ইন্ডিয়ার রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট: অনাস্থা ভোটের মুখে মোদি

ইন্ডিয়ার রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট: অনাস্থা ভোটের মুখে মোদি

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ৩১ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১৪:১০

ইন্ডিয়ায় নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে দেশটির পার্লামেন্টে বিরোধী জোট যে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছে, তার ওপর বিতর্কের দিনক্ষণ আজ সোমবার চূড়ান্ত হবে। এতে ক্ষমতাসীন দল তথা মোদির বিপদের সম্ভাবনা না-থাকলেও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে এই পদক্ষেপকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই অনাস্থা প্রস্তাবে কী ক্ষতির মুখে পড়বেন মোদি, তা নিয়ে আলোচনার কমতি নেই। এ নিয়ে সাদিত কবির’র প্রতিবেদন

বিরোধীদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ!

ইন্ডিয়ার প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের এমপি গৌরব গগৈ-এর আনা অনাস্থা প্রস্তাবটিতে বিভিন্ন ইস্যুর সঙ্গে দেশটির বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচনার বিষয় মণিপুরের চলমান সহিংসতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির ২৬টি বিরোধী দলের জোট ‘ইন্ডিয়া’ এই প্রস্তাবটিকে সমর্থন করছে, যদিও ক্ষমতাসীন সরকারকে হারানোর মতো শক্তি বিরোধীদের নেই। এত তড়িঘড়ি করে অনাস্থা প্রস্তাব আনাটা হলো বিরোধীদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। পাশাপাশি মোদির কৌশল ভেস্তে দেওয়ারও অস্ত্র। আসলে বিরোধীরা সংসদ অচল করে রাখার পর মোদি-শাহ ঠিক করেছেন, এবার সরকার তাদের বিলগুলো পাস করিয়ে নেবে।

এবার সংসদে ৩১টি বিল পাস করাতে চায় সরকার। তার মধ্যে দিল্লি নিয়ে বিতর্কিত অর্ডিন্যান্সকে আইনে পরিণত করা সংক্রান্ত বিল আছে। যে অর্ডিন্যান্সে উচ্চপদস্থ আমলা নিয়োগের ক্ষমতা রাজ্য সরকারের হাত থেকে নিয়ে লেফটন্যান্ট গভর্নর বা এলজিকে দেওয়া হয়েছে। ইন্ডিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় দু’জন মনোনীত-সহ যে মোট ৫৪৫ জন এমপি আছেন, তার মধ্যে মোদি সরকার ৩৩২জনের সমর্থন পাবে ধরেই নেওয়া হচ্ছে। ফলে এই প্রস্তাবে কিছুতেই সরকারের পতন হচ্ছে না এটা নিশ্চিত। তবে, বিরোধী দল আরজেডি’র এমপি মনোজ ঝা বলছেন, সংখ্যা আমাদের হাতে নেই এটা যেমন ঠিক, কিন্তু এটা আসলে কোনও নাম্বার গেমও নয়। অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীকে অংশ নিতেই হবে, আর মণিপুর সঙ্কট নিয়ে তাকে পার্লামেন্টে মুখ খুলতে বাধ্য করাটাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।

গত মে মাসের শুরুতে মণিপুরে সংখ্যাগুরু মেইতেই আর সংখ্যালঘু কুকিদের মধ্যে রক্তাক্ত জাতি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইন্ডিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার বিষয়টি নিয়ে মোটের ওপর নীরবই থেকেছে। দুই কুকি নারীকে নগ্ন করে ঘোরানোর ভিডিও সামনে আসার পর নরেন্দ্র মোদি বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি প্রথমবারের মতো মুখ খোলেন, তবে সেটাও ছিল পার্লামেন্টের বাইরে। এই পরিস্থিতিতে অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর আলোচনার সুবাদে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে পার্লামেন্টে বক্তব্য দিতেই হবে, আর সেটাকেই একটা বড় সাফল্য বলে বিরোধীরা মনে করছেন।

কংগ্রেসের ‘অস্ত্রে’ই কংগ্রেস বধ করতে চাইছে বিজেপি

ক্ষমতাসীন বিজেপি বিরোধীদের আনা এই অনাস্থা প্রস্তাবকে মোটেই গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশী বলেছেন, বিগত সরকারের আমলেও শেষ দিকে বিরোধীরা অনাস্থা প্রস্তাব এনেছিলেন, কিন্তু দেশের মানুষ তখন তাদের উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন। এবারেও যে দেবেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বিজেপি তাদের বিতর্কে কংগ্রেস জমানায় নারী নির্যাতনের বিষয়গুলি তুলে ধরার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে।

কংগ্রেস স্বাধীনতার পর থেকে নারীদের সুরক্ষা নিয়ে কতটা উদাসীন তা তারা পেশ করবে লোকসভায়। মোদির জবাবী ভাষণেও কংগ্রেসের ব্যর্থতার দিকটাই তুলে ধরা হবে। অর্থাৎ, কংগ্রেসের অস্ত্রেই কংগ্রেস বধ করতে চাইছে বিজেপি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, অনাস্থা প্রস্তাবে ভোটাভুটির ফল জানাই আছে, তাকে ঘিরেও এতটা রাজনৈতিক আগ্রহ সা¤প্রতিককালে কখনোই দেখা যায়নি। আর ঠিক এ কারণেই এই প্রস্তাবটি সংসদীয় গণতন্ত্রে আর পাঁচটি অনাস্থা প্রস্তাবের চেয়ে একেবারেই আলাদা বলে তারা মনে করছেন।

এবার ‘জাদু কি ঝাপ্পি’ দেবেন কে?

ইন্ডিয়ার অনেকেই অবশ্য ২০১৮ সালের বিতর্ককে মনে রেখেছেন সম্পূর্ণ অন্য কারণে। তখনকার কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী বিতর্কে তার ভাষণ শেষ করেই আচমকা ট্রেজারি বেঞ্চ অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন, যাকে ‘জাদু কি ঝাপ্পি’ (ম্যাজিকের মতো আলিঙ্গন) বলে বর্ণনা করেছিলেন। রাহুল গান্ধী তখন বলেছিলেন, তার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর মনে যতই ঘৃণা বা বিদ্বেষ থাক, তিনি সেই আলিঙ্গনের মাধ্যমেই তা দূর করে দেবেন। ঠিক পাঁচ বছর এবারও যখন অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক শুরু হবে, প্রধানমন্ত্রীর আসনে নরেন্দ্র মোদি থাকলেও সভায় রাহুল গান্ধী কিন্তু থাকতে পারছেন না। ‘মোদি’ পদবীধারীদের অপমান করার অভিযোগে গুজরাটের একটি আদালতের রায়ের জেরে রাহুল গান্ধীর লোকসভার সদস্যপদ খারিজ হয়ে গেছে মাসকয়েক আগেই। দিল্লির সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরতি জেরাথ মনে করেন পার্লামেন্টে রাহুল গান্ধীর এই অনুপস্থিতিই এবারে অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর বিতর্ককে একটা আলাদা মাত্রা দেবে। তার ভাষ্য, আমরা জানি রাহুল গান্ধীই হলেন নরেন্দ্র মোদির প্রিয়তম ‘পাঞ্চিং ব্যাগ’। রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধেই সুবক্তা নরেন্দ্র মোদি তার সেরা আক্রমণগুলো শানিয়েছেন।

বিজেপি এটাও জানে যে মোদি বনাম রাহুল, এই বাইনারিটাই তাদের এতদিন সবচেয়ে বেশি ফায়দা দিয়েছে। এখন পার্লামেন্টে মোদি কীভাবে তার সেই পরীক্ষিত ও সফল ফর্মুলাটা পাল্টান, সেটা অবশ্যই দেখার বিষয় হবে। এছাড়া যেভাবে একটি শিউড়ে ওঠার মতো পাশবিক ভিডিও ও সেখানে সরকারি উদাসীনতার অভিযোগ এবারের এই অনাস্থা প্রস্তাবটিকে ‘ট্রিগার’ করেছে, সেটাও একটি নজিরবিহীন ঘটনা।

ইন্ডিয়ার বিরোধী শিবির ঐক্যবদ্ধভাবে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের বিরুদ্ধে এই প্রস্তাবটি এনেছে ফলে এবারের ‘ব্যাটল-লাইন’টিও গতবারের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। এই জন্যই ফলাফল জানা থাকা সত্তে¡ও এই অনাস্থা প্রস্তাবটি জাতীয় বা এমন কী আন্তর্জাতিক স্তরে এতটা আগ্রহের সৃষ্টি করেছে বলে আরতি জেরাথের ধারণা।
তিনি বলেন, আমি তো বলব এটা যত না সংখ্যার যুদ্ধ, তার চেয়ে বেশি ধারণার যুদ্ধ (পারসেপশন ব্যাটল)! ভোটাভুটিতে অবশ্যই বিরোধীরা হারবেন। কিন্তু মণিপুরে যখন আজও আগুন জ্বলছে, তখন সভার ফ্লোরে এই বিতর্কটাই কিন্তু ঠিক করে দেবে সেই পারসেপশন ব্যাটলে সরকার না বিরোধীপক্ষ-কারা জিতছেন!

মণিপুরে ধর্ষণের শিকার নারীদের কথা তুলে ধরবেন বিরোধীরা

মণিপুরে জাতিগত দাঙ্গায় ধর্ষণের শিকার এক নারীর সঙ্গে কথা বলেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সুস্মিতা দেব। তিনি বলেছেন, ওই নারী তার ছেলে ও স্বামীর মৃতদেহ দেখতে চান। এ জন্য মণিপুরের রাজ্যপালের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন ধর্ষণের শিকার ওই নারী। বিজেপি-বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের ১৬টি দলের ২১ জন সংসদ সদস্য দুই দিনের সফরে শনিবার মণিপুরে যান। সফর শেষে রবিবার মণিপুরের রাজ্যপাল অনুসূইয়া উইকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তারা। এ সময় গত দুই দিনে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় দাঙ্গায় নির্যাতনের শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে যা জানতে পেরেছেন, তা তুলে ধরেন।

সোনিয়া গান্ধি, রাহুল গান্ধি ও মমতা ব্যানার্জি

আজ সোমবার পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরু হবে। তখন মণিপুর প্রসঙ্গ নিয়ে এই ১৬ জন সংসদ সদস্য শুধু তাদের বক্তব্যই দেবেন না, সরকারকে যে কোণঠাসা করবেন, তা বলা বাহুল্য। ধারণা করা হচ্ছে, অধিবেশনে তৃণমূলের সংসদ সদস্য সুস্মিতা দেবও বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি যে নারীদের যৌন নির্যাতন করা হয়েছে তাদের কথাও তিনি তুলে ধরবেন। মণিপুরের পরিস্থিতি নিয়ে করণীয় সম্পর্কে রাজ্যপালের হাতে একটি স্মারকলিপি তুলে দিয়েছিলেন বিরোধীরা। এতে কয়েকটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শান্তি ও স¤প্রীতি সুনিশ্চিত করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দ্রুত পুনর্বাসন।

এছাড়া মণিপুরে জাতিগত সংঘাত নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন সম্পূর্ণ রূপে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে, মণিপুরের পরিস্থিতির প্রতি ‘পূর্ণ উদাসীনতা’ এবং সম্পূর্ণ নীরব থাকার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কড়া ভাষায় নিন্দা করেন বিরোধীরা। উল্লেখ্য, মণিপুর সফরের মাধ্যমে এই প্রথম নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দলগুলো মাঠপর্যায়ে একটি তদন্তের কাজ সম্পন্ন করল। তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিআইএমের মতো পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দুটি দল দেশের স্বার্থে একটি সামগ্রিক বিজেপি-বিরোধী জোটের প্রথম কর্মসূচি পালন করল। এটিকে বিরোধী জোটের একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। আগামীকাল পার্লামেন্টে তারা একজোট হয়ে বিষয়টি কীভাবে তুলে ধরেন, সেটাই দেখার বিষয়।

ইন্ডিয়ার লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাব: ইতিহাস কী বলছে?

১৯৫২ সালে ইন্ডিয়ান সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাব আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো, যে প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটিতে হেরে গেলে ওই সরকারকে বিদায় নিতে হবে। তখন অনাস্থা প্রস্তাব আনতে গেলে অন্তত ৩০জন এমপি’র সমর্থন জরুরি ছিল, বর্তমান সময়ে তা বাড়িয়ে ৫০জন করা হয়েছে। তবে প্রথম দুটি লোকসভার মেয়াদে কোনও অনাস্থা প্রস্তাব আনাই হয়নি। এর পর থেকে ইন্ডিয়ার ইতিহাসে মোট ২৮বার বিরোধীরা ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছেন।

তবে এই ২৮টির মধ্যে শুধুমাত্র একটি ক্ষেত্রেই তা সরকারের পতন ডেকে এনেছিল। ১৯৭৯ সালে মোরারজি দেশাই সরকারের ক্ষেত্রে। ওই প্রস্তাবটি এনেছিলেন কংগ্রেসের ওয়াই বি চবন। এছাড়া ১৯৯০’র দশকে দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমহা রাও দু’দুবার বেশ অল্পের জন্য অনাস্থা প্রস্তাবে পরাজয়ের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ৩১ জুলাই ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা

ইন্ডিয়ার সংসদে শেষবারের মতো কোনও অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছিল ২০১৮ সালের ২০ জুলাই। সাউথ ইন্ডিয়ার রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশকে কেন ‘বিশেষ মর্যাদা’ দেওয়া হচ্ছে না, তার প্রতিবাদ জানাতে সেবার ওই প্রস্তাবটি এনেছিল তেলুগু দেশম পার্টি বা টিডিপি। অন্ধ্র প্রদেশের তখনকার মুখ্যমন্ত্রী ও টিডিপি নেতা চন্দ্রবাবু নাইডু ওই ইস্যুতে তখন বিজেপি জোট ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন, এবং দেশটির বেশ কিছু বিরোধী দল পার্লামেন্টে তাদের সমর্থনও করেছিল। তবে পার্লামেন্টে বারো ঘন্টা ধরে চলা বিতর্কের শেষে নরেন্দ্র মোদি সরকার সেই ভোটাভুটিতে জিতেছিল ১৯৯ ভোটের বিশাল ব্যবধানে।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading