অটোমান সাম্রাজ্যে বংশের ধারা ধরে রাখতে উপপত্নীদের ভূমিকা
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৯ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১০:৩৫
এই নিবন্ধটি পড়ার পরে, অটোমান সাম্রাজ্যের হেরেম সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে পারে। অটোমান সাম্রাজ্যের হেরেমগুলোর একটি ক্ষেত্রে ধন্যবাদ প্রাপ্য কারণ তারা, ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী কিছু নারী চরিত্রকে সামনে আনতে পেরেছে। ইয়েল ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক অ্যালেন মিখাইল বিবিসিকে বলেছেন, অটোমান ইতিহাসের ছয়শ বছরেরও বেশি সময় ধরে, প্রায় সমস্ত সুলতানের মায়েরা আপাতদৃষ্টিতে ক্রীতদাস ছিলেন।
বিশ্বের অন্যতম বড় এই সাম্রাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার ধারা টিকিয়ে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আর এক্ষেত্রে নারীদের প্রভাব ছিল লক্ষণীয়। তুরস্কের মিডল ইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এব্রো বোয়ার তার ‘অটোমান উইমেন ইন পাবলিক স্পেস’ বইতে লিখেছেন যে এই নারীদের মধ্যে অনেকেই শুধু হেরেমের মধ্যে তাদের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেননি।
তারা শুধুমাত্র সুলতানদের যৌন দাসী এবং তাদের সন্তান জন্মদানকারী নারী হওয়ার ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। হেরেমের অনেক নারীই এই প্রচেষ্টায় সফল হয়েছেন। ‘তার ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যাদেরকে বিভিন্ন স্তরে এবং বিভিন্ন ভূমিকায় দেখা গেছে।’ অটোমান সাম্রাজ্যের অনেক যুবরাজ এবং সুলতান প্রেম করে বিয়ে করেছেন, আবার অনেক বৈবাহিক সম্পর্ক রাজনৈতিক এবং কৌশলগত কারণেও হয়েছিল। যেমন, অটোমান শাসকরাও রাজনৈতিক জোট প্রতিষ্ঠা বা শক্তিশালী করার জন্য এই অঞ্চলের অন্যান্য নেতাদের কন্যাদের বিয়ে করেছিলেন।
অধ্যাপক এব্রো বোয়ার এই তথ্যগুলো জানিয়েছেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সুলতানদের এই সাধারণ প্রবণতায় বড় ধরণের পরিবর্তন দেখা দেয়। মিখাইল বলেন, ‘সুলতানরা চাইতেন যে তাদের সন্তান, রাজকুমার এবং ভবিষ্যৎ সুলতানরা যেন তাদের স্ত্রীর চেয়ে তাদের উপপত্নীর গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করে। অন্য কথায়, তারা সন্তান ধারণের জন্য হারেম থেকে একজন নারীকে বেছে নিতেন। অধ্যাপক বোয়ার বলেন যে, স্বাধীন নারী যারা একটি নির্দিষ্ট পরিবার বা অভিজাত শ্রেণীর অন্তর্গত ছিল, তাদের এভাবে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
সুলতানরা তাদের উত্তরাধিকার ধরে রাখতে বা তাদের সন্তানের মা হিসেবে রাজনৈতিক সম্পর্কহীন নারীদের বেছে নিতে শুরু করেন। অধ্যাপক বোয়ার বলেন যে, ওই সময়ে, সুলতানের সন্তানদের একজন যদি তার স্ত্রীর গর্ভে এবং অন্যজন উপপত্নীর গর্ভে জন্ম নেয়, তবে উভয়েরই সিংহাসনে বসার সমান অধিকার ছিল। শাসকরা এসব রক্ষিতাদের বিয়ে করার চিন্তা না করেই সন্তান জন্ম দিতেন। অটোমান শাসকদের বিজয়ের ফলে অনেক নারীকে জোরপূর্বক সাম্রাজ্যের রাজধানীতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
ইয়েল ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক অ্যালেন মিখাইল বলেছেন, যদি আমরা সাম্রাজ্যের প্রাচীন সময়ের কথা বলি, তাহলে দেখা যাবে এই নারীদের মধ্যে অনেকেই দক্ষিণ এবং পূর্ব ইউরোপ থেকে এসেছিলেন, অর্থাৎ বর্তমান রোমানিয়া এবং ইউক্রেন থেকে। সেইসাথে দক্ষিণ রাশিয়া, কৃষ্ণ সাগর অঞ্চল এবং ককেশাস থেকে। একবার এই নারীরা সাম্রাজ্যের হেরেমে প্রবেশ করলে, তারা সুলতানের সম্পত্তিতে পরিণত হন, যার সাথে সুলতান যৌন মিলনের অধিকার রাখেন।
তবে অধ্যাপক বোয়ারের মতে যে বিষয়টি একজন সাধারণ উপপত্নীকে শক্তিশালী করে তুলেছিল সেটি হল, সুলতানের সন্তান জন্ম দেয়া, বিশেষত যদি একটি ছেলে সন্তান হয়। ওই সময়ে অনেক শিশু স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে অল্প বয়সেই মারা যেতো, এবং এ কারণে ওই যুগে বেশি সংখ্যাক পুরুষ উত্তরাধিকারী জন্ম দেয়া গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হত।
মিখাইল বলেন, বেশি বেশি সন্তান জন্ম দেয়ার পেছনে আরেকটি কারণ হল, একটি নির্দিষ্ট বয়সের পরে একজন রাজপুত্রকে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে হতো, যেখানে তার মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল। অটোমান সাম্রাজ্যের ভিত্তি ছিল বংশের ধারা টিকিয়ে রাখা এবং সেক্ষেত্রে যদি কোন পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকত, তবে এই সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেত। যে কারণে আরও বেশি পুরুষ সন্তান থাকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যাতে তাদের একজনের কিছু ঘটে গেলে মানে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হলে, অন্য সন্তানটি সেখানে দায়িত্ব নিতে পারে।
ইউডি/এ

