রাশিয়ার ভূখন্ডে ইউক্রেনের পাল্টা হামলা বাড়ছে: দাবার ছক কী উল্টে যাবে?
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ০৯ আগস্ট ২০২৩ । আপডেট ১৬:০০
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের গতিপথ দিনকে দিন পাল্টে যাচ্ছে। দেড় বছরের কাছাকাছি চলমান এই যুদ্ধে সম্প্রতি রাশিয়ার হামলার বিপরীতে পাল্টা হামলা বেশ ভালোভাবেই করে যাচ্ছে ইউক্রেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ এখন রাশিয়ার ভূমিতে যাচ্ছে। তাতে, বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, দাবার ছক কী উল্টে যাবে? এ নিয়ে সাদিত কবির’র প্রতিবেদন
আচমকা কীভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে ইউক্রেন
রাশিয়ার দখলকৃত ও দেশটির নিজ ভূখন্ডে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইউক্রেন। গত রবিবার ও সোমবার রাশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়েছেন ইউক্রেনের সেনারা। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি হামলার কথা স্বীকার করেছে রাশিয়া। মঙ্গলবারও ইউক্রেনের বাহিনী মস্কোর পার্শ্ববর্তী কালুগা শহরে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিল। তবে তা ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে। রুশ নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়াকেও অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইউক্রেন। এ জন্য গত রবিবার দুটি সেতুতে হামলা চালানো হয়েছে। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাশিয়া যেসব এলাকা দখল করে নিয়েছে, সেই সব এলাকা থেকে ক্রিমিয়াকে বিচ্ছিন্ন করতে জোর দিয়েছে তারা। এ জন্য আরও হামলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া সম্প্রতিইউক্রেনের বাহিনী রাশিয়ার তেলের ট্যাংকার, রাজধানী মস্কো ও বন্দরেও হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার পর বরাবরই বার্তা দেওয়া হচ্ছে, এমন হামলা আরও হবে। গত শনিবার ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার জাহাজে এবং ক্রিমিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে আরও হামলা চালানো হবে। সা¤প্রতিক এমন জোরদার হামলার পেছনে রয়েছে পশ্চিমাদের দেওয়া ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা এবং আধুনিক সব অস্ত্র। এসব অস্ত্র দেওয়ায় গত রবিবার পশ্চিমাদের প্রশংসা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি বলেন, আমেরিকা ও জার্মানির কাছ থেকে যেসব আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাওয়া গেছে, সেগুলোর ব্যবহারের ফলে দুর্দান্ত ফল পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় ড্রোন হামলার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ রাশিয়ার ভূমিতে যাচ্ছে। জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
পাল্টা আক্রমণ: প্রত্যাশা কতটা পূরণ করছে কিয়েভ?
বহুল প্রত্যাশা ও অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমাদের পাঠানো কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র নিয়ে গত জুনে রাশিয়ার সেনাদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে ইউক্রেনের সেনারা। এরপর কেটে গেছে দুই মাস। ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণের লক্ষ্য ছিল দখলকৃত অঞ্চলগুলো থেকে রুশ বাহিনীকে পিছু হটানো। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ বলছেন, এখন পর্যন্ত প্রত্যাশার কিছুটা পূরণ করতে পেরেছে এই পাল্টা আক্রমণ।

ভলোদিমির জেলেনস্কি
দক্ষিণাঞ্চলের জাপোরিঝিয়া ইউক্রেনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা যদি এদিকটায় রুশ বাহিনীর দুর্গ ভেদ করতে পারে তাহলে তারা দই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। গত দুই মাসে ইউক্রেনের সেনারা ১৬ কিলোমিটার জায়গা অগ্রসর হয়েছেন বলে দাবি করেন বিশ্লেষকরা। তারা অগ্রসর হয়েছে ঠিকই তবে তা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ধীরগতির। তবে ইউক্রেনীয় বাহিনীর পাল্টা আক্রমণ সম্পর্কে আগেই বুঝতে পেরেছিল রুশ সেনারা। আর এ কারণে কয়েক মাস ব্যয় করে তারা গড়ে তুলেছে কঠিন দুর্গ। যা সাম্প্রতিক সামরিক ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ।
নভোরোসিয়েস্ক-দোনেৎস্ক-ক্রিমিয়াসহ ইউক্রেন সেনাদের যত আক্রমণ
রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্কে কিয়েভ সেনাবাহিনীর ক্লাস্টার বোমা হামলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভবনের ছাদে আগুন ধরে যায়। দোনেৎস্কে রাশিয়ার নিয়োগ দেওয়া মেয়র আলেক্সি কুলেমজিন টেলিগ্রামে এক পোস্টে বলেন, দোনেৎস্কে সর্বশেষ হামলার ফলাফল, ইউনিভার্সিটি অব ইকোনোমিক্স অ্যান্ড ট্রেড এর প্রথম ভবনে আগুন। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্কের দখল নিয়ে ওই অঞ্চলের স্বাধীনতা ঘোষণা করে রাশিয়া। নাম দেয় দোনেৎস্ক পিপলস রিপাবলিক।
এছাড়াও, কৃষ্ণসাগরের তীরবর্তী নভোরোসিয়েস্ক বন্দরে ইউক্রেনের চালানো নৌ-ড্রোন হামলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাশিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজ। বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে দুটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। যদিও রাশিয়া দাবি করেছিল ইউক্রেনীয়দের হামলাটি প্রতিহত করেছে তারা। রুশ নৌ ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইউক্রেনীয় বাহিনী। ইউক্রেনের হামলার পর বন্দরটিতে সব ধরনের জাহাজ চলাচল সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে, ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চল ও রাশিয়ার দখলকৃত ক্রিমিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সেতুতে সফল হামলা চালিয়েছে জেলেনস্কির বাহিনী। এমন দাবি করে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী টেলিগ্রামে জানিয়েছে, রাশিয়ার দুটি প্রধান সড়ক হামলার শিকার হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ক্রিমিয়ার সঙ্গে খেরসন অঞ্চলের সংযোগকারী চোনহার সেতু ও উপদ্বীপের সঙ্গে যুক্ত একটি ছোট সেতুতে হামলা হয়। দায় স্বীকার করার আগেই সেখানকার রুশপন্থি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, হামলায় কিয়েভ জড়িত। খেরসনে রাশিয়ার নিযুক্ত প্রধান অভিযোগ করে বলেন, ব্রিটেনের পাঠানো ‘স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্র’ ব্যবহার করেছে ইউক্রেন।
জার্মানি ও আমেরিকার দেয়া বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বড় ঢাল
জার্মানি এবং আমেরিকার পাঠানো বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দারুন কাজ করছে বলে দাবি করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি বলেছেন, এই ব্যবস্থাটি ব্যবহার করে গত এক সপ্তাহে ‘উল্লেখযোগ্য সংখ্যক’ রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভ‚পাতিত করা হয়েছে। জেলেনস্কি জানান, মস্কো গত সাত দিনে ইউক্রেনে ৬৫টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৭৮টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। তিনি বলেন, ইউএস প্যাট্রিয়ট এবং জার্মান আইরিস-টি শক্তিশালী এবং কার্যকর ব্যবস্থা। আকাশে সন্ত্রাস হেরে যাচ্ছে… ইউক্রেন এই যুদ্ধে জয়ী হতে পারে। আমাদের ‘আকাশঢাল’ শেষ পর্যন্ত গোটা ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এদিকে খারকিভের শহর কুপিয়ানস্কের একটি রক্ত সঞ্চালন কেন্দ্র গত রবিবার রুশ হামলার শিকার হয়। হামলাটিকে রুশ জাহাজের ওপর ইউক্রেনের হামলার প্রতিশোধ বলে ব্যাখ্যা করেছে ক্রেমলিন।

ভ্লাদিমির পুতিন
ইউক্রেনীয় হামলা প্রতিহতের দাবি রাশিয়ার
রুশ কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ইউক্রেনীয় সেনাদের হামলা প্রতিহত করে তাদের অগ্রগতি ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এ খবর জানিয়েছে। ইউক্রেন ও রুশ কর্মকর্তারা রণক্ষেত্রে তুমুল লড়াইয়ের কথা জানিয়েছেন। রুশ সেনারা পিছু হটেনি এবং ইউক্রেনীয় সেনারা কোনও ভ‚খø পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। রবোটাইন নামের গ্রাম দখলে ইউক্রেনীয়দের কয়েক সপ্তাহের চেষ্টা এখনও সফল হয়নি।
রাশিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থা রিয়া নভোস্তি বলেছে, তাদের প্রতিনিধিরা গ্রামটি সফর করেছেন। গত দুই মাসে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর ব্যর্থ হামলায় গ্রামের কোনও একটি বাড়ি অক্ষত থাকেনি। এদিকে, পূর্ব ইউক্রেনের পোকরোভস্ক শহরে মস্কোর ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্রে আবাসিক ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। রুশ বাহিনীর এই বর্বরতায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৮ জন বেসামরিক নাগরিক। আহত আরও অনেকে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, একটি আবাসিক ভবনে হামলা চালিয়েছে মস্কো।
যুদ্ধের খরচ বাড়ছে, প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্বিগুণ করেছে রাশিয়া
ইউক্রেন যুদ্ধের খরচ বাড়তে থাকায় প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা এবছর প্রায় দ্বিগুণ করে ১০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি (৯৭,০০০০ রুবল) বাড়িয়েছে রাশিয়া। এই ব্যয় গোটা সরকারি খরচের এক-তৃতীয়াংশ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পর্যালোচনা করা একটি সরকারি নথিতে এমনটিই দেখা গেছে। রাশিয়ায় সুনির্দিষ্ট সরকারি খাতে ব্যয় সংক্রান্ত বাজেটের তথ্য প্রকাশ হয়নি। এর মধ্যেই প্রতিরক্ষায় খরচের এই পরিসংখ্যান ইউক্রেইন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যয়ের বহরই সামনে নিয়ে এসেছে। সরকারি নথি বলছে, ২০২৩ সালের কেবল প্রথমার্ধেই রাশিয়া প্রতিরক্ষায় ১২ শতাংশ বা ৬০ হাজার কোটি রুবল বাড়তি খরচ করেছে। যা প্রতিরক্ষায় এবছরের ব্যয়ের মূল লক্ষ্যমাত্রা ৪,৯৮০০০ কোটি রুবলের চেয়ে বেশি।
২০২৩ সালের প্রথম ছয়মাসে প্রতিরক্ষায় রাশিয়ার খরচ হয়েছে ৫,৫৯০০০ কোটি রুবল। যা এই সময়ে ব্যয় হওয়া মোট ১৪৯৭,০০০ কোটি রুবলের ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ। রাশিয়ার বাজেট পরিকল্পনায় জাতীয় প্রতিরক্ষায় মোট ৭১ দশমিক ১ শতাংশ তহবিল ব্যয় ধরা হয়েছে। তবে এই খরচের বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে রাশিয়ার সরকার কিংবা অর্থমন্ত্রণালয় থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৯ আগস্ট ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা
সামরিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিস্ময়
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তি আলোচনার পথ থমকে দাঁড়ালেও লড়াই কিন্তু থেমে নেই। বিশ্লেষকদের মতে, লড়াই করতে গিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে রাশিয়ার সামরিক ভাøারে বেশ ভালো টান পড়েছে। প্রতিদিন শত শত রুশ সেনা হতাহত হচ্ছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত যুদ্ধের যে গতিপ্রকৃতি সেটাকে অচলাবস্থা বলা চলে। এখন পর্যন্ত এ যুদ্ধ সামরিক, ক‚টনৈতিক ও কৌশলগত অনেক বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। লড়াইয়ের প্রতি ইউক্রেনীয় বাহিনীর দৃঢ়সংকল্প এবং কিয়েভের প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকার সমর্থন একদিকে মস্কোকে বিস্মিত করেছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমারা যে নিষেধাজ্ঞার কূটনীতি প্রয়োগ করেছে, তা বাস্তবায়নের পথে চীন, ইন্ডিয়া ও আফ্রিকার অনেকগুলো দেশ অন্তরায় হয়েছে। কিয়েভে সরকার পরিবর্তনের যে লক্ষ্য প্রথম দিকে মস্কো নিয়েছিল, সেই কৌশলগত অবস্থান তাদের পাল্টাতে হয়েছে। ইউক্রেন রাশিয়ার অনেকগুলো শক্ত ঘাঁটি পুনর্দখলে নিয়েছে।
ঘটনাপ্রবাহ একটা যুদ্ধবিরতির পথ খুলে দিতে পারে। কালক্রমে সেটা সত্যিকারের শান্তি আলোচনায় সুযোগ সামনে নিয়ে আসতে পারে।
ইউক্রেন মনে করছে, বিজয় হলো তাদের পুরো ভূখন্ড রাশিয়ার কবজা থেকে মুক্ত করা। যুদ্ধাপরাধের দায়ে রাশিয়াকে বিচার ও মস্কোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা। পরাজয়টা যদি অনেক বড় হয়, তাহলে রাশিয়ায় রাজনৈতিক অরাজকতা সৃষ্টি হবে। তাতে করে দেশটির নেতৃত্ব ভেঙে পড়বে এবং মস্কোয় বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। এর ফলে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।
ইউডি/এজেএস

