আমেরিকায় চীনা কোম্পানির দেউলিয়াত্ব ঘোষণা: বিশ্ব অর্থনীতি কোন পথে?
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১৯ আগস্ট ২০২৩ । আপডেট ১৪:০০
করোনার ধাক্কা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল। করোনা মহামারির ধাক্কায় বিপর্যস্ত বিশ্ব বাণিজ্য। নিরবে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে ছোট ছোট কোম্পানিগুলো। সেই পথে রয়েছে বেশ কিছু বড় বড় কোম্পানি। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে চীনে আবাসন ব্যবসার দ্বিতীয় বৃহত্তম রিয়েল এস্টেট কোম্পানি এভারগ্র্যান্ড। তাতে বিশ্ব অর্থনীতি কোন পথে রয়েছে? এ নিয়ে আরাফাত রহমান’র প্রতিবেদন
মার্কিন আদালতে এভারগ্র্যান্ডের আবেদনের নেপথ্যে
চীনে আবাসন ব্যবসায় সঙ্কটের মধ্যে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম রিয়েল এস্টেট কোম্পানি এভারগ্র্যান্ড আমেরিকায় নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। বিবিসি জানিয়েছে, এ সঙ্কট থেকে উত্তরণে গত বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কের একটি আদালতে সুরক্ষার আবেদন করেছে এই চীনা কোম্পানি। মার্কিন আইনে দেউলিয়া হওয়া থেকে সুরক্ষা পেলে ঋণে জর্জরিত এভারগ্র্যান্ড আমেরিকায় তাদের সম্পদ রক্ষা করতে পারবে। চ্যাপ্টার-ফিফটিন নামে আইনের এক অধ্যায়ের মাধ্যমে কোন বিদেশি কোম্পানির মার্কিন সম্পদকে রক্ষা করা হয় যাতে কোম্পানিটি তার ঋণ পরিশোধের বিষয়ে ঋণদাতাদের সাথে আলোচনা করতে পারে।
দুর্দশা থেকে উদ্ধার পেতে আরও কয়েক বিলিয়ন ডলার ঋণের জন্য ঋণদাতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এভারগ্র্যান্ড। চীনা এই রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ২০২১ সালে ঋণ খেলাপি হলে বিশ্বজুড়ে আর্থিক বাজারে তার ধাক্কা লাগে। তখন থেকেই ঋণ পুনর্গঠনের জন্য আলোচনা চালিয়ে আসছে এভারগ্র্যান্ড। বিবিসি লিখেছে, এভারগ্র্যান্ডের ঋণের পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। আবাসন খাতে বিশ্বে আর কোনো কোম্পানির এত বেশি ঋণ নেই। এভারগ্র্যান্ড গত মাসে জানিয়েছে, গত দুই বছরে সব মিলিয়ে ৮০ বিলিয়ন ডলার লোকসান হয়েছে তাদের। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০২২ সালের মার্চ থেকে এ কোম্পানির শেয়ার লেনদেন স্থগিত রাখা হয়েছে।
১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এভারগ্র্যান্ড চীনের ২৮০টি শহরে প্রায় এক হাজার আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন তৈরি করেছে৷ দেশটির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফ্ল্যাটের চাহিদা বাড়তে থাকায় এভারগ্র্যান্ডের মত কোম্পানিগুলোর ব্যবসাও বাড়ছিল বেশ। এভাবে আবাসন ব্যবসা চীনের প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে৷ ২০২১ সালে দেশটির মোট আর্থিক লেনদেনের প্রায় ২৯ শতাংশ এই খাতেই হত। ক্রেতাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা আর ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই টাকায় ফ্ল্যাট তৈরি করত এভারগ্র্যান্ডের মত কোম্পানিগুলো।
করোনার ধাক্কা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল
করোনার ধাক্কা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল। করোনা মহামারির ধাক্কায় বিপর্যস্ত বিশ্ব বাণিজ্য। নিরবে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে ছোট ছোট কোম্পানিগুলো। এমনকি অনেক বড় প্রতিষ্ঠানও নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করছে। বিশ্বব্যাপী বহু কোম্পানি কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ব এখনও এই করোনা সংকটের সামাল দিয়ে উঠতে পারেনি। পুরো পরিস্থিতি অনুধাবন আর আসল ধাক্কাটি সম্ভবত টের পাওয়া যাবে আসন্ন দিনগুলোতে। অনেক জায়গাতেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো দুয়ার এখনও বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে কত প্রতিষ্ঠানে চিরতরে হারিয়ে যাবে আর কতগুলো শেষ পর্যন্ত ফিরবে তা অনিশ্চিত। তারপরও ইতিমধ্যে অনেক বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ভিক্টোরিয়া সিক্রেট, জারা, জেসিপেনি, নাইকি, শ্যানেল ও রোলেক্স-এর মতো বিশ্বখ্যাত সব ব্রান্ড।‘ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট’ একটি আমেরিকাভিত্তিক নারীদের পোষাক, ল্যানজারি, ও সৌন্দর্যবর্ধনকারী পণ্য নির্মাতা, বিপণন, ও বিক্রয় প্রতিষ্ঠান। বিশ্বখ্যাত এই প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া ঘোষণা করে।
ছোট ছোট কোম্পানীগুলো রয়েছে বেশ বিপদে। করোনার কারণে সবচেয়ে বড় লোকসান পড়েছে খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠানগুলো। আমেরিকার ফ্যাশন পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান জে ক্রু নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। হংকং এবং জার্মান ভিত্তিক ফ্যাশন পণ্য বিক্রেতা এসপ্রি বলেছেন, এশিয়া থেকে সব স্টোর তারা গুটিয়ে নিবে। অনলাইন বেচাকেনা জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় কোভিড-১৯ এর ধাক্কা লাগার আগে থেকেই অবশ্য এই কোম্পানিগুলো অস্তিত্ব সংকটে ভুগছিল। মহামারি তা আরো ত্বরান্বিত করছে মাত্র।
এভারগ্র্যান্ড সংকট: চীনের আর্থিক ব্যবস্থার বড় পরীক্ষা
চীন ২০২০ সালে আবাসন খাতের ঋণের জন্য নতুন এক আইন করার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ‘থ্রি রেড লাইনস’ নামের ওই আইনে প্রপার্টি ডেভেলপারদের ঋণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত আরোপ করা হয়। ফলে আগের মত চাইলেই ঋণ পাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আর তাতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে এভারগ্র্যান্ডের মত কোম্পানিগুলো, ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে যাওয়ায় তাদের বড় প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ করা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। চীনের আরেক বড় রিয়েল এস্টেট কোম্পানি কান্ট্রি গার্ডেন গত সপ্তাহে জানিয়েছে, বছরের প্রথম ছয় মাসে তাদের লোকসানের পরিমাণ সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ঋণ পরিশোধে খেলাপি হওয়ার পর এভারগ্রান্ডে তার ঋণদাতাদের সাথে চুক্তি নিয়ে আলোচনার কাজ আবার শুরু করছে। এই গ্রæপের শুধু রিয়েল এস্টেট খাতেরই মোট আনুমানিক ঋণ ছিল ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ ঋণগ্রস্ত প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। এভারগ্রান্ডে গত মাসেই প্রকাশ করেছে যে শুধুমাত্র গত দু’বছরেই কোম্পানিটির ৫৮১.৯ বিলিয়ন ইউয়ান (৮০ বিলিয়ন ডলার) লোকসান হয়েছে। চীনের প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি আবাসন ব্যবসা৷ দেশটির মোট আর্থিক লেনদেনের প্রায় ২৯ শতাংশ হয়ে থাকে এই খাতে৷

এভারগ্র্যান্ড
লন্ডনভিত্তিক অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক উইলিয়ামস বলছেন, এভারগ্র্যান্ড যদি দেউলিয়া হয়ে যায় তাহলে গত কয়েক বছরের মধ্যে সেটা হবে চীনের আর্থিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা৷ বিনিয়োগকারীরা আশংকা করছেন, এভারগ্র্যান্ড দেউলিয়া হলে তার প্রভাব অন্য ডেভেলপারদের উপর পড়তে পারে৷ এছাড়া চীনের ব্যাংক ব্যবস্থাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে৷ আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মুডি’স অ্যানালিটিকসের স্টিভেন কখরান বলেছেন, এই সমস্যার মূলে রয়েছে অসমাপ্ত প্রকল্পগুলি সম্পূর্ণ করা। কারণ এর মাধ্যমে অন্তত কিছু হলেও অর্থায়ন পাওয়া সম্ভব হবে। রিয়েল এস্টেট খাতে অনেক ঘর-বাড়ি নির্মাণের আগেই বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু কোন কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকলে, ক্রেতারাও বন্ধকী অর্থ জমা করা থামিয়ে দেন। ফলে এটা রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের আয়ের ওপর আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করে, ব্যাখ্যা করছিলেন তিনি। শুধু এভারগ্রান্ডেই না, গত সপ্তাহে আরেকটি বৃহদায়তন চীনা রিয়েল এস্টেট কোম্পানি কান্ট্রি গার্ডেনও সতর্ক করেছে যে বর্তমান অর্থ বছরের প্রথম ছয় মাসে তাদের ৭.৬ বিলিয়ন ডলার লোকসান হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছে। নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলো শেষ করতে বিনিয়োগদাতা খুঁজে পেতে চীনের রিয়েল এস্টেট খাতের আরও কিছু বড় কোম্পানি এখন রীতিমতো সংগ্রাম করছে।
আমেরিকায় ব্যাংক দেউলিয়া: বিশ্বব্যাপী মন্দার বড় উদাহরণ
চলতি বছরের মার্চে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে দেউলিয়া হয়েছে আমেরিকার দুটি ব্যাংক। সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের (এসভিবি) পর নিউ ইয়র্কভিত্তিক সিগনেচার ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। এসভিবির মতো সিগনেচার ব্যাংকের গচ্ছিত অর্থ এবং নথিপত্র অধিগ্রহণ করে আমেরিকার দ্য ফেডারেল ডিপোজিট ইনসিওরেন্স করপোরেশন (এফডিআইসি)। সিগনেচার ব্যাংকের সম্পদের মূল্যমান ১১০ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। বছরের শেষদিকে ব্যাংকটির আমানত ছিল ৮৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।
২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দার পর আমেরিকার ব্যাংকের বন্ধ হওয়াকে এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বলা হচ্ছে। প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপগুলোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অল্প সময়ে বিপুল অর্থ সঞ্চয় করেছিল সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক। আমেরিকার বন্ডেও এই ব্যাংক বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতির হার কমাতে ফেডারেল রিজার্ভ গত বছর সুদের হার বাড়াতে শুরু করে, যার ফলে বন্ডের দর কমে যায়। স্টার্টআপগুলোও করোনা মহামারির পর থেকে ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে। এসব কারণে ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা তাদের সঞ্চিত অর্থ তুলে নিতে শুরু করে। গ্রাহকদের অর্থের জোগান দিতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নিজেদের শেয়ার বিক্রি করতে হয়। কিছু দিন আগেই সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের পক্ষ থেকে যে পরিসংখ্যান দেখানো হয়েছিল, তাতে বলা হয় ব্যাংকটি গত কয়েক দিনে প্রায় ২০০ কোটি ডলার হারিয়েছে। ফলে ব্যাংকের বিপর্যয় এক প্রকার নিশ্চিত হয়ে পড়ে। একই পরিণতি হলো সিগনেচার ব্যাংকেরও।
চীনা অর্থনীতি ফের চাঙ্গা করার সম্ভাবনা হুমকির মুখে
চলতি মাসের শুরুর দিকে চীন সরকার জানিয়েছে যে সে দেশের অর্থনীতিতে ডিফ্লেশন অর্থাৎ মুদ্রা সঙ্কোচন শুরু হয়েছে এবং দু’বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো জুলাই মাসে ভোক্তা পণ্যের দাম কমেছে। অর্থনীতির দুর্বল প্রবৃদ্ধির অর্থ হলো চীনা জিনিসপত্রের দাম ক্রমশ কমছে। বিশ্বব্যাপী চীনা পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় আমদানি ও রপ্তানিও তীব্রভাবে কমেছে। ফলে কোভিড মহামারির পর বিশ্বের এই দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে আবার চাঙ্গা করার সম্ভাবনা এখন হুমকির মুখে পড়েছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১৯ আগস্ট ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা
সরকারি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত জুলাই মাসে চীনা রপ্তানির পরিমাণ এক বছর আগের তুলনায় ১৪.৫% কমেছে, আর আমদানি কমেছে ১২.৪%। এ সপ্তাহের শুরুতে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার লক্ষ্যে চীনা কেন্দ্রীয় ব্যাংক হঠাৎ করেই গুরুত্বপূর্ণ সব খাতে সুদের হার তিন মাসে দ্বিতীয়বারের মতো কমিয়ে দেয়ার ঘোষণা করেছে। তবে দেশটির অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চীন ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। দেশের বাজারকে আপাতত মন্দা মনে হলেও কম মূল্যে পণ্য নিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের আরও লাভের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল ও সৌদি থেকে ইউয়ানে জ্বালানি কিনে পরবর্তী সময়ে বড় অর্থনৈতিক সূচকের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে চীন।
ইউডি/এজেএস

