আরমিয়া হ্রদ বিপর্যয়: মধ্যপ্রাচ্যের বুকে এক তপ্ত রক্তক্ষরণ

আরমিয়া হ্রদ বিপর্যয়: মধ্যপ্রাচ্যের বুকে এক তপ্ত রক্তক্ষরণ

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ১৭ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১৬:০০

ফাহিম খান: মধ্যপ্রাচ্যের শুষ্ক বায়ুর রুক্ষতার মাঝে হঠাৎ প্রাণের ঝঙ্কারের ন্যায় নিজের অস্তিত্বের জানান দেয়া লবণাক্ত হ্রদের নাম আরমিয়া। ইরানের বুকে অবস্থিত এই হ্রদকে স্থানীয়রা ‘উর্মিয়া’ নামেও ডাকেন। আজ থেকে ২০ বছর পূর্বে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জরিপ সংস্থার হিসাবানুযায়ী, এই হ্রদটি ছিল এই অঞ্চলের বৃহত্তম লবণাক্ত পানির হ্রদ। মৃত সাগরের ন্যায় অতিরিক্ত লবণাক্ত এই হ্রদে প্লবতার ফলে একজন মাঝারি ওজনের মানুষ অনায়াসে ভেসে থাকতে পারতেন। ফলে হ্রদের প্রাকৃতিক রুক্ষতার মাঝেও গড়ে উঠে ইরানের অন্যতম বৃহত্তম পর্যটন শিল্প।

দুপুরের প্রচণ্ড রোদের তেজ কমে যখন বিকেলের স্নিগ্ধতা এসে বিরাজ করতো, ঠিক তখন ফ্ল্যামিঙ্গো পাখির আনাগোনা শুরু হতো হ্রদের বুকে। এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে এবং সারাদিনের ক্লান্তি ভুলতে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ আসর জমাতো এই হ্রদের তীরে। এভাবে দিনকাল কেটে যাচ্ছিলো বেশ!

কিন্তু কে জানতো সেদিনের প্রাণবন্ত আরমিয়া একদিন পরিণত হবে শুষ্ক মরু অঞ্চলে? ২০ বছর পরের আরমিয়া যেন তার পূর্ব পরিচয়ের মেকি রুপ নিয়ে টিকে আছে মৃতপ্রায় অবস্থায়। সেখানে প্রাণের কোনো উচ্ছ্বাস নেই; নেই ফ্ল্যামিঙ্গোদের কোলাহল। যতদূর চোখ যায়, শুধু অসীম শুষ্কতা আর রুক্ষতা। যেন রূপকথার তেপান্তরের পিশাচ এসে ভর করেছে মধ্যপ্রাচ্যের এই হ্রদের বুকে।

‘আরমিয়া ঠিকই আছে। কিন্তু সেটা আগের মতো নেই। যেন অন্যগ্রহের কোনো অজানা স্থানের দৃশ্য অবলোকন করছি। আমি মাঝে মাঝে দেখি কিছু শুঁয়োপোকা দল বেঁধে হ্রদের শুকনো ডাঙায় পড়ে থাকা মৃত প্রাণীর দেহ থেকে লবণ কুঁড়িয়ে নিচ্ছে।’ এই বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন গ্যারি লুইস। জাতিসংঘের আবাসন সমন্বয়ক সংস্থার ঊর্ধ্বতন এই কর্মকতার শৈশবের অধিকাংশ সময় কেটেছিলো আরমিয়া তীরে খেলা করতে করতে।

আরমিয়া হ্রদ পরিচিতি

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানের উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত আরমিয়া হ্রদকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম হ্রদ হিসেবে গণ্য করা হতো। পুরো হ্রদটির ক্ষেত্রফল প্রায় দুই হাজার বর্গ মাইল। ২০ বছর পূর্বের হিসাবানুযায়ী, আরমিয়া হ্রদে পানি ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন ঘন মিটার। কিন্তু কিছু প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট কারণে সেই হ্রদ আজ মৃতপ্রায়।

১৯৬৭ সাল থেকে এই হ্রদটি ইরান সরকারের বিশেষ রক্ষণাবেক্ষণের আওতাধীনে আছে। যেহেতু হ্রদের পানির কোনো নির্গমনপথ নেই, তাই এর পানি প্রচণ্ড লবণাক্ত। বিখ্যাত লবণাক্ত হ্রদ মৃত সাগরের (ডেড সি) তুলনায় যা প্রায় এক-চতুর্থাংশ। শীতের শেষে এই লবণাক্ততার পরিমাণ ৮ শতাংশে নেমে আসলেও হেমন্তের শুরুতে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৬ শতাংশ পর্যন্ত। হ্রদের লবণাক্ততার উৎস হিসেবে বিভিন্ন সোডিয়াম এবং সালফার লবণের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।

