ওয়াগনার গ্রুপের দায়িত্ব পাচ্ছেন পুতিনের পছন্দের আন্দ্রে ত্রশেভ?

ওয়াগনার গ্রুপের দায়িত্ব পাচ্ছেন পুতিনের পছন্দের আন্দ্রে ত্রশেভ?

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ১৭ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১৩:৩০

গত মাসে বিদ্রোহের পর এবার ‘ওয়াগনার বস’ ইয়েভজেনি প্রিগোজিনের বিকল্প খুঁজছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মার্সেনারী গ্রুপটির যোদ্ধাদের কাছে নতুন প্রধান হিসেবে অভিজ্ঞ সেনা কর্মকর্তা আন্দ্রে ত্রশেভের নাম প্রস্তাব করেছেন তিনি। পুতিনের বরাত দিয়ে রাশিয়ার কমার্স্যান্ট পত্রিকার রিপোর্টে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এতে করে বিদ্রোহ পরবর্তী সময়ে ওয়াগনার গ্রুপের সিনিয়র যোদ্ধাদের সঙ্গে প্রিগোজিনের বিভক্তি সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। কমার্স্যান্ট পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ওয়াগনার গ্রুপের বিদ্রোহের পাঁচ দিন পর একটি মিটিংয়ের আয়োজন করে পুতিন। সেখানে প্রিগোজিন ছাড়াও ওয়াগনার গ্রুপের অন্য সিনিয়র কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কমার্স্যান্ট পত্রিকার তথ্যমতে, ওই মিটিংয়ে পুতিন ওয়াগনার সদস্যদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন; তার মধ্যে বাহিনীটির প্রধান পরিবর্তনের একটি প্রস্তাব ছিল। প্রস্তাবে পুতিন প্রিগোজিনের পরিবর্তে ‘সেডয়’ বা ‘ধূসর চুল’ হিসেবে রুশ সেনাবাহিনীতে পরিচিত আন্দ্রে ত্রশেভের নাম কমান্ডার হিসেবে প্রস্তাব করেন। এ সম্পর্কে পুতিন বলেন, ‘ওয়াগনার যোদ্ধারা সকলে এক জায়গায় একত্র হতে পারেন এবং আগের মতোই রাশিয়ার জন্য নিজেদেরকে নিয়োজিত করতে পারেন। এক্ষেত্রে তাদের জন্য কিছুই পরিবর্তিত হবে না। তারা ঠিক সেই মানুষটিরই নেতৃত্বে থাকবেন যিনি এতদিন তাদের প্রকৃত কমান্ডার হিসেবে ছিলেন।’ কমার্স্যান্ট পত্রিকার রিপোর্টার পুতিনের কাছে জানতে চান, মিটিংয়ে উপস্থিত কেউ ওই প্রস্তাবে রাজি হয়েছিল কি-না। জবাবে পুতিন বলেন, ‘মিটিংয়ে উপস্থিত অনেকেই আমার এ প্রস্তাবে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়েছিলেন।’

কে এই আন্দ্রে ত্রশেভ?

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ফ্রান্সের স্যাংশন ডকুমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, আন্দ্রে ত্রশেভ রুশ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল। এছাড়াও তিনি ওয়াগনার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে বাহিনীটির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সিরিয়ার সংঘাতে বাশার আল আসাদের পক্ষ হয়ে ওয়াগনার গ্রুপ খুবই ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। আর এক্ষেত্রে দেশটিতে মার্সেনারী গ্রুপটির অপারেশনে চিফ অফ স্টাফ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ত্রশেভ। ত্রশেভের জন্ম ১৯৫৩ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের লেলিনগ্রাদে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের স্যাংশন ডকুমেন্টে বলা হয়, ‘ত্রশেভ সরাসরিভাবে সিরিয়ায় ওয়াগনার গ্রুপের মিলিটারি অপারেশনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি বাশার আল-আসাদের পক্ষে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং সিরিয়ার সরকার থেকে সমর্থন ও সুবিধা লাভ করেছেন।’

২০২২ সালের জুন মাসে প্রকাশিত ব্রিটেনের স্যাংশন ডকুমেন্টে বলা হয়, ‘ত্রশেভ ওয়াগনার গ্রুপের চিফ এক্সিকিউটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই তিনি সিরিয়ার বিদ্যমান রেজিমের সহযোগিতা করেছেন এবং দেশটির বেসামরিক নাগরিকদের নিপীড়ন করেছেন।’ রাশিয়ান অনলাইন নিউজ আউটলেট ফনটানকার তথ্যমতে, ত্রশেভের চেচনিয়া ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে অংশগ্রহণেরও অভিজ্ঞতা রয়েছে।

