ইউক্রেনকে সমরাস্ত্র সরবরাহের মাত্রা উন্নীত হয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে নিযুক্ত ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রদূত ওকসানা মারকারোভা জুনের মাঝামাঝিতে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, গত কয়েক সপ্তাহে এটিএসিএমএস নিয়ে আমেরিকা সুর পরবির্তন করেছে। প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান সদস্যরা একাধিকবার বাইডেনের প্রশাসনকে আহ্বান জানিয়েছিলেন এই ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনকে সরবরাহ করার জন্য। এর মধ্যে ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণ শুরু এবং ৭ জুলাই বাইডেন প্রশাসন ক্লাস্টার বোমা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর আহ্বান জানান রিপাবলিকানরা।
লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউটের ইউরোপীয় নিরাপত্তা-বিষয়ক রিসার্চ ফেলো এড আর্নল্ড বলেছেন, স্টর্ম শ্যাডো ও স্কাল্পের চেয়ে প্রায় ৩০ মাইল বেশি রেঞ্জ রয়েছে এটিএসিএমএসের। এগুলো দিয়ে ইউক্রেনীয়রা আগের চেয়ে একটু বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারবে। অবশ্য দূরের এই লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি তাদের গোয়েন্দা নজরদারি চালানোর সক্ষমতা থাকতে হবে। তিনি বলেন, মূল সুবিধা এর রেঞ্জ নয়, সক্ষমতা।
স্টর্ম শ্যাডো ও স্কাল্পের তুলনায় এগুলো দিয়ে রুশ নিশানায় আঘাতের বেশি সুযোগ পাবে ইউক্রেন। দ্য হগ সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের কৌশলগত বিশ্লেষক ফ্রেডেরিক মের্টেন্স বলেছেন, ইউক্রেনের কাছে যত বেশি সংখ্যক এমন ক্ষেপণাস্ত্র থাকবে ততই তাদের সুবিধা বাড়বে। তাদের কাছে যদি পর্যাপ্ত সংখ্যক অস্ত্র থাকে তাহলে একাধিক লঞ্চার থেকে একই সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দ্বিধায় ফেলে দিয়ে নিজেদের হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবে।
ইউডি/এ

