কম্বোডিয়া নির্বাচন: শাসক দলের সিদ্ধান্ত যেখানে সর্বশেষ ফলাফল!
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২৩ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১০:২৫
কয়েক বছর আগেই কম্বোডিয়ার শাসক তার রাজনৈতিক বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করতে সবচেয়ে নির্দয় অভিযান চালিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের বিরোধী দলের জনপ্রিয়তা সে সময় বাড়ছিল এবং তার ক্ষমতা হুমকির মুখে পড়ছিল। তিনি তখন আদালতকে ব্যবহার করে বিরোধী দলকে ভেঙ্গে দেন। বিরোধী দলের নেতাদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল করা হয়। গ্রেফতার করা হয় অন্য নেতাদের। প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করে ছয় মাস পরে নির্বাচন দেন তিনি।
২০১৮ সালের ওই নির্বাচনে কম্বোডিয়ার সংসদের ১২৫টি আসনের সবকটিতেই জয় পায় তার দল। পাঁচ বছর পর আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে কম্বোডিয়ায়। আজ রবিবার (২৩ জুলাই) হতে যাওয়া নির্বাচনও অনেকটা একতরফা ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তিই মনে হচ্ছে ভোটারদের কাছে। মানুষের মধ্যে এই নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনাই নেই। বর্তমানে ৭০ বছর বয়সী হুন সেন ১৯৮৫ সাল থেকে কম্বোডিয়া শাসন করছেন।
এক সময় খেমার রুজ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করলেও পরে ভিয়েতনামের সাথে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ৩৮ বছর ধরে কম্বোডিয়ার ক্ষমতা ধরে রাখা হুন সেন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দাবি করেন। আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, এই দীর্ঘ সময় ধরে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে তিনি কম্বোডিয়ার একক ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তার রাজনৈতিক বিরোধীদের কারাগারে পাঠিয়ে, নির্বাসিত করে বা তাদের সাথে আঁতাত করে ক্ষমতার শীর্ষে নিজের অবস্থান অক্ষুন্ন রেখেছেন।
কে এই হুন সেন
হুন সেনের জন্ম ১৯৫২ সালে এক কৃষক পরিবারে। নমপেনে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের কাছে শিক্ষা লাভ করেন তিনি। ষাটের দশকের শেষ দিকে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। সে সময় এক বন্দুকযুদ্ধে তিনি তার বাম চোখ হারান। সত্তরের দশকের শেষদিকে পল পটের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলে হান সেন খেমার রুজের একজন কমান্ডার ছিলেন। খেমার রুজের শাসনামলে কম্বোডিয়ায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ মারা যায়। ১৯৭৭ সালে তিনি ভিয়েতনামে পালিয়ে যান এবং খেমার রুজের বিরোধী সেনাদের সাথে যোগ দেন।
কম্বোডিয়ায় ১৯৭৯ সালে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা করে ভিয়েতনাম। তখন তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেশে ফেরত যান। পরে ১৯৮৫ সালে ৩৩ বছর বয়সে তিনি কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৩ সালের নির্বাচনে হুন সেন হেরে গেলেও পরাজয় মানতে অস্বীকার করেন। পরে ফুচিনচেপ পার্টির প্রিন্স নরোদম রানারিধের সাথে সমঝোতা করে দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন। এরপর ১৯৯৭ সালে রক্তক্ষয়ী এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের ক্ষমতা দখল করেন এবং প্রিন্স রানারিধকে সাময়িকভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেন।
লোক দেখানো নির্বাচন
এ বছরের নির্বাচনের আগে কয়েক মাস ধরে হুন সেন তার একমাত্র কঠিন প্রতিপক্ষ ক্যান্ডললাইট পার্টিকে বিভিন্নভাবে দমন করেছেন। নির্বাচনের আগে শেষ পর্যন্ত তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। সাবেক বিরোধীদলের ধ্বংসাবশেষ থেকে গত বছরই ক্যান্ডললাইট পার্টির সূচনা হয়। গত বছরের স্থানীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় থাকা দলের ব্যাপক ভয়ভীতি দেখানো ও ভোট জালিয়াতির প্রমাণ থাকা স্বত্ত্বেও ক্যান্ডললাইট পার্টি ২২% শতাংশ ভোট পায়।
এই বিষয়টি হুন সেন মেনে নিতে পারেননি। তাই তারা বড় হুমকি হয়ে ওঠার আগেই তিনি ‘ক্যান্ডললাইটের শ্বাসরোধ’ করেন বলে মন্তব্য করেন অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বৈরশাসক বিশেষজ্ঞ লি মরগেনবেসার। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে হুন সেনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করছেন। ফেব্রুয়ারি মাসে ক্যান্ডললাইট পার্টির নেতাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেন তিনি। পরে মে মাসে পার্টিকে নিষিদ্ধ করেন হুন সেন। পরে নির্বাচনি অফিস আইনি মারপ্যাচের ভিত্তিতে দলটিকে নির্বাচনে অংশ নিতে অবৈধ ঘোষণা করে।
এ বছরের নির্বাচনে আরো ১৭টি পার্টি অংশগ্রহণ করছে। কিন্তু তারা হয় অনেক ছোট অথবা ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পৃক্ত। সে কারণে এই দলগুলোকে এই নির্বাচনে একেবারেই তাৎপর্যহীন মনে করা হচ্ছে।
হুন সেনের পর কী হবে?
এ বছরের মে মাসে ক্যান্ডললাইট পার্টিকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার পর বিরোধী দলটি কি করবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। দলটির কোনো কোনো নেতা সমর্থকদের বিক্ষোভ করার কথা বলেন। দেশের বাইরে থাকা স্যাম রেইনসি নির্বাচন বয়কটের ডাক দেন।
তবে শেষ পর্যন্ত ক্যান্ডললাইট ঠিক করে যে টিকে থাকতে আপাতত তারা বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপে যাবে না বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, হুন সেনের ছেলে হান ম্যানেট (পড়ালেখা করেছেন পশ্চিমা দেশে) ক্ষমতা নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। হান ম্যানলেট হুন সেনের তিন ছেলের মধ্যে সবচেয়ে বড়। তিনি কম্বোডিয়ার সেনাবাহিনীর প্রধান।
হুন সেনের অন্য দুই ছেলেও পার্টি ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। হুন সেনের পর তারা যেন ক্ষমতায় আসতে পারে তা নিশ্চিত করতে তিনি নিজের ছেলেদের তৈরি করছেন বলে মন্তব্য করেন বিশ্লেষকরা। তবে হুন সেনের ছেলেদের মধ্যে কেউ ক্ষমতায় আসলে যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে, তা মনে করেন না অনেক বিশেষজ্ঞ।
ইউডি/এ