আফগানিস্তানের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ত্রশেভ সম্মানসূচক ‘রেড স্টার’ পদক লাভ করেছিলেন। একইভাবে চেচনিয়ায় নৈপুণ্য প্রদর্শনের জন্যও বেশ কয়েকটি পদক লাভ করেছিলেন অভিজ্ঞ এ কর্মকর্তা। ২০১৬ সালে ক্রেমলিনে আয়োজিত একটি রিসেপশন অনুষ্ঠানে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ত্রশেভের সাক্ষাতের একটি ছবি রয়েছে। সেখানে ‘গ্রে হেয়ার’ খ্যাত এই ব্যক্তিকে পুতিনের পাশে বেশ কয়েকটি মেডেল পরিহিত অবস্থান দেখা যায়।

প্রিগোজিন এখন কোথায়?

চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ত্রশেভের ওপর স্যাংশন আরোপ করে ইউক্রেন। অন্যদিকে বিদ্রোহ করা ‘ওয়াগনার বস’ প্রিগোজিনের ভাগ্যে ঠিক ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে সেটি সম্পর্কে এখনো সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। গত ৬ জুলাই বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো জানান, ‘ওয়াগনার বস’ প্রিগোজিন এখন আর বেলারুশে অবস্থান করছেন না। এমনকি তার বাহিনী বেলারুশে অবস্থান করবে কি-না তাও নিশ্চিত নয়। লুকাশেঙ্কোর এমন তথ্যের পর এখন গত মাসে বিদ্রোহের সমাপ্তি টানা চুক্তিটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গত ২৭ জুন লুকাশেঙ্কো বলেছিলেন, চুক্তি অনুযায়ী প্রিগোজিন বেলারুশে পৌঁছেছেন।

এদিকে গত ২৩ জুন নিজের ওয়াগনার সেনাদের নিয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন প্রিগোজিন। ইউক্রেন থেকে প্রায় ২৫ হাজার সেনা নিয়ে এদিন রাশিয়ায় প্রবেশ করেন তিনি। তবে খুব শিগগিরই লুকাশেঙ্কোর মধ্যস্থতায় বিদ্রোহ থামিয়ে দেন তিনি। এদিকে চলতি মাসের শুরুর দিকে প্রিগোজিনের বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে রুশ সরকার। অভিযানে সেন্ট পিটার্সবার্গের অবস্থিত বাড়িটি থেকে বেশ কিছু রহস্যময়য় জিনিস জব্দ করেছে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা। অভিযান শেষে গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রিগোজিনের আলমারি ভর্তি পরচুলা ও নকল দাড়ির খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। একইসঙ্গে ওয়াগনার বসের ব্যক্তিগত অ্যালবাম থেকে পরচুলা পরে ছদ্মবেশ ধারণ করা বেশ কয়েকটি ছবিও উদ্ধার করা হয়েছে।

ওয়াগনার গ্রপের উত্থান

ওয়াগনার গ্রুপ রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউর হাতে তৈরি। প্রিগোশিনের নিজের কোনো সামরিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও ওয়াগনারের আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা দিমিত্রি উটকিন ছিলেন জিআরইউ স্পেটসনাজের বিশেষ পরিচালক ছিলেন। ১৯৪৯ সাল কিংবা তার আগে থেকে স্পেটসনাজ ইউনিটটি সক্রিয়। এই ইউনিট শত্রুশিবিরে ঢুকে চোরাগোপ্তা হামলার জন্য সুপরিচিত। এমনকি শত্রুশিবিরে গিয়ে ছোট পারমাণবিক অস্ত্র রেখে আসার সামর্থ্যও তাদের আছে। প্রিগোশিন দুর্নীতি থেকেও মুক্ত নন। রাশিয়ার সেনাবাহিনীর সঙ্গে তিনি একটি চুক্তি করেছিলেন, তাতে বাজার থেকে অনেক বেশি মূল্যে জিনিসপত্র সরবরাহ শুরু করেছিলেন। চুক্তিটি রাশিয়াতে সেনাবহর নিয়ে প্রবেশের সপ্তাহখানেক আগে বাতিল করা হয়।

ইউডি/এ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading