নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে বিতর্ক ও আন্দোলন: পরিবর্তন নিয়ে সরকারের ভাবনা-বাস্তবতা ও ভিন্নমত

নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে বিতর্ক ও আন্দোলন: পরিবর্তন নিয়ে সরকারের ভাবনা-বাস্তবতা ও ভিন্নমত

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১১:০০

নতুন শিক্ষাক্রমের মধ্য দিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, যা নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সরকারের ভাবনা ও নতুন শিক্ষাক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে আশিকুর রহমান’র প্রতিবেদন

শিক্ষাব্যবস্থায় নতুনত্ব আলোচনা-সমালোচনা: শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও ব্যবহারিকের জ্ঞান অর্জনের উপর ওপর জোর দিয়ে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। কমানো হয়েছে পাঠ্যপুস্তকের পরিমাণ, বাতিল হচ্ছে সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি। গত বছর প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রমে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। চলতি শিক্ষাবর্ষে দ্বিতীয়, তৃতীয়, অষ্টম ও নবম শ্রেণি যুক্ত হয়েছে নতুন শিক্ষাক্রমের তালিকায়। ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণিতে, ২০২৬ সালে একাদশ শ্রেণিতে এবং ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণিতে ধাপে ধাপে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর কথা রয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রমে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা না রাখা, এসএসসির আগে পাবলিক পরীক্ষা না নেওয়া, নবম-দশম শ্রেণিতে বিভাগভিত্তিক বিভাজন তুলে দেওয়াসহ একগুচ্ছ পরিবর্তন আনা হয়েছে। চাপ কমাতে বছর শেষে সামষ্টিক মূল্যায়নের আগে শিক্ষাবর্ষ জুড়ে চলে শিখনকালীন মূল্যায়ন। বেশ কিছু বিষয়ে শিখনকালীন মূল্যায়ন হয় শতভাগ। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হলে শিক্ষার্থীরা কোচিং ও নোট-গাইড নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করে আসছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, পরীক্ষা ও মুখস্ত নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শেখার মাধ্যমে নতুন শিক্ষাক্রমে পাঠ প্রক্রিয়া হয়েছে আনন্দময়। তবে এই শিক্ষাক্রম নিয়ে রাস্তায় কর্মসূচি পালন ছাড়াও এর বিরোধীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন শিক্ষাক্রমের কাঁটাছেড়া করছেন। নানামুখী ট্রলের মুখে ‘অপপ্রচার ঠেকাতে’ আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করে সরকারি কর্তৃপক্ষকে বিজ্ঞপ্তি দিতে হচ্ছে। নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে সা¤প্রতিক তৎপরতাকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার’ হিসেবে দেখছেন সরকারের কর্মকর্তারা। তবে শিক্ষাক্রম বাতিলের আন্দোলনে থাকা সংগঠকরা বলছেন, গত এক বছর এর বাস্তবায়ন দেখে ‘সন্তানের শিক্ষাজীবন রক্ষায়’ তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছেন। নতুন শিক্ষাক্রমের ওপর ২০২২ থেকে ২০২৩ শিক্ষাবর্ষে চার লাখের মতো শিক্ষককে সাত দিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের’ (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম। সংবাদকে বলেন, ‘অষ্টম ও নবম শ্রেণীতেও নতুন শিক্ষাক্রমে পাঠদানের জন্য গত নভেম্বর-ডিসেম্বর চার লাখ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

আন্দোলনকারীদের যত অভিযোগ: নতুন শিক্ষাক্রমের বিরুদ্ধে দেশে যে আন্দোলন হচ্ছে, এর নেতৃত্বে রয়েছে সম্মিলিত শিক্ষা আন্দোলন। সম্মিলিত শিক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক রাখাল রাহার দাবি, তাদের সঙ্গে কোনো গোষ্ঠীর যোগসূত্র নেই। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতেই তারা লড়ছেন। এর সঙ্গে গাইড-বই ব্যবসায়ী বা কোচিং ব্যবসায়ীরা জড়িত নন। অভিভাবকদের এভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করাটা ঠিক না। আমরা ২০১৯ সাল থেকে কথা বলে আসছি এই শিক্ষাক্রম নিয়ে। রাখাল রাহা মনে করেন, কিছু পূর্বশর্ত পূরণ না করে কোনো শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের দিকে গেলে তা খারাপ হয়, বাংলাদেশে সেটাই হচ্ছে। কোনো শিক্ষাক্রমই শতভাগ পরিবর্তন করার কথা বলা হয় না, কিন্তু এখানে সবকিছুই ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। টিচিং-লার্নিং, মূল্যায়ন, পাবলিক পরীক্ষা সবকিছুই একেবারে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো স্মার্ট দেশও এতটা সাহস করে না। বিভাগ বিভাজন তুলে দেওয়ার উদাহরণ টেনে রাখাল রাহা বলেন, আমার সন্তান বিজ্ঞান পড়তে পারবে না। তার মানে একটা পুওর সায়েন্স, পুওর ম্যাথ নিয়ে পড়তে হবে। নতুন শিক্ষাক্রমবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে নোট-গাইড ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক নেই দাবি করে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সহ-সভাপতি শ্যামল পাল বলেন, এত এত শিক্ষার্থী এর সঙ্গে জড়িত, সেখানে ৫০-৬০ জন প্রকাশক কি করবে? প্রকাশকদের তো অন্য ব্যবসা আছে, নোট-গাইড বের করা তাদের প্রধান ব্যবসা নয়।

শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা কী চাচ্ছেন?: শিক্ষার্থীদের মতে, নতুন শিক্ষাক্রমে শ্রেণিকক্ষেই তার সব পড়া হয়ে যাচ্ছে। আগের চেয়ে পড়ালেখা এখন একদম আলাদা। বাসায় প্রেশার নেই। বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ করে কাজ ভালো লাগছে। আলাদা শিক্ষক, গাইড বইয়ের প্রয়োজন হচ্ছে না। অভিভাবকগণ মনে করেন, আগের মত পরীক্ষা থাকলে শিক্ষার্থীরা বাসায় আরও পড়ত। ঢাকার মালিবাগের ফয়জুর রহমান আইডিয়াল স্কুলের এক অভিভাবক জানালেন, আগে বছরে তিন থেকে চার মাস বাসায় শিক্ষক রেখে মেয়েকে পড়াতে হত। এখন হাতে-কলমে শিখছে। এ বছর আর আলাদা করে পড়াতে হয়নি। বাসায় নানা ধরনের খাতায় আঁকছে, ভালোই মনে হচ্ছে।রাজধানীর নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুমনা বিশ্বাস বলছেন, নতুন শিক্ষাক্রমে তাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা আনন্দে স্কুলে আসছে, পড়ছে। তার মতে, শিক্ষাক্রমের ধরন এমনই হওয়া উচিত। এখানে কোনো ত্রæটি-বিচ্যুতি থাকলেও তা ঠিক হয়ে যাবে। প্রক্রিয়াটা একদম ঠিক আছে। ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে। অল্প অল্প করে অগ্রগতিটা দেখতে পারব। শিশুরা চাপ বোধ করবে না। এটা সারা পৃথিবীতেই স্বীকৃত পদ্ধতি। আমরা দেখছি আমাদের শিশুরা ভালো আছে। তাদের টেনশন করতে হচ্ছে না, ফেল করে বিমর্ষ হয়ে কান্নাকাটি করা লাগছে না। যারা শিক্ষাক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন- তাদের প্রতি এই শিক্ষকের প্রশ্ন, শিশুরা যে আগে ফেল করে আত্মহত্যা করত, সেটা তারা সমর্থন করেন কিনা। হাতে-কলমে বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য, মাঠের আয়তন জানার জন্য শিশু যখন টেপ-ক্যালকুলেটর নিয়ে মাঠে যাবে, তখন যারা জীবনমুখী শিক্ষার কথা বলেন, তারাই আবার আজেবাজে কথা বলা শুরু করবেন।

মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল

সঠিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকার পিছপা হবে না: সমালোচনার ভয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন থেকে সরকার পিছপা হবে না বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তিনি বলেছেন, ভালো কিছু করার লক্ষ্যে সরকার দৃঢ়তার সঙ্গে কিছু বিষয়ে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নেবে। শুক্রবার (১৯ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে বিভিন্ন ধরণের সমালোচনা, অপপ্রচার ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তার করণীয় জানতে চাইলে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন নতুন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের চ্যালেঞ্জটা একটু কমপ্লেক্স। সরকারে থাকলে চ্যালেঞ্জ একটু কমপ্লেক্স হয়। আর হ্যাঁ, কিছু সমালোচনা হবে। সেই সমালোচনা নেওয়ার সক্ষমতা রাজনীতিবিদদের থাকতে হবে। সক্ষমতা আমাদের আছে। আমরা সেটা পারব। শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, আমাদেরকে যে সিদ্ধান্তগুলো শিক্ষাবিদদের সাথে, বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করে নেয়া হয়েছে, শুধুমাত্র সমালোচিত হব এই ভয়ে যে সিদ্ধান্ত যথার্থ এবং সঠিক সেটা নিব না, তা হতে দেওয়া যায় না। দৃঢ়ভাবে কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন আমাদের অবশ্যই করতে হবে। এটার কোনো বিকল্প নেই।
নওফেল বলেন, একটা চ্যালেঞ্জের বিষয় হচ্ছে আসলে, নেগেটিভ জিনিস ভাইরাল হয় বেশি। এটা একটা। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, নিবন্ধিত এবং আইনত স্বীকৃত গণমাধ্যম যেভাবে একটা বিষয় যাচাই-বাছাই অনুসন্ধান করে গণমাধ্যমে দেয়, সেভাবে কিন্তু সাধারণ মানুষ, যারা অপপ্রচার করে তারা বা আমরা যারা ব্যবহারকারী তারাও দিই না। দেখা যায়, নেগেটিভ প্রচারণার প্রতি আমাদের দৃষ্টি বেশি থাকে। নিজেরাও অনেক সময় অজান্তে নেগেটিভ প্রচারণাতে আমরা জড়িয়ে পড়ি। সেটা কাউন্টার করাটা সারা বিশ্বব্যাপী একটা চ্যালেঞ্জ।শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তার কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে নওফেল বলেন, কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্ব›দ্বীতা, ক্ষমতার দম্ভ, অহংকার- এ ধরণের কাজে আমি বিশ্বাস করি না। আমার বাবা চট্টলাবীর এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী সাড়ে ১৬ বছর চট্টগ্রামের মেয়র ছিলেন। আমি দেখেছি কিভাবে তিনি জনসেবা দিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় তিনি ছিলেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছেন। রাজনৈতিক ক্ষমতা, আমি যেহেতু শৈশব থেকে দেখে এসেছি সেগুলোর প্রতি তাই আমার কোনো লোভ লালসা নেই।

অর্থনীতির সঙ্গে শিক্ষার সম্পৃক্ততা বাড়াতে জোর: এই সরকারকে জনসেবায় কিভাবে আরো বেশি করে কাজে লাগানো যায় সেই লক্ষ্যে কাজ করবেন জানিয়ে নওফেল বলেন, বিশেষ করে তরুণ সমাজকে কিভাবে আরো কর্মমুখী করতে পারি, শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো বেশি ইন্ডাস্ট্রির সাথে, অর্থনৈতিক সম্পৃক্ত করতে পারি সেলক্ষ্যে আমরা কাজ করব। নওফেল বলেন, আমাদের নেতৃবৃন্দ এখানে যারা আছেন। যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ এবং প্রগতিশীল অন্যান্য রাজনৈতিক দলে সমূহের যারা আছেন, তাদের সবার সাথে আলোচনা করে একটা ইকোনমিক ইকো-সিস্টেম আমরা যাতে করতে পারি। ইকোনমির সাথে এডুকেশনের একটা সম্পর্ক, সেটা যাতে আমরা সৃষ্টি করতে পারি। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে চাই। আমাদের সন্তানরা শুধুমাত্র ভবিষ্যতের আশায় বিদেশে পাড়ি দেবেন এবং বিদেশে যাওয়া ছাড়া যদি তাদের আর কোনো গতি না থাকে তাহলে বুঝে নিতে হবে আমরা যারা চট্টগ্রামে আছি এটা আমাদের ব্যর্থতা। এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কাজ করব।

মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে হচ্ছে অপপ্রচার: নতুন শিক্ষাক্রমের সমালোচনাকারীরা দাবি করছেন, এর মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার চাপ কমিয়ে নতুন প্রজন্মকে পাঠবিমুখ করে ‘গুরুত্বহীন বিষয়ে’ ব্যস্ত রাখা হচ্ছে। শিক্ষাক্রম বাতিলের দাবিতে ‘সম্মিলিত শিক্ষা আন্দোলন’ এর ব্যানারে সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধনের মত কর্মসূচি পালন করছেন একদল অভিভাবক। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠন বিচ্ছিন্নভাবে শিক্ষাক্রম বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে। সবচেয়ে বেশি বিতর্ক চলছে ফেইসবুক-ইউটিউবে। নতুন পাঠ প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের ব্যাঙের লাফ, হাঁসের ডাকের মত ভিডিও ছড়িয়ে নতুন শিক্ষাক্রমের সমালোচনা করা হচ্ছে। এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মশিউজ্জামান বলেন, শিক্ষাক্রমের সমালোচনা করার মত কিছু না পেয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে এগুলোর চেষ্টা করছে। এখানে যাদের রাজনৈতিক স্বার্থ, আর্থিক স্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে- তারাই এটা করছে। প্রথমে বয়ঃসন্ধিকালের বিষয় পড়ানো, রান্না করা, ঘর পরিষ্কারের মত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, আমরা জবাব দিয়েছি। তারাই কিছু লোক জোগাড় করে এই আন্দোলন করছে। শিক্ষাক্রমের ত্রæটি-বিচ্যুতি না পেয়ে তারা বলছে মোবাইলে আসক্তি হচ্ছে। কিন্তু সারা দেশের বাচ্চারা তো মোবাইল নিয়ে কাজ করছে না। আমরা তো বলিনি যে, ইন্টারনেট থেকেই তথ্য নিতে হবে। বই, পত্রিকা, এমনকি কোন ব্যক্তি থেকেও তারা তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। মশিউজ্জামানের ভাষ্য, মহানবীর ছবি আঁকা, বাচ্চাদের ইউনিফর্ম পরিয়ে হিন্দি গানের সঙ্গে নাচানো, শিক্ষকদের ব্যাঙের লাফ ও সাইকেল চালানো- এগুলো ‘মিথ্যা প্রচার’।

বিশেষজ্ঞদের মত কী: নতুন শিক্ষাক্রম বিরোধী আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা। এর সঙ্গে কোচিং বাণিজ্য জড়িত বলেও মনে করেন গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী। তার ভাষ্য, মধ্যবিত্ত বা নি¤œ মধ্যবিত্তরা এটা নিয়ে কথা বলছেন। গ্রামের মায়েরা তো কথা বলছেন না। আমি ভিডিওগুলো দেখেছি, এই অভিভাবকরা কোচিংয়ের সাথে জড়িত। ৩২ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য যেখানে, সেখানে লাভের কিছু অংশ ব্যয় করে যদি আন্দোলন করা যায়- সেটা তো ভালো। সংশোধনের কথা না বলে শিক্ষাক্রম বাতিলের দাবি কেন করা হচ্ছে সে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, শিক্ষকরাও তৈরি না, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়ী করা উচিত। যে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অভিযোগ আসবে, তাদের এমপিও বাতিল হয়ে যাবে- সেটা তো বলা হচ্ছে না। সাবেক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষকরাও যে গাইড-বই লেখেন, সেটার প্রমাণও তো আছে। ডিভাইস নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু সরকারকে দিতে বলা হচ্ছে না কেন? স্কুলেই তো ডিভাইস রেখে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি বাস্তবায়ন করতে গেলে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক তারিক আহসান মনে করেন, যে বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, তার ৯৮ শতাংশই বানানো। এর সঙ্গে শিক্ষাক্রমের কোনো সম্পর্ক নেই। খন্ডিতভাবে বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। রান্না নিয়ে অনেক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিন্তু রান্না হল একদিনের একটা সেশনের একটা অংশ। পুরো বইয়ে কত বিষয় পরে আছে, সেগুলো নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা নেই। অথচ একদিনের একটা রান্না নিয়ে অনেক বিতর্ক। জাতীয় শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও পরিমার্জন কোর কমিটির সদস্য তারিক আহসান বলেন, ট্রেনিংগুলো নিয়ে যে ট্রল করা হচ্ছে, এগুলোর কোনটিই নতুন শিক্ষাক্রমের কোন বিষয় নয়। হাঁসের মত যে ট্রেনিংটার কথা বলা হচ্ছে, সেটা গণিত অলিম্পিয়াডের। ব্যাঙেরটা স্কাউটিংয়ের ট্রেনিংয়ের অংশ। আর সাইকেলেরটা আসামের এক শিক্ষকের। এভাবেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিতর্ক তৈরি করতে এই কাজগুলো করা হচ্ছে। মূল বিষয় হচ্ছে, শিক্ষাক্রমের কোথাও কোনো চ্যালেঞ্জ থাকলে সেগুলো সমাধানের জন্য আমরা একটি লম্বা প্রসেসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। যেটা বাংলাদেশে আগে কখনও হয়নি। আগের শিক্ষাক্রমের সঙ্গে এবারের পার্থক্য টেনে তিনি বলেন, ২০১২ বা ১৯৯৬ সালের শিক্ষাক্রম একসাথে একইদিনে সারা দেশে শুরু হয়েছিল। আর আমরা ১০ বছর ধরে ধীরে ধীরে আগাচ্ছি। কারণ অনেক বড় পরিবর্তন। মানুষকে শিখতে হবে, বুঝতে হবে। প্রক্রিয়াটাও যাতে পরিবর্তন হয়। এখানে একটা গ্রæপ আছে যারা বুঝতে পারছে, তাদের দীর্ঘদিনের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখানে মুখস্তবিদ্যার কোনো প্রয়োজন নেই। তারাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এটি করাচ্ছে। তাই লজিক্যাল ফিডব্যাক না দিয়ে এভাবে ট্রল করা হচ্ছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ, ২০ জানুয়ারি ২০২৪, প্রথম পৃষ্ঠা

‘গুজব’-এ বিভ্রান্ত না হতে মন্ত্রণালয়ের অনুরোধ: নতুন শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করে ‘আগের পরীক্ষা পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া নিয়ে’ যেসব প্রচার সোশাল মিডিয়ায় চলছে, সেগুলো ‘গুজব ও বানোয়াট’ জানিয়ে সতর্ক করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ধরনের ‘মিথ্যা তথ্য বা গুজবে’ বিভ্রান্ত না হতে সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।মন্ত্রণালয় এক বার্তায় জানিয়েছে, ২০২৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা নেওয়া হবে বলে গুজব ছড়ানো হচ্ছে।
নতুন শিক্ষাক্রমে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা না রাখা, এসএসসির আগে পাবলিক পরীক্ষা না নেওয়া, নবম-দশম শ্রেণিতে বিভাগভিত্তিক বিভাজন তুলে দেওয়াসহ একগুচ্ছ পরিবর্তন আনা হয়েছে। চাপ কমাতে বছর শেষে সামষ্টিক মূল্যায়নের আগে শিক্ষাবর্ষ জুড়ে চলে শিখনকালীন মূল্যায়ন। বেশ কিছু বিষয়ে শিখনকালীন মূল্যায়ন হয় শতভাগ। এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের শুরুর পর্বে শিক্ষা উপমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন মহিবুল হাসান চৌধুরী। আওয়ামী লীগের নতুন সরকারে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি শিক্ষাক্রমে ‘প্রয়োজনে কিছু সংশোধন আসতে পারে’ বলে জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নতুন কারিকুলাম হঠাৎ করে আসেনি। এটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এই আলোচনা সমালোচনাগুলোকে মাথায় রেখেই সেখানে দুর্বলতা থাকলে, সমস্যা থাকলে সেটা সমাধান করা হবে। এরপর ফেইসবুক-ইউটিউবে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা আবার চালু হওয়াসহ বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে পড়ে।

ইউডি/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading