আমেরিকার চোখে চোখ কিমের, কোরীয় উপদ্বীপে বাড়ছে উত্তেজনা
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২৬ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১০:২৫
দক্ষিণ কোরিয়া ও আমেরিকার সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জবাবে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিচ্ছেন উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উন। আমেরিকার চোখে চোখ রেখে কথা বলছে পিয়ংইয়ং। এমন অবস্থায় কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা ফের বাড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বন্দরে দ্বিতীয় মার্কিন পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন পৌঁছার পর ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে উত্তর কোরিয়া।
দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান এমন তথ্য জানিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার যুগ্ম চিফ অফ স্টাফ বলেন, সোমবার দিবাগত গভীর রাতে উত্তর কোরিয়া তার পূর্ব উপকূল থেকে সমুদ্রে একটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, যেটি ছোঁড়া হয়েছে তা উত্তর কোরিয়ার একটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হতে পারে।
উত্তর কোরিয়ার অস্ত্র কর্মসূচির বিরুদ্ধে আমেরিকার কৌশলগত সামরিক উপকরণ মোতায়েন করে দক্ষিণ কোরিয়া ও আমেরিকার সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়ায় কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তর কোরিয়া ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানিয়েছে, এই ধরনের মোতায়েন তাদের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কারণ হতে পারে। এর আগে সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার বন্দরে কয়েকদিনের ব্যবধানে পৌঁছায় আমেরিকার দ্বিতীয় পরমাণু চালিত সাবমেরিন। এর কয়েকদিন আগে চার দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো পরমাণু চালিত প্রথম মার্কিন সাবমেরিন দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছায়।
অস্ত্রের মজুদ বাড়াচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া
উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকি ও সামরিক কর্মকাণ্ডের মোকাবেলা করতে ওই অঞ্চলে কৌশলগত অস্ত্রের মজুদ বাড়াচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া ও মার্কিন আমেরিকা। দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনী জানিয়েছে, ইউএসএস আনাপোলিস একটি অনির্দিষ্ট অপারেশনাল মিশনে থাকাকালীন সামরিক সরবরাহ লোড করার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ দ্বীপ জেজুতে একটি নৌ ঘাঁটিতে প্রবেশ করেছে। এক বিবৃতিতে দক্ষিণ কোরীয় বাহিনী জানিয়েছে, দুই দেশের নৌবাহিনী ইউএসএস অ্যানাপোলিসের আগমনের সঙ্গে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ভঙ্গি শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করেছে এবং জোটের ৭০তম বার্ষিকী উদযাপনে বিনিময় কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
ইউএসএস কেনটাকি দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা পর গত বুধবার উত্তর কোরিয়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে এবং শনিবার আবারও কয়েকটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ইউএসএস অ্যানাপোলিস ইউএসএস কেনটাকির মতো পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত নয়। তবে এটি জাহাজ-বিরোধী এবং সাবমেরিন-বিরোধী যুদ্ধে পারদর্শী। এটি গত সেপ্টেম্বরে কোরীয় উপদ্বীপের আন্তর্জাতিক জলসীমায় দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের সাথে ত্রিপক্ষীয় অ্যান্টি-সাবমেরিন অনুশীলনে যোগ দিয়েছিল।
হঠাৎ কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা
ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার চলমান যুদ্ধ নিয়ে এমনিতেই বিশ্বে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এর মধ্যেই হঠাৎ করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে কোরীয় উপদ্বীপ। মূলত, আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, সোমবার সকালে কিম জং উনের দেশ উত্তর কোরিয়া কোরীয় উপদ্বীপের জলসীমায় আরও দুটি ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করেছে। এর আগে শনিবার একটি দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় দেশটি।
জাপানের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে এমনটি বলা হয়েছে। জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ধারণা করা হচ্ছে— দুটি ক্ষেপণাস্ত্র স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ৭টার দিকে নিক্ষেপ করা হয়েছে। তবে কর্মকর্তারা বিষয়টি পর্যালোচনা করছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র দুটি কোরীয় উপদ্বীপের পূর্বে জাপান সাগরে পতিত হয়েছে। তবে এগুলো জাপানের বিশেষায়িত (এক্সক্লুসিভ) অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে পড়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে উত্তর কোরিয়া। পিয়ংইয়ং এটিকে সুপার-লার্জ মাল্টিপল রকেটলঞ্চার এক্সারসাইজ বলে অভিহিত করেছে। যাকে মূলত, কৌশলগত পারমাণবিক হামলার সঙ্গে তুলনা করা যায়। উত্তর কোরিয়া বলছে, দক্ষিণ কোরিয়া ও আমেরিকার যৌথ বিমান মহড়ার জবাবে এই অনুশীলন পরিচালনা করা হয়েছে।
যৌথ মহড়ার ঘটনা নতুন নয়
এর আগে যৌথ বিমান মহড়া চালায় দক্ষিণ কোরিয়া ও আমেরিকা। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছে, উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে ‘নজিরবিহীন প্রতিক্রিয়ার’ যে হুমকি দেওয়া হয়েছে, তার জবাবে এই মহড়া চালানো হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, মহড়ায় উভয়দেশের এফ-৩৫, এফ-১৫ এবং এফ-১৬ যুদ্ধবিমান অংশ নেয়। আর এসব বিমানের নিরাপত্তায় (এস্কর্ট) আমেরিকা বিমানবাহিনীর বি-১বি বোমারু বিমান মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া জাপানও যৌথ মহড়ায় অংশ নেয়।
সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়, আসছে মার্চের মাঝামাঝি সময়ে যৌথ মহড়ার পরিকল্পনা করছে সিউল ও ওয়াশিংটন। সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়া বিষয়টি জানিয়ে বলে, সম্ভবত এটি হচ্ছে— দুই দেশের মধ্যকার এ যাবতকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় যৌথ মহড়া। সিউলের পক্ষ থেকে এমন তথ্য জানানোর পরই ক্ষেপে যায় পিয়ংইয়ং। উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে গত শুক্রবার হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, দক্ষিণ কোরিয়া ও আমেরিকা যদি এমন মহড়া চালানোর দিকে অগ্রসর হয়, তা হলে নজিরবিহীন প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে।
এর পর দিন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় দেশটি। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার জবাবে রোববার যৌথ মহড়া চালায় দক্ষিণ কোরিয়া ও তার মিত্র আমেরিকা। আর এর জবাবে সোমবার একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল কিমের দেশ। অর্থাৎ মহড়া ও পাল্টা মহড়ায় হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে কোরীয় উপদ্বীপ।
গত বছর বিবিসির এক বিশ্লেষণে উত্তর কোরিয়ার এ প্রবণতার জন্য তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, নিজেদের অস্ত্র পরীক্ষা করাসহ সেগুলো তৈরির প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন, বিশ্বকে বিশেষ করে প্রাথমিকভাব আমেরিকাকে একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া এবং নিজ দেশের জনগণকে প্রভাবিত করার পাশাপাশি শাসকদের প্রতি আনুগত্য বাড়াতে কিম এমনটি করছেন।
পিয়ংইয়ংয়ের এই পদক্ষেপগুলোর কোনটি কিভাবে কাজ করবে তা বোঝা বেশ কঠিন। তবে কিম এবার বেশ স্পষ্টভাবে তার বার্তা দিয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বেশ কয়েকবার স্পষ্ট করেই বলেছে, আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সামরিক মহড়ার প্রতিক্রিয়ায় তারা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে এবং সামরিক মহড়া চালিয়েছে।
ইউডি/এ