লবণাক্ততার ফলে এই হ্রদের জীববৈচিত্র্য অন্যান্য হ্রদের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। লবণাক্ত পরিবেশে বেঁচে থাকার উপযোগী বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী এবং অণুজীব ব্যতীত অন্য কোনো জীবই এখানে টিকে থাকতে পারে না। শেলড্রে, ফ্ল্যামিঙ্গো এবং পেলিকানসহ বেশ কিছু প্রজাতির পাখি শীতকালে এই অঞ্চলে অতিথি পাখি হিসেবে পরিভ্রমণ করে।

হ্রদ শুকিয়ে যাওয়ার কারণ

হঠাৎ আরমিয়ার মতো বিশাল একটি জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে ইরান সরকার। দ্রুততার সাথে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হলো, এই হ্রদের শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের অভিশপ্ত খরা। ভৌগোলিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে সূর্য খাড়াভাবে তাপ দেয়ার ফলে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখানকার তাপমাত্রা অনেক বেশি। কিন্তু পরিবেশবাদীরা খরার উপর একচেটিয়া দোষারোপের বিরোধিতা করেছেন।

আরমিয়া হ্রদ থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত আরেকটি হ্রদের নাম ভ্যান হ্রদ। তুরস্ক অঞ্চলে অবস্থিত এই হ্রদের পরিবেশের সাথে আরমিয়ার অনেকটা সাদৃশ্য রয়েছে। প্রায় সমান পরিমাণ তাপমাত্রা বিরাজমান থাকলেও আরমিয়ার মতো ভ্যান হ্রদে কোনোরূপ বিপর্যয় দেখা যায়নি।

তাই আরমিয়া বিপর্যয় নিয়ে বিজ্ঞানীরা নতুনভাবে গবেষণা শুরু করেন। এই গবেষণায় বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। ধরা পড়ে যায়, মুনাফালোভী সরকারী চক্রের অব্যবস্থাপনা এবং কৃষিকাজে অবাধে আরমিয়ার পানির অপব্যবহারসহ নানা চিত্র।

গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যায়, আরমিয়ার শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে খরার ভূমিকার চেয়ে অন্যান্য কারণের ভূমিকা প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি। জাতিসংঘ পরিবেশ বিষয়ক সংস্থার হিসাবানুযায়ী, সেচ এবং ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে আরমিয়া হ্রদের প্রবাহ পরিবর্তন করা হয়েছে।

এর ফলে হ্রদের পানির পরিমাণ ৬৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। হ্রদের শুষ্কতার ফলে এই অঞ্চলে আবহাওয়ার উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে। হ্রদের পানিতে বাঁধ নির্মাণের ফলে এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

হ্রদ বিপর্যয় নিয়ে আরো বিশদভাবে জানতে হলে প্রথমেই আমাদের হ্রদের উৎস নিয়ে পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে। জারিনেহ নদীসহ প্রায় ১৩টি নদীর পানি এসে মিলিত হয়েছে আরমিয়া হ্রদের বুকে। নদীর পানি ছাড়াও বারিপাতের ফলে পতিত পানিসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উৎস থেকে পানি প্রবাহিত হয়েছে আরমিয়ার বুকে।

১৯৯৯ সালে ইরান সরকার কর্তৃক এক প্রকল্পে জারিনেহ নদী থেকে পানিপ্রবাহ পরিবর্তন করে নিকটবর্তী শহর তাব্রিজে প্রেরণ করা হয়। তাব্রিজের মতো আধুনিক শহরে পানির চাহিদা পূরণের অন্যতম উৎস হয়ে দাঁড়ানো জারিনেহ নদী আরমিয়া হ্রদে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু সেদিকে সরকার কোনো ভ্রূক্ষেপ না করে মাইন্দোয়াব, আজারশার, বোনাব, গুগানসহ বেশ কয়েকটি শহরে জারিনেহ নদীর পানি সরবরাহ করা শুরু করে শুরু করে।

ইউডি/এ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading