নির্বাচনোত্তর রাজনীতিতে উত্তাপ: জাপার নাটক,ইনুর ক্ষোভ, বিভত্ত কূটনীতি

নির্বাচনোত্তর রাজনীতিতে উত্তাপ: জাপার নাটক,ইনুর ক্ষোভ, বিভত্ত কূটনীতি

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৩:০০

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলেও রাজনীতিতে এর উত্তাপ চলমান। দেশে-বিদেশে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এ নিয়ে আসাদ এফ রহমান’র প্রতিবদেন

অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনে সরকারে স্বস্তি: শান্তিপূর্ণভাবে গত রবিবার শেষ হয়েছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২২২ আসনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন এই নির্বাচন দেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। নির্বাচনের আগে জনমনে যেই উদ্বেগ দেখা দিয়েছিলো তা নির্বাচনের দিনের শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে স্বস্তি ফিরেছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই রাশিয়া-ইন্ডিয়া-চীনসহ ১১ দেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। মঙ্গলবার জাপান,কমনওয়েলথ, ওআইসিভুক্ত দেশগুলোসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতগণ তাদের সরকারপ্রধানদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তবে, আমেরিকা, ব্রিটেন নির্বাচন নিয়ে তাদের বিবৃতিতে নির্বাচন পূর্ব সহিংসতার নিন্দা ও সকল দলের অংশগ্রহণ না করায় হতাশা প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ বলছে তারা নজরে রাখছে। এদিকে, জাতীয় পার্টি নির্বাচন পরবর্তী নতুন নাটক শুরু করেছে, তাদের নবনির্বাচিত ১১ জন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ দিনভর ছিলো টালবাহানা। অন্যদিকে নিজ আসনে হেরে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে সরকার সব বিষয়ে কৌশলি পরিচয় দিচ্ছেন। আজ নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদেও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে, আর আগামীকাল মন্ত্রীসভার শপথ। নতুন মন্ত্রীসভায় কারা আসছেন তা নিয়ে চলছে আলোচনা-গুঞ্জন।

জাতীয় পার্টির নাটক: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পাওয়া জাতীয় পার্টির ১১ জন সংসদ সদস্য আজ বুধবারই শপথ নেবেন বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে দলটি জানিয়েছিল তাদের এমপিরা বুধবার শপথ নেবেন না। শপথ নেয়া ও নির্বাচনের ফলাফলের প্রতিক্রিয়ায় দিনভরই নাটক কওে দলটি। মঙ্গলবার দিনের প্রথম ভাগে শপথ গ্রহণের বিষয়ে জাতীয় পার্টি মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু জানান, বুধবারই তাদের নির্বাচিত সদস্যগণ শপথ নেবেন না।কয়েকদিন পর নেবে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের দিনের শুরুতে বলেছিলেন, জাতীয় পার্টিকে ঘিরে নানা ষড়যন্ত্র চলছে। কিন্তু মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি জানান, জনগণের অনেক আশা-আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশা পূরণে জাতীয় পার্টি সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণ করবে। আমরা যেহেতু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি, তাই এই মুহূর্তে শপথ না নিয়ে পিছু হটব না। সংসদে গিয়ে জনগণের পক্ষে কথা বলব। তিনি বলেন, নির্বাচন সঠিক হয়নি। আমাদের প্রার্থীরা জয়ী হতে পারত, তাদের জোর করে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এটি না ঘটে আমরা সেই চেষ্টা করব। এ নির্বাচন ছিল সরকার নিয়ন্ত্রিত। এখানে আমাদের প্রার্থীদের পক্ষে যে জনসমর্থন রয়েছে তা প্রকাশ হতে দেওয়া হয়নি। আমাদের সংগঠন এখনো শক্তিশালী রয়েছে। আমরা সংসদে যেতে চাই। জাতীয় রাজনীতিকে যদি আমাদের কিছু দিতে হয়, তাহলে আমাদের সংসদে যেতে হবে। তাহলে আমরা জনগণের কাছে পৌঁছতে পারব, দাবি-দাওয়া আদায় করতে পারব।
সংসদে জাতীয় পার্টি বিরোধী দল হবে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি দীর্ঘদিন সংসদ-সদস্য ছিলাম। সংসদে যারা মেজরিটি পায় তারা সরকারি দল হয়। এ নির্বাচনে বেশি আসন পাওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করবে। এখন বিরোধী দল হিসাবে জাতীয় পার্টি ছাড়া অন্য কোনো দল নেই। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জাতীয় পার্টি সংসদের বিরোধী দল। স্বতন্ত্রদের নিয়ে কোনো সময় বিরোধী দল হয়েছে এমন নজির নেই। তারা আবার সরকারি দলেরই অংশ। তাই এটি হলে বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান হবে না। এদিকে, জাপার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার শপথ নেবেন জাতীয় পার্টির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। পূর্ব ঘোষিত ১১ জানুয়ারির সভা বাতিল করা হয়েছে। আগামীকাল সকাল ১০টার মধ্যে জাতীয় সংসদ ভবনের বিরোধীদলীয় উপনেতার কার্যালয়ে জাতীয় পার্টির নবনির্বাচিত সব সংসদ সদস্যদের উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করা হলো। গত দুই সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসা জাতীয় পার্টি শেষ পর্যন্ত ১১ আসনে জয় পেয়েছে।জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচিতরা হলেন- জিএম কাদের (রংপুর-৩), আনিসুল ইসলাম মাহমুদ (চট্টগ্রাম-৫), এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার (পটুয়াখালী-১), মজিবুল হক চুন্নু (কিশোরগঞ্জ-৩), হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ (ঠাকুরগাঁও-৩), এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান (কুড়িগ্রাম-১), শরীফুল ইসলাম জিন্নাহ (বগুড়া-২), মো. আশরাফুজ্জামান (সাতক্ষীরা-২), গোলাম কিবরিয়া টিপু (বরিশাল-৩), এ কে এম সেলিম ওসমান (নারায়ণগঞ্জ-৫) ও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (ফেনী-৩)।

নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার নিন্দা আমেরিকার: বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচন ঘিরে আগের মাসগুলোতে সহিংসতার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে আমেরিকা। এসব ঘটনার নির্ভরযোগ্য তদন্ত করে দোষীদের জবাবদিহীতার আওতায় আনার আহ্বানও জানিয়েছে দেশটি। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার এক বিবৃতিতে বলেছেন, আমেরিকা বাংলাদেশের জনগণ ও গণতন্ত্রের প্রতি তাদের আকাক্সক্ষাকে সমর্থন করে। আমেরিকা দেখেছে, ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বেশিরভাগ আসনেই জয়লাভ করেছে। আমেরিকা বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলের হাজারো সদস্যদের গ্রেপ্তার ও নির্বাচনের অনিয়মের খবরে উদ্বিগ্ন। অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে আমেরিকা একমত যে, এই নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু হয়নি এবং সব দল এতে অংশ না নেওয়ায় আমরা হতাশ। ম্যাথু মিলারের বিবৃতিতে বলা হয়, সব দলকে আমরা সহিংসতা পরিহার করার আহ্বান জানাই। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলছে, বাংলাদেশে মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজের প্রতি অব্যাহত সমর্থন, দুই দেশের জনগণের মধ্যে ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের বন্ধন আরও গভীর করতে আমেরিকা বাংলাদেশের সঙ্গে একটি অবাধ ও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

মতভিন্নতা দূর করার আহ্বান ব্রিটেনের: নির্বাচনে সব দল অংশ না নেওয়ায় মানুষের ভোট দেওয়ার যথেষ্ট বিকল্প ছিল না বলেও অভিমত ব্রিটেনের। ব্রিটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে দেশটির মত প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ব্রিটেনে ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে একটি টেকসই রাজনৈতিক সমঝোতা ও সুশীল সমাজের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। এছাড়া বাংলাদেশে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি মতভিন্নতা দূর করার আহ্বান জানায় ব্রিটেন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক নির্বাচন নির্ভর করে গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও সুষ্ঠু প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর। মানবাধিকার, আইনের শাসন ও যথাযথ প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অপরিহার্য উপাদান। নির্বাচনের সময় এসব মানদণ্ড যথাযথভাবে মানা হয়নি। এছাড়া নির্বাচনে সব দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি বলে বাংলাদেশের মানুষের ভোট দেওয়ার যথেষ্ট বিকল্প ব্যবস্থা ছিল না। বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচন সামনে রেখে এবং নির্বাচনের প্রচার চলাকালে সহিংসতা ও ভয়ভীতি দেখানোর কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানায় ব্রিটেন। রাজনীতিতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কোনো স্থান নেই।

পরিস্থিতিতে নজর রাখছে জাতিসংঘ: বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার পাশাপাশি ভোটের আগে-পরের সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। মহাসচিবের সহযোগী মুখপাত্র ফ্লোরেন্সিয়া সোতো নিনো এ কথা বলেন।
মুখপাত্র বলেন, আমরা বাংলাদেশের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি। সেখানে যা ঘটছে, তার দিকে মহাসচিবেরও নজর আছে। বিরোধী দল যে ভোট বয়কট করেছে, তা তিনি অবগত আছেন-আমি বলতে চাই, ভিন্নমত ও সমালোচনাকে দমন এবং বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেপ্তারের অভিযোগের বিষয়ে। তিনি স্পষ্টতই ভোটের আগে-পরের সহিংস ঘটনায় উদ্বিগ্ন এবং তিনি সহিংসতা পরিহার এবং মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে সব দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গণতন্ত্র সুসংহত ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য এটি জরুরি।”
ফ্লোরেন্সিয়া বলেন, আমরা যেটা চাইছি সেখানে সরকার যা করছেৃসেটা আর চলবে না। কিন্তু সেখানে তাদের একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করাটা জরুরি। সব ধরনের সহিংসতা পরিহার এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

পর্যবেক্ষকদের পজিটিভ মন্তব্যের বিষয়ে অবগত নয় আমেরিকা-ব্রিটেন
নির্বাচন নিয়ে আমেরিকা ও ব্রিটেনের বিবৃতির প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আমি এখানে হিট করে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমি মনে করি, এই আমেরিকার, কমনওয়েলথের, ওআইসির প্রতিনিধিরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ছিলেন। আমার মনে হয়, যারা ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছে, তারা তাদের দেশ থেকে আসা পর্যবেক্ষকদের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে দেওয়া পজিটিভ মন্তব্যের বিষয়ে অবগত নয়। তিনি আরও বলেন, দেশের জনগণ বিপুলভাবে ভোট দিয়ে প্রমাণ করেছেন, যারা নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছে, ভোটাররা তাদের বর্জন করেছেন। বিএনপির জনবিচ্ছিন্নতা মাত্রাতিরিক্ত। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে বিএনপি ও জামায়াতের যে তথাকথিত আন্দোলন, তাতে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিচ্ছেন না তারা। দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে ওবায়দুল কাদের বলেন, আপনাদের ঠান্ডা মাথায় চলতে হবে। কোথাও সহিংসতা সংঘাতে জড়ানো যাবে না। ২০২৪ সালে নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনেক দূর এগিয়ে নিতে চাই।

সরকার এসব নিয়ে ভাবছে না: আমেরিকা ও ব্রিটেন যে বিবৃতি দিয়েছে, তা নিয়ে সরকার ভাবছে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। মঙ্গলবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠান শেষে তাদের বিবৃতি নিয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ওগুলো নিয়ে আমাদের চিন্তা নাই। তিনি বলেন, আমাদের জনগণ রায় দিয়েছে এবং অন্যান্য দেশ আমাদের পক্ষেই; যারা এসেছে সবাই বলেছে যে, দেশে অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য এবং সহিংসতামুক্ত নির্বাচন হয়েছে। এবং নির্বাচন কমিশনকে সবাই ধন্যবাদও দিয়েছে। সেটাই এবং আমরা এটা নিয়ে অনেক খুশি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশে কি হচ্ছে না হচ্ছে আপনারা ভালো জানেন। আমার থেকে ভালো জানেন। আমরা খুব খুশি যে আমরা অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, সংঘাতবিহীন নির্বাচন আয়োজন করেছি। জনগণ রায় দিয়েছে। এটাই যথেষ্ট। আমাদের আর কিছু দরকার নাই, জনগণ রায় দিয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। গত ৫২ বছরে বাংলাদেশ অনেক সফলতা অর্জন করেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এটা সম্ভব হয়েছে আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর অংশীদারত্ব এবং সহযোগিতার কারণে। এই বছর এবং তারপরে আরও বেশি সহযোগিতার প্রতীক্ষা আমরা করছি।

আমেরিকা-ব্রিটেনের মন্তব্যে গুরুত্ব দিচ্ছে না ইসি: দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর। তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের মন্তব্যে গুরুত্ব দিচ্ছে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোট নিয়ে কে কী বলছে তা দেখা বা শোনার মতো সময় হয়নি। আর সেটা কমিশনের কাজের মধ্যেও পড়ে না। মঙ্গলবার আগারগাঁওয়ে ইসি ভবনের নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন ইসি মো. আলমগীর। আমেরিকা-ব্রিটেনের প্রতিক্রিয়া নিয়ে ইসির মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন বলেন, আমাদের বক্তব্য সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন। এর বাইরে আমার কোনো বক্তব্য নেই। ইসি আলমগীর বলেন, আমরা আমাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছি। আমাদের যা করার সেভাবেই করেছি। বিধিসম্মতভাবে করেছি, নিয়মতান্ত্রিকভাবে সবকিছু হয়েছে। আমরা মনে করি, যা যা করার তা সঠিকভাবেই করেছি।

ইনুর ক্ষোভ সুষ্ঠু হয়েছে ৯৫% জায়গায়, সমস্যা ৫% : আমি জনগণের ভোটে নয়, কারচুপির ভোটে পরাজিত হয়েছি, বলে মন্তব্য করেছেন কুষ্টিয়া-২ আসনে পরাজিত নৌকা প্রতীকের হেভিওয়েট প্রার্থী জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। মঙ্গলবার (০৯ জানুয়ারি) কুষ্টিয়ার মিরপুরে উপজেলা জাসদ কার্যালয়ে ভোট পরবর্তী দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবারে জাসদ সভাপতি এ কথা বলেন। ইনু বলেন, সারা দেশে ভোট অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো আমার এলাকা কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মস্তান বাহিনি ভোটের সাত দিন আগে থেকে যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, সেটা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। ভোটের দিন ১৬১টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৮টি কেন্দ্রে অস্বাভাবিক ভোট প্রদান লক্ষ করা গেছে। যা কারচুপির মাধ্যমে করা হয়েছে। প্রতিবাদ করার পরও এবং উপর্যুপরি এ বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আনার পরও কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইনু গণমাধ্যমকে বলেন, ভোটে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটা বিরাট অংশ প্রশাসনের সহযোগিতায় নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করেছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদেরও একাংশ নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করেছে, যা দুঃখজনক। তবে সামগ্রিকভাবে ৯৫ শতাংশ জায়গায় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে, কিছু সমস্যা হয়েছে ৫ শতাংশ জায়গায়। তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি, কুষ্টিয়া-২ আসনে আমি জনগণের ভোটে নয়, কারচুপির ভোটে পরাজিত হয়েছি। আশা করি এটা সবাই তদন্ত করে দেখবেন এবং এর প্রতিকার ও বিহিত করবেন। জোট প্রসঙ্গে ইনু বলেন, নির্বাচনি ঘটনা নিয়ে জোটে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব পড়বে না। তবে নির্বাচন নিয়ে জোটের শরিকদের মধ্যে যে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক স্বৃষ্টি হয়েছে সেটা অবশ্যই নিস্পত্তি করতে হবে। একই সঙ্গে জোটের প্রার্থীর এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী স্বতন্ত্রপ্রার্থীর গুণ্ডাবাহিনীর যে আক্রমণ, হুমকি-ধমকি অত্যচার শুরু হয়েছে এটা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। তা না হলে জোটের অভ্যন্তরে সুষ্ঠু পরিবেশ থাকবে না।

রিজভীর দাবি বিজয় হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত ভোট বর্জনকারী জনতার: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট বর্জন করে দেশের সর্বস্তরের মানুষ আওয়ামী লীগকে লাল কার্ড দেখিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। মঙ্গলবার (০৯ জানুয়ারি) ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন রিজভী। রিজভী বলেছেন, ১৮ কোটি মানুষের দাবি এবং গণতান্ত্রিক বিশ্বের আহ্বান পরোয়া না করে পূর্ব নির্ধারিত ফলাফলের একদলীয় একতরফা ভোটার বর্জিত ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে মূলতঃ বিজয় হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত ভোট বর্জনকারী গণতন্ত্রকামী বীর জনতার। তিনি বলেন, এই দিনে ভোট বর্জন করে দেশের সর্বস্তরের মানুষ আওয়ামী লীগকে লাল কার্ড দেখিয়েছে।রিজভী আরও বলেন, ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে জনগণের অভাবনীয়-অভূতপূর্ব নীরব প্রতিবাদে একটি উদ্ভট, গণবর্জিত প্রহসনের প্রকাশ্য অটো ভোট ডাকাতির মঞ্চায়ণ দেখলো দেশবাসীসহ গোটা বিশ্বের মানুষ।
রিজভী বলেন, জাতিসংঘ, আমেরিকা, ব্রিটেনসহ গণতান্ত্রিক বিশ্ব এই অংশগ্রহনহীন ভোটার বিহীন একতরফা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি প্রদান করেছে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার এই প্রহসনমূলক নির্বাচন দেশকে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই অবৈধ সরকারকে জনগণ মানে না। আমি এই মুহূর্তে পাতানো গণবিরোধী ডামি নির্বাচন বাতিল করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার আহ্বান জানাচ্ছি। অন্যথায় জনগণের চলমান শান্তিপূর্ণ আন্দোলন আরও দুর্বার করে এই ডামি সরকারের পতন ঘটানো হবে।

নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে জল্পনা: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিনের মাথায় টানা চতুর্থবারের মত সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যরা আজ বুধবার (১০ জানুয়ারি) সকালে জাতীয় সংসদভবনে শপথ নেবেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১১ জানুয়ারি) বঙ্গভবনে হবে নতুন মস্ত্রিসভার শপথ। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব জয়নাল আবেদীন মঙ্গলবার (০৯ জানুয়ারি) গণমাধ্যমকে বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় নতুন মন্ত্রিসভার শপথ হবে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে আগের চার বারের মতো এবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাই দায়িত্ব নেবেন। তবে নতুন মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন তা নিয়ে চলছে আলোচনা। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে এ নিয়ে টেনশন, উত্তেজনার কমতি নেই। বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্র থেকে জানা গেছে, নতুন মন্ত্রিসভায় একাধিক পরিবর্তন আসতে পারে। এর মধ্যে প্রবীণ-তরুণদের সমন্বয়ও দেখা যেতে পারে। বর্তমান মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞ সদস্যরাও নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন। এছাড়াও দলের অভিজ্ঞ ও ত্যাগীদেরকে দেখা যেতে পারে নতুন মন্ত্রিসভায়। অনেকেই তদবির শুরু করেছেন বলেও জানা যায়। এবারের মন্ত্রিসভা কেমন হতে পারে, জানতে চাইলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী অনেক জ্ঞানী মানুষ। দেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা উনার ঠিক করা আছে। এটা উনি জানেন, কোথায় কাকে কখন নেওয়া দরকার। এটা প্রধানমন্ত্রী নিজেই ঠিক করেন। সারা পৃথিবীতেও এটিই নিয়ম। সূত্র থেকে জানা যায়, দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন কারা কারা থাকছেন নতুন মন্ত্রিসভায়। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, মন্ত্রিসভা গঠনের এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর। সংসদ সদস্যদের শপথ হওয়ার পর সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন করতে হবে। সেটি অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচিত হবেন। তিনি নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির কাছে জানাতে হয় সরকার গঠনের জন্য। এরপর তিনি যখন অনুমোদন দেন, তখন সরকার গঠন করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার গেজেট জারির পর তাদের শপথ পড়ানো হবে। এরপর সংসদ সদস্যরা বৈঠক করে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন করবেন। রাষ্ট্রপতি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন। প্রথমে প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পড়ানো হবে। এরপর নিয়োগপ্রাপ্ত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা শপথ নেবেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। শপথের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দপ্তর বণ্টন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। আর এর মধ্য দিয়েই নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হবে। মন্ত্রিসভা গঠন প্রসঙ্গে সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভায় একজন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, যিনি সংসদ সদস্য, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হবেন, রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেবেন। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে নির্ধারণ করবেন, সেভাবে অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন।

ইউডি/সুপ্ত/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading