শিক্ষকরা রাস্তায় কেন?: ন্যায্য দাবি মেনে নিতে হবে

শিক্ষকরা রাস্তায় কেন?: ন্যায্য দাবি মেনে নিতে হবে

কিফায়েত সুস্মিত । বৃহস্পতিবার, ০৩ আগস্ট ২০২৩ । আপডেট ১৪:৩৫

বলা হয় ‘শিক্ষক’ সমাজের সবচেয়ে সম্মানি ব্যক্তিত্বের অধিকারী, যা অর্থসম্পদের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত নয়। এই শিক্ষকরাই সমাজের বৃহৎ একটি অংশের নেতৃত্ব দেন, যা চর্মচক্ষে দেখা যায় না। এখনো এই ভূখণ্ডের তৃণমূল পর্যায়ের শত সহস্র মানুষ মেয়ের বিয়ে বা সন্তানের মঙ্গল কামনায় মাস্টার মহাশয়দের পরামর্শক হিসেবে গ্রহণ করেন। তাদের দেওয়া উপদেশ, আদেশ-নির্দেশ সাদরে গ্রহণ করেন। হাজার প্রতিকূলতার দেশে শিক্ষকরা এখন সম্মানের শ্রেষ্ঠাংশে অবস্থান করছেন। এই সম্মানই আত্মতৃপ্তি। তিরস্কার, ধিক্কার, উপহাস মানব সমাজের নেতিবাচক কর্মফল। স্বাধীন দেশের শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদার মাইলফলক স্থাপন করেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশে ১৯৭৩ সালে দেশের ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ করেন। যার ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৬ হাজার বেসরকারি (রেজিস্টার্ড) প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছেন। তার এই উদ্যোগ শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল বয়ে এনেছে। এরপরও বর্তমানে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষকরা দাবি-দাওয়া আদায়ে রাজপথে কেন?

মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণের (সরকারীকরণ) দাবিতে ১১ জুলাই থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা। এর মধ্যে তারা শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। শিক্ষকেরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের দাবিদাওয়ার কথা জানাতে চান। শিক্ষকনেতারা বলেছেন, দাবি আদায় না করে তারা ঘরে ফিরে যাবেন না।

অন্যদিকে রাজপথে বিরোধী দলের আন্দোলন নিয়েও সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। ২৭ জুলাই বিএনপির পূর্বঘোষিত কর্মসূচি সামনে রেখে শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়ন সরকারের অঙ্গীকার। যেখানে সরকার প্রক্রিয়াটি শুরু করেছে, সেখানে এখানে থাকা মানে অ্যাজেন্ডা ভিন্ন। তাই তারা যেন ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে আন্দোলন প্রত্যাহার করে শ্রেণিকক্ষে ফিরে যান। শিক্ষকদের কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বসিয়েছেন বলে শিক্ষামন্ত্রী যে মন্তব্য করেছেন, শিক্ষকনেতারা তা ভালোভাবে নেননি। তবে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের সময় সীমিতসংখ্যক শিক্ষক প্রেসক্লাবের সামনে থাকবেন। শিক্ষকেরা কোনোভাবে সরকারকে বিব্রত করতে চান না।

উল্লেখ্য, অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে ১৯ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষকদের বৈঠক হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। ওই বৈঠকে মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করা যায় কি না, সে বিষয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং বেতনবৈষম্য দূর করার বিষয়ে আরেকটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, কমিটি আগস্টের শেষ নাগাদ গঠন করা হবে। কমিটি গঠনে এত বিলম্ব হওয়ার যুক্তি আছে বলে মনে করি না। শিক্ষকনেতারা এরপর প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করে তাদের দাবিদাওয়ার কথা জানান এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান। আলোচনার ওই প্রক্রিয়ার মধ্যেই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর শিক্ষকদের অবিলম্বে শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়ার নির্দেশনা জারি করে। তারা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের প্রতি অনুপস্থিত শিক্ষকদের তালিকা তৈরিরও নির্দেশ দেয়। শিক্ষা বিভাগের এ নির্দেশনা আন্দোলনরত শিক্ষকদের ক্ষুব্ধ করেছে। তারা বলেছেন, হুমকি দিয়ে বা ভয়ভীতি দেখিয়ে শিক্ষকদের আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না। শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি মানতে হবে। উল্লেখ্য, বেসরকারি শিক্ষকদের মূল বেতন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেওয়া হয়। কিন্তু তাদের যে বাড়িভাড়া, উৎসব ভাতা ও চিকিৎসা ভাতা দেওয়া হয়, সেটা খুবই নগণ্য।

বেসরকারি শিক্ষকদের দাবি, তারা যেহেতু সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো একই পাঠক্রমে একই শ্রেণিতে পাঠদান করেন, তাদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধাও সমান হতে হবে। পেশাজীবীরা যখন ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করেন, সরকারের নীতিনির্ধারকেরা সেটি প্রথমে আমলে নেন না। শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অতীতেও শিক্ষকদের আন্দোলন-ধর্মঘট করেই দাবি আদায় করতে হয়েছে। এই যে শিক্ষকেরা প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে রাজপথে আন্দোলন করছেন, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এই ক্ষতি কোনোভাবে বাড়তে দেওয়া যাবে না। আশা করি, শিক্ষকদের হুমকি-ধমকি না দিয়ে সরকারের উচিত তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ বের করা। শিক্ষকদের রাস্তায় রেখে কখনোই শিক্ষার উন্নতি আশা করা যায় না। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা এই সত্য যত দ্রুত উপলব্ধি করবেন, ততই মঙ্গল।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading