চীনে তরুণরা কেন চাকরি ছেড়ে ঘরে ফিরছেন

চীনে তরুণরা কেন চাকরি ছেড়ে ঘরে ফিরছেন

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৯ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১০:১৯

কাজের চাপে নাজেহাল, অতিরিক্ত খাটুনিতে ক্লান্ত জুলি এপ্রিল মাসে তার চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে গেছেন বাবামায়ের কাছে ‘পূর্ণকালীন সন্তান’ হিসেবে ঘরে থাকতে। বেইজিংএ তিনি কম্প্যুটার গেম তৈরির কাজ করতেন। এখন ২৯ বছর বয়সী জুলির সারাটা দিন কাটে বাসন ধুয়ে, বাবামায়ের জন্য রান্না এবং সংসারের আরও নানা কাজ করে। জুলির বাবা-মা তাকে প্রতি দিনের হাতখরচাটা জোগান। তারা জুলিকে মাসে দু হাজার ইউয়ান (২৮০ ডলার) বেতন দিতে চেয়েছিলেন। জুলি নেননি। জুলি এই মুহূর্তে চাইছেন প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টা অমানুষিক পরিশ্রমের হাত থেকে মুক্তি। বলেন, ‘আমি ছিলাম আদতে একটা লাশ, যেটা শুধু হেঁটেচলে বেড়াত।

চীনে একদিকে কর্মস্থলে অমানুষিক শ্রম, অন্যদিকে চাকরির বাজারের নিদারুণ হাল- এই দুই কারণে দেশটির তরুণ সমাজ অভিনব জীবন বেছে নিচ্ছে। জুলির মতো তরুণ-তরুণীর সংখ্যা চীনে ক্রমশ বাড়ছে, যারা নিজেদের নাম দিয়েছে ‘পূর্ণকালীন সন্তান’। তারা বাবা-মায়ের আরামের সংসারে ফিরে যেতে চাইছে- হয় অমানুষিক পরিশ্রমের পর কিছুদিন আরামআয়েশ করে দিন কাটাতে, নয়ত বাজারে চাকরি খুঁজে হন্যে হয়ে কিছুই না জোটাতে পেরে।

চীনে তরুণ প্রজন্মকে সবসময় বলা হয়েছে, সাফল্য পেতে হলে, জীবনে জিততে হলে লেখাপড়ার জন্য অনেক খাটতে হবে, কঠিন পরিশ্রম করে ভালো ডিগ্রি পেতে হবে। এখন সেই প্রজন্ম মনে করছে জীবনযুদ্ধে তারা পরাজিত- তারা একটা যাঁতাকলে আটকা পড়েছে। মে মাসে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দেশটিতে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের বেশি কর্মহীন। ২০১৮ সালে কর্তৃপক্ষ এই তথ্য প্রকাশ শুরু করার পর থেকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেকারত্বের হার বর্তমানে সবচেয়ে বেশি। গ্রামীণ এলাকায় চাকরির বাজারের চিত্র এই পরিসংখ্যানের অন্তর্ভুক্ত নয়।

তথাকথিত এই ‘পূর্ণকালীন সন্তানদের’ অনেকেই বলেছেন তারা দীর্ঘমেয়াদে ঘরে বসে থাকতে চান না – এটা নিতান্তই সাময়িক – তাদের জন্য এটা শুধুই আরাম করার জন্য কিছুটা সময় বেছে নেওয়া, সেই সময় সামনের কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে ভাবা এবং ভাল চাকরি খোঁজা। কিন্তু এটা বলা যত সহজ, কাজটা তত সহজ নয়। জুলি গত দু সপ্তাহে এপর্যন্ত চাকরির সন্ধানে ৪০টির বেশি আবেদনপত্র পাঠিয়েছেন। ইন্টারভিউতে ডাক পেয়েছেন মাত্র দু জায়গা থেকে। ‘চাকরি ছাড়ার আগে কাজ পাওয়া ছিল কঠিন, এখন চাকরি ছাড়ার পর তা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে’ বলেন তিনি।

কর্মহীন নাকি যাঁতাকলে আটকা?

চীনে কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে ভারসাম্য রাখার ব্যাপারটা এতটাই কঠিন যে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা শ্রম দিয়ে দম ফুরিয়ে যাওয়া প্রাপ্তবয়স্করাই যে দেশটির ‘পূর্ণকালীন সন্তান’ হয়ে উঠছেন, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। চীনে কর্মসংস্কৃতিকে প্রায়ই ব্যাখ্যা করা হয় প্রচলিত ‘৯৯৬’ নামে – অর্থাৎ সেখানে সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কাজ করতে হয় সপ্তাহে ৬ দিন। চেন ডুডু-ও একজন ‘পূর্ণকালীন কন্যাসন্তান’ হয়েছেন। এবছরের গোড়ার দিকে আবাসন শিল্প খাতে তার চাকরি থেকে তিনি ইস্তফা দেন। খাটতে খাটতে ক্রমশ তার দম ফুরিয়ে আসছিল এবং কাজে তার যথেষ্ট মূল্যায়নও করা হচ্ছিল না। ২৭ বছর বয়সী চেন ডুডু বলছিলেন, বাসভাড়া দেবার পর তার হাতে খরচের অর্থ আর প্রায় কিছুই থাকত না।

যখন তিনি দক্ষিণ চীনে তার বাবামায়ের বাড়িতে ফিরে যান, চেন বলেন, তিনি একজন অবসরপ্রাপ্তের মতো জীবন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে উদ্বেগ তাকে গ্রাস করতে শুরু করে। তিনি বলেন, মাথার ভেতর তিনি স্পষ্ট দুটো কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছিলেন, ‘একটা কণ্ঠ বলছিল এধরনের বিশ্রাম একটা বিরল বিলাসিতা, কাজেই এটা উপভোগ করে নাও। অন্য কণ্ঠটা বলছিল এরপর কী করবে সেটা ভাবতে শুরু করো।’ চেন এরপর তার নিজের ব্যবসা শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘আমার ওই বিশ্রামের দিনগুলো যদি আরও লম্বা হতো, আমি কিন্তু সত্যিই পরজীবী হয়ে যেতাম।’

জ্যাক ঝেং সম্প্রতি চীনের বিশাল প্রযুক্তি কোম্পানি টেনসেন্ট থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। তিনি বলছিলেন তাকে প্রতিদিন কাজের সময়ের বাইরে কাজ সংক্রান্ত প্রায় ৭০০০ টেক্সট মেসেজের উত্তর দিতে হতো। ৩২ বছর বয়সী এই প্রযুক্তি কর্মী বলছেন এটা ‘অদৃশ্য একটা ওভারটাইম’, কারণ আপনার কাছে কাজ চাওয়া হচ্ছে, কিন্তু তার বিনিময়ে কোনো অর্থ দেওয়া হচ্ছে না। অবশেষে তিনি কাজ ছাড়তে বাধ্য হন কারণ অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে তিনি ফলিকিউলাইটিস রোগের শিকার হন। এটা একধরনের চর্মরোগ, মানসিক চাপ থেকে এই রোগে চুলের গোড়ায় প্রদাহ সৃষ্টি হয়।

তবে ঝেং এরপর একটা ভালো চাকরি পেয়েছেন, যদিও তিনি বলছেন তার আশেপাশে অন্যরা তার মতো ভাগ্যবান হননি। অনেকেই মনে করেন তারা তথাকথিত ‘৩৫-এর অভিশাপ’এর শিকার। চীনের মানুষ ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করে যে দেশটির চাকুরিদাতারা ৩৫ এর বেশি বয়সীদের কাজ দিতে চায় না- তারা বরং চায় তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কারণ তাদের ওপর ‘খরচ কম’ তাদের বেতন দিতে হয় কম।

তিরিশের মধ্য কোঠায় যাদের বয়স তাদের জন্য এটা বিরাট একটা চ্যালেঞ্জ – একদিকে বেশি বয়সের কারণে বৈষম্য অন্যদিকে চাকরির বাজারে মন্দা, যা তাদের জন্য শাঁখের করাত। তাদের মাথার ওপর হয় রয়েছে বাড়ি কেনার জন্য নেওয়া বন্ধকের বোঝা, নয়ত এই বয়সে কেউ কেউ বিয়ে করে সংসার পাতার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের মধ্যেও কম হতাশা নেই। তারাও এতটাই হতাশ যে অনেকে ইচ্ছে করে পরীক্ষা ফেল করছে যাতে স্নাতক হওয়াটা পেছিয়ে দেয়া যায়।

গত কয়েক সপ্তাহে চীনের সামাজিক মাধ্যম ছেয়ে গেছে গ্র্যাজুয়েট হওয়া শিক্ষার্থীদের ভিন্নধর্মী নানা ছবিতে। ছবিতে সাফল্যে উল্লাস প্রকাশের বদলে সদ্য গ্র্যাজুয়েটদের হতাশা প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। কিছু ছবিতে দেখা যাচ্ছে স্নাতক উপাধি নেবার বিশেষ গাউন পরে আর গ্র্যাজুয়েট টুপি দিয়ে মুখ ঢেকে তারা মাটিতে সটান শুয়ে আছেন, কোন কোন সদ্য স্নাতকরা ছবি পোস্ট করেছেন যেখানে তাদের হাতে সার্টিফিকেট ধরা আছে আবর্জনার বিনের ঠিক উপরে, যেন সেটা এখুনি ময়লার ঝুড়িতে ফেলা হবে।

এক সময়ে চীনে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন বড়লোকের ছেলেমেয়েরা। কিন্তু ২০১২ থেকে ২০২২এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৩০% থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯.৬%এ। কারণ প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে উন্নত সুযোগ পাবার জন্য ডিগ্রি অর্জনকে সেই জগতে পা রাখার একটা গুরুত্বপূর্ণ সিঁড়ি বলে মনে করতে শুরু করে বহু তরুণ। কিন্তু চাকরির বাজার সঙ্কুচিত হয়ে পড়ায় তাদের সেই আকাঙ্ক্ষা রূপ নেয় চরম হতাশায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরও এক কোটি ১৬ লাখ নতুন স্নাতক এখন চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় নামায় অবস্থা আরও খারাপ হয়ে উঠবে।

এইচআর নামে শাংহাইভিত্তিক একটি নিয়োগ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মিরিয়াম উইকার্টসহেইম অবশ্য বলছেন, ‘পরিস্থিতি বেশ খারাপ। মানুষ ক্লান্ত এবং অনেকেই বিকল্প পথ খুঁজছে। মানুষের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি হয়েছে।’ কোভিডের পর চীনে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার অপ্রত্যাশিত শ্লথ গতি বেকারত্ব এত বাড়ার প্রধান কারণ বলে মনে করেন ব্রুস প্যাং, যিনি জোন্স ল্যাং লাসালে নাামে একটি সংস্থায় বৃহত্তর চীন বিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ। কোন কোন কর্মদাতা নতুন স্নাতকদের চাকরি দিতে অনাগ্রহী যারা ক্রমাগত কোভিড লকডাউনের কারণে অতীতের গ্র্যাজুয়েটদের তুলনায় কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে খুবই কম। কর্মদাতারা এই চাকরি প্রত্যাশীদের দেখছেন শুধু ‘ডিগ্রির কাগজধারী’ হিসেবে- বলছেন প্যাং।

ইউডি/এ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading